এখনকার যে বড়বাজার পোস্তা অঞ্চল আমরা দেখি তা তো শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের হাঁকডাকে ভরা একটা ঘিঞ্জি অঞ্চল। কিন্তু এই অঞ্চল কলকাতার সবথেকে পুরোনো এলাকাগুলোর মধ্যে একটা।

পোস্তা রাজবাড়ি।
শেষ আপডেট: 18 March 2026 14:53
‘এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা!’ সেই আরেকটা কলকাতার প্রতি পাতায় পাতায় গল্পর ছড়াছড়ি। তবে সে গল্প পড়তে গেলে আমাদের যেতে হবে বেশ ইতিহাসের সরণী বরাবর কিছুটা পেছনে।
সে আনুমানিক আঠারো শতকের কথা। কলকাতা মানে তখন উত্তর কলকাতা। আর উত্তর কলকাতা মানে বুলবুলির লড়াই, বিড়ালের বিয়ে কিংবা পালা গানের জাঁকজমক, পক্ষীর আড্ডায় গাঁজার ছিলিম ফাটা। আর এসবের সঙ্গেই উত্তর কলাকাতার আনাচকানাচে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে বনেদিয়ানা। আর সেই বনেদিয়ানার ধারক এবং বাহক ছিলেন উত্তর কলকাতার কিছু নব্যবাবুর পরিবার। তাঁদের পূর্বপুরুষরা বেশিরভাগই ছিলেন বিভিন্ন অঞ্চলের জমিদার, যারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এদেশে আগমনের সময় থেকে নিত্যনতুন ব্যবসার মাধ্যমে ফুলেফেঁপে উঠেছিলেন। এই নব্যবাবুরা ইংরেজদের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য দেখাতেন। আর তাঁদের থেকে প্রাপ্ত আনুগত্যের পুরস্কার হিসাবে ইংরেজরা রেখেছিলেন নানা খেতাব—রাজা, রাজবাহাদুর ইত্যাদি। তো স্বাভাবিকভাবেই সেই বনেদি বাড়ির বাসস্থানগুলো পরিচিত হত রাজবাড়ি নামে।
উত্তর কলকাতার বড়বাজার পোস্তা অঞ্চলে এমনই এক রাজবাড়ি আজও রয়ে গেছে ইতিহাসের স্মৃতি বুকে নিয়ে। এখনকার যে বড়বাজার পোস্তা অঞ্চল আমরা দেখি তা তো শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের হাঁকডাকে ভরা একটা ঘিঞ্জি অঞ্চল। কিন্তু এই অঞ্চল কলকাতার সবথেকে পুরোনো এলাকাগুলোর মধ্যে একটা। হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত বড়বাজার আত্মপ্রকাশ করে আঠারো শতকে, সুতানুটি হাট নামে একটি ছোট হাট হিসাবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আদিযুগে মুর্শিদাবাদ ও ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এটি পরিণত হয় বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে এবং সেইসঙ্গে বাঙালি অভিজাতদের প্রিয় বাসস্থানে পরিণত হয় ধীরে ধীরে।
এই পোস্তা অঞ্চলেই উত্থান শুরু হয় আদিসপ্তগ্রামের লক্ষ্মীকান্ত ধর ওরফে নকু ধরের। দুই ভাই রমাকান্ত এবং লক্ষীকান্ত ধর হুগলীর সপ্তগ্ৰাম থেকে এসে সুতানুটিতে বসতি স্থাপন করেন। তীব্র প্রতিযোগিতায় পড়ে শেঠ, বসাক এবং সুবর্ণ বণিকরা। রমাকান্ত সুতানুটিতে বসে ব্যাবসা পরিচালনা করতেন, অন্যদিকে লক্ষ্মীকান্ত সারা দেশ ঘুরতেন ব্যবসায়িক প্রয়োজনে। তাঁদের মূল ব্যবসা ছিল টাকা ধার দেওয়ার। বলা যেতেই পারে যে তিনি ছিলেন সে সময়ের অঘোষিত ব্যাঙ্কার। আর এই সূত্রেই লক্ষ্মীকান্তের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক তৈরি হয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। রবার্ট ক্লাইভ এবং ওয়ারেন হেস্টিংসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মহলে স্থান পান তিনি।
কথিত আছে,তিনি ইংরেজ শাসকদের মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ন’লক্ষ টাকা ধার দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি রবার্ট ক্লাইভকে নিয়মিত টাকা ধার দিতেন। এও জনশ্রুতি যে, নবকৃষ্ণ দেব তাঁর কাছে চাকরিপ্রার্থী হয়ে এলে, তিনিই নবকৃষ্ণ দেবের সঙ্গে ইংরেজদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং ইংরেজরা নবকৃষ্ণ দেবকে চাকরি দেন।
নকু ধরের মেয়ের বিবাহ হয়েছিল তৎকালীন আরেক বিখ্যাত পরিবার রায় পরিবারে। সেই সময়ের বিখ্যাত পাট ও তুলোর ব্যবসায়ী, শেঠ এবং বসাকরা, গোবিন্দপুর গ্রাম স্থাপন করেন তাঁদের কূলদেবতার নামে আর তাঁদের অনুসরণ করেন সনাতন পাল। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার অযোধ্যা পাহাড় অঞ্চলে ছিল তাঁদের আদি বাড়ি। তাঁরা সোনার বার এবং মুদ্রা তৈরি করতেন সুবর্ণরেখা নদীর জলে পাওয়া সোনা থেকে। পালেরা সেই বসবাস স্থানান্তরিত করেন কলকাতায় এবং ‘রায়’ উপাধিও পান ইংরেজদের থেকে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে পলাশীর যুদ্ধের আগে বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে সাহায্য করার ফলস্বরূপ তারা নকু ধরকে মহারাজা উপাধি দিতে চায়। নকু ধর অনুরোধ করেন তাঁর দৌহিত্র, একমাত্র কন্যা পার্বতীর পুত্র, সুখময় রায় কে এই উপাধি দিতে। আর এই মহারাজা সুখময় রায়ই পোস্তা রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা।
মহারাজা সুখময় রায় ছিলেন অত্যন্ত সাহসী এবং অসাধারণ একজন মানুষ। সেই সময়ে পোস্তা অঞ্চলে ঠগ আর দস্যুদের আধিপাত্য ছিল। তাদের দমন করার জন্য তিনি তৈরি করেন লেঠেলের দল। তারা লাঠিখেলা এবং নানা অস্ত্রচালনায় ছিল পারদর্শী। তিনি কটক থেকে পুরী পর্যন্ত রাস্তাও নির্মাণ করিয়েছিলেন যাতে জগন্নাথ ভক্তরা খুব একটা কষ্ট না করেও পুরী যেতে পারে। নবাব বাদশাহের সময়ে এই রায় পরিবারদের এক বিশেষ সিলমোহর দেওয়া হয়েছিল। ডাক টিকিটের জায়গায় ওই সিলমোহর ব্যবহার করতেন তাঁরা। কালেক্রমে সুখময় রায় হয়ে ওঠেন ব্যাঙ্ক অফ বেঙ্গলের একমাত্র ডিরেক্টর।
সুখময় রায়ের পাঁচ ছেলে ছিল। তাঁর স্মৃতি যেমন পোস্তা রাজবাড়ির প্রতিটি ইটে, তেমনই কলকাতার নানা অংশে তাঁর পাঁচছেলের স্মৃতিচিহ্ন। বড় ছেলে রামচন্দ্র রায়ের পরিবারই জোড়াসাঁকোর রাজবাড়ির পরিবার হিসাবে পরিচিত। সেজ ছেলে বৈদ্যনাথ রায়। আজকের বিটি রোডে, চিড়িয়ামোড়ে, প্রায় ৫০০ বিঘা জমির ওপর তাঁর বাড়ি ছিল। বহু পশুপাখি থাকত সেখানে, তাই এই জায়গার নাম হয়েছিল চিড়িয়ামোড়।
সুখময় রায় নির্মিত পোস্তা রাজবাড়ি আজও অত্যন্ত নয়নসুখ এক স্থাপত্য বলা যেতেই পারে। আনুমানিক সতেরো শতকের শেষ থেকে আঠেরো শতকের শুরুতে গড়ে ওঠে এই রাজবাড়ির প্রাচীনতম অংশগুলি। মনে করা হয় এই রাজবাড়ির স্থপতি হলেন খ্যাতনামা এডুয়ার্ডো টিরেত্তা (যার নামে টেরিটি বাজার)।
পশ্চিমমুখী এই পোস্তা রাজবাড়ি তিনটি ভাগে বিভক্ত। রাজবাড়ি, লালবাড়ি এবং ঠাকুরবাড়ি। রাজবাড়ি সবথেকে প্রাচীন অংশ, ঠাকুরবাড়ি রাজবাড়ির সংলগ্ন আর লালবাড়ি তৈরি হয় ১৯১১ সালে। পোস্তা রাজবাড়ির সামনের রাস্তার নাম মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রোড, আগে যার নাম ছিল দর্মাহাটা স্ট্রিট। পোস্তার কাছেই এক রাস্তার নাম কালাকার স্ট্রিট, যা একসময় ঢাকা পট্টি নামে পরিচিত ছিল। ঢাকা থেকে আগত সাহা পরিবাররা ওখানে থাকতেন। একসময়ে এই সম্পত্তি বিস্তৃত ছিল স্ট্র্যান্ড রোড থেকে দর্মাহাট স্ট্রিট ও কলাকার স্ট্রিট অবধি। কলকাতায় রাস্তা সম্প্রসারণ নীতির আওতায় ভাঙা পড়েছে অনেকটা অংশ। তবু এখনও যেটুকু অংশ বেঁচে আছে, অর্থাৎ রাজবাড়ি, লালবাড়ি এবং ঠাকুরবাড়ি—তার প্রত্যেকটির স্থাপত্য এবং ভাস্কর্য অতুলনীয়।
ঠাকুরবাড়িতে স্থাপিত আছেন রায়দের কূলদেবতা শ্যামসুন্দর জিউ। রাধাকৃষ্ণের পুজো আজও নিয়মিত হয় এই ঠাকুরদালানে। এছাড়াও পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন ভাস্কর্যের নিদর্শন, অপূর্ব সুন্দর সব ঝাড়বাতি।
সুতানুটি। কলিকাতা উত্তরের যে শহরটা হারিয়ে গেছে আর রেখে গেছে অজস্র স্মৃতির আঠা, কবেকার কোন রাজা, মহারাজার তৈরি এক প্রাসাদ, কিংবা কোনও রাস্তা—এই চলমান শহরে ধ্রুবকের মতো রয়ে গেছে তারা। সেই চলে যাওয়া শহরটাকে কখনও ভোলা যাবে না।