সাম্প্রতিক এক স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনায় দ্য ল্যানসেট পত্রিকার প্রধান সম্পাদক রিচার্ড হর্টন (Richard Horton) সতর্ক করে বলেছেন, আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশতা (Dementia) এক বড় মহামারির রূপ নেবে— আর তার মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত নই।
.jpeg.webp)
বয়সই স্মৃতিভ্রংশতার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ। ফলে আয়ু যত বাড়বে, রোগীর সংখ্যাও তত বাড়বে। ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
শেষ আপডেট: 24 February 2026 12:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আয়ু যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে স্মৃতিভ্রংশতার (dementia) ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি। সাম্প্রতিক এক স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনায় দ্য ল্যানসেট পত্রিকার প্রধান সম্পাদক রিচার্ড হর্টন (Richard Horton) সতর্ক করে বলেছেন, আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশতা এক বড় মহামারির রূপ নেবে— আর তার মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত নই। তিনি আরও বলেন, “বয়স্ক মানুষের জন্য সামাজিক যত্নের কাঠামো গড়ে তোলা নিয়ে এখনই জাতীয় স্তরে আলোচনা শুরু করা দরকার।” উন্নত দেশও এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর খুঁজে পায়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
২০২৩ সালের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রায় ৭.৪ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ৮৮ লক্ষ বৃদ্ধ স্মৃতিভ্রংশতায় আক্রান্ত। পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই রোগের হার বেশি। ভারতের জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে প্রায় ১১ শতাংশ ভারতীয়ের বয়স ৬০-এর বেশি। ২০৩৬ সালে তা বেড়ে ১৫ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে প্রায় ২০ শতাংশে পৌঁছবে বলে অনুমান। বয়সই স্মৃতিভ্রংশতার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ। ফলে আয়ু যত বাড়বে, রোগীর সংখ্যাও তত বাড়বে।
ডিমেনশিয়া কোনও একটি রোগ নয়; এটি স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা হ্রাসের একটি সাধারণ অবস্থা, যা দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, বিশ্বে মৃত্যুর সপ্তম প্রধান কারণ স্মৃতিভ্রংশতা। এটি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ ধ্বংস করে। বয়স, আঘাত বা নানা রোগ এর কারণ হতে পারে। ৬৫ বছরের কম বয়সিদের মধ্যেও প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়া দেখা যায়। The Lancet Group-এর ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ বছরের নীচে মানুষের মধ্যে স্মৃতিভ্রংশতার প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিমেনশিয়া শুধু রোগীকেই নয়, তার পরিবার, পরিচর্যাকারী এবং সমাজকেও প্রভাবিত করে। এটি এক বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
উচ্চ রক্তচাপ
ডায়াবেটিস
মোটাত্ব
ধূমপান
অতিরিক্ত মদ্যপান
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
সামাজিক একাকিত্ব
অবসাদ
সাম্প্রতিক ঘটনা ভুলে যাওয়া
জিনিসপত্র হারানো
পথ ভুলে যাওয়া
সময় সম্পর্কে বিভ্রান্তি
সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা
পরিচিত কাজ করতে অসুবিধা
রোগ বাড়লে পরিবারকেও চিনতে না পারা, খাওয়া-দাওয়া বা চলাফেরায় অক্ষমতা, এমনকী আচরণে হঠাৎ আক্রমণাত্মক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বর্তমানে ডিমেনশিয়ার নিরাময় নেই, সহায়ক চিকিৎসাই ভরসা।
অ্যালঝাইমার রোগ: মোট ডিমেনশিয়ার ৬০–৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই ধরন। প্রধান লক্ষণ স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিভ্রংশ।
লিউই বডি ডিমেনশিয়া: মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক প্রোটিন জমার কারণে হয়। হ্যালুসিনেশন সাধারণ লক্ষণ।
ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া: মস্তিষ্কের সামনের ও পার্শ্বীয় অংশে প্রভাব ফেলে, আচরণ ও ভাষায় পরিবর্তন আনে।
ভাসকুলার ডিমেনশিয়া: মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনে বাধা বা রক্তনালীর ক্ষতিতে হয়, মেজাজের ওঠানামা দেখা যায়।
মিশ্র ডিমেনশিয়া: একাধিক ধরনের সংমিশ্রণ।
ভারতে যৌথ পরিবার ভেঙে অণু-পরিবার বাড়ছে। এর ফলে বয়স্করা একাকী হয়ে পড়ছেন। মুম্বইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ অনু আগরওয়াল বলেন, “অনেকেই প্রাথমিক লক্ষণকে বয়সজনিত স্বাভাবিক পরিবর্তন ভেবে অবহেলা করেন। ফলে রোগ ধরা পড়ে দেরিতে।” কলকাতার স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, সচেতনতার অভাবই বড় সমস্যা।
ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা ব্যয়বহুল। ২০২৫ সালের হু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে স্মৃতিভ্রংশতার আর্থিক বোঝা ছিল প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে American Economic Association-এর বিশ্লেষণ বলছে, ভারতে স্মৃতিভ্রংশতা রোগীর পরিচর্যার বার্ষিক খরচ সাধারণ মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ওষুধ, পরীক্ষা, চিকিৎসক, সেবিকা, পরিচর্যাকারীর সময় ব্যয়, সব মিলিয়ে পরিবারের উপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ পড়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খরচ হয় নিজস্ব সঞ্চয় থেকে। মানসিক চাপও কম নয়। পরিচর্যাকারীকে অনেক সময় চাকরি ছাড়তে হয়। প্রিয়জনকে ধীরে ধীরে স্মৃতি ও স্বনির্ভরতা হারাতে দেখা—এ এক গভীর মানসিক আঘাত।
ডাক্তার গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, নিয়মিত রুটিন বজায় রাখা সবচেয়ে জরুরি। নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া, ঘুম, জিনিস নির্দিষ্ট স্থানে রাখা, দৈনন্দিন কাজের তালিকা তৈরি করা। পরিবারের ইতিবাচক মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ। পরিচর্যাকারীর মানসিক সুস্থতা রোগীর যত্নের মান নির্ধারণ করে। ডাক্তার আগরওয়াল বলেন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রাথমিক শনাক্তকরণে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের বিকল্প নয়। বড় শহরের বাইরে বিশেষজ্ঞ পরিষেবা বাড়ানো এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। সব মিলিয়ে ভারতের স্মৃতিভ্রংশতা সঙ্কট চাপা হলেও এর শিকড় গভীরে প্রোথিত। এখনই সামাজিক, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে না তুললে ভবিষ্যতে তার মাশুল হবে আরও ভয়াবহ।