বিজেপির বীজ পুঁতেছিলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে দ্বিতীয় নেতাটির নাম লালকৃষ্ণ আদবানি।

বিজেপি নেতা এবং দেশের প্রাক্তন উপপ্রধানমন্ত্রী আদবানির আজ, শনিবার (৮ নভেম্বর, ২০২৫) ৯৮-তম জন্মদিন।
শেষ আপডেট: 8 November 2025 12:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় জনতা পার্টি, যে দলের ধ্বজা উঁচিয়ে তৃতীয়বারের জন্য ‘রাজ’ করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহরা। সেই বিজেপির বীজ পুঁতেছিলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে দ্বিতীয় নেতাটির নাম লালকৃষ্ণ আদবানি। প্রবীণ এই বিজেপি নেতা এবং দেশের প্রাক্তন উপপ্রধানমন্ত্রী আদবানির আজ, শনিবার (৮ নভেম্বর, ২০২৫) ৯৮-তম জন্মদিন। ‘ভারতরত্ন’ আদবানির জন্মদিনে তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মোদী-শাহ ছাড়াও দেশের সর্বস্তরের নেতানেত্রীরা।
বিহার বিধানসভা ভোটের মাঝে তাঁর এই জন্মদিন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আজকের রামমন্দির মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, সেই মন্দির প্রতিষ্ঠার সংকল্পে আদবানির দেশব্যাপী রথযাত্রা আজও অনেকের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। এই রামরথ যাত্রার মধ্য দিয়েই বিহারি রাজনীতিতে তিনি এক নতুন দিশার সূচনা করেছিলেন। যার সঙ্গে যোগ রয়েছে তৎকালীন ‘যাদব’ মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদেরও।
বিহারের সমস্তিপুরে এই আদবানিকেই গ্রেফতার করে আপামর মুসলিমদের কাছে ‘মসিহা’ হয়ে গিয়েছিলেন লালুপ্রসাদ। আদবানির গ্রেফতারির পর থেকেই বিহার থেকে পদ্ম ফুল বৃন্তচ্যুত হয়ে গিয়েছিল। মুসলিম মন জিততে লালুপ্রসাদ নিজেদের কেন্দ্রীয় সরকার ভিপি সিংকেও ত্যাগ করতে পিছপা হননি। ১৯৯০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, সোমনাথ থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত রথযাত্রা করে আদবানি বিজেপিকে আঁস্তাকুড় থেকে তুলে এনে রাজপ্রাসাদে ঠাঁই দিয়েছিলেন। হিন্দুধর্মকে তলোয়ার করে এমনভাবে অ-কংগ্রেসি সরকার গড়ার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বিরোধী দলগুলির মুখোশধারী ধর্মনিরপেক্ষতাকে নগ্ন করে দিতে আর কোনও সাহস দেখাননি।
লালুর চ্যালেঞ্জকে উপেক্ষা করে আদবানির রথ বিহারে প্রবেশ করে। ১৯৯০ সালের ২৩ অক্টোবর রথ গিয়ে পৌঁছায় বিহারের সমস্তিপুরে। আদবানির থাকার ব্যবস্থা হয় সার্কিট হাউসে। রাত তখন প্রায় ১২টা। ৭ নম্বর ঘরে আদবানি সেই সময় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সমর্থকরা যে যার ঘরে চলে গিয়েছেন।
রাত দেড়টা নাগাদ একটা ফোন এল। ওপার থেকে জানতে চাওয়া হল, আদবানিজি এখানে আছেন কিনা। তার কিছুক্ষণ পরেই তৎকালীন জেলাশাসক আর কে সিং (মোদী সরকারের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী) বিশাল বাহিনী নিয়ে হাজির হন আদবানিকে গ্রেফতার করতে। রাতারাতি আদবানিকে সেখান থেকে পাঠানো হল বিহার-বাংলা সীমান্ত লাগোয়া দুমকার ম্যাসাঞ্জোর ডাকবাংলোয়। কাকপক্ষীতেও টের পেল না। রাতে সেই ফোন করা ব্যক্তিটি আর কেউ নন, খোদ লালুপ্রসাদ যাদবই ছিলেন।
কেউ কেউ এখনও মনে করেন, অযোধ্যা রামমন্দির ধ্বংস এবং তার পরবর্তী দেশজুড়ে দাঙ্গায় হাজার হাজার নিরীহের মৃত্যুর পিছনে আর কেউ নন, একক দায়িত্ব ছিল লালকৃষ্ণ আদবানির। অধুনা পাক পাকিস্তানের করাচিতে জন্ম আদবানি অবশ্য পরবর্তীতে সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের তদন্ত ক্লিনচিট পান। সেই সময় লালকৃষ্ণ আদবানির সহযোদ্ধা অটলবিহারী বাজপেয়ী ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাঁর বিরুদ্ধে শেষমেশ চার্জশিট দাখিল হয় ২০১৭ সালে। কিন্তু ২০১৯ সালের নভেম্বরে যখন সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যার রামজন্মভূমি হিন্দু আবেদনকারীদের হাতে তুলে দেয়, তখন আদবানি সেই মুহূর্তে নিজেকে রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার বলে ঘোষণা করেন।

জনতা দল ভেঙে ভারতীয় জনতা পার্টি গঠন হয় ১৯৮০ সালে। এরপরেই দলের নির্দেশ রাম জন্মভূমি আন্দোলনের নেতৃত্ব পান কট্টরপন্থী হিন্দুত্বে বিশ্বাসী আদবানি। সেটা ১৯৮৪ সাল। দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৮৬ সালে। আর ১৯৮৯ সালেই বিজেপি ঘোষণা করে যে, অযোধ্যায় রামজন্মভূমিতে মন্দির নির্মাণ করা হবে। এই রথযাত্রার সময় আদবানির হাতে তির-ধনুক, মাথায় মুকুট, কখনও ত্রিশূল, কুঠার, তলোয়ার ধরা ছবি প্রকাশ হতে থাকে। তাঁর যাত্রাসঙ্গী হয় বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মীরা। সব মিলিয়ে দেশ জুড়ে একটা হিন্দুত্বের প্রবল ঢেউ জেগে ওঠে। করসেবকরা একে একে জড়ো হতে থাকেন অযোধ্যায়। শেষে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর করসেবকদের হামলায় ভাঙা পড়ে বাবরি মসজিদ।
দেশের প্রথম বিজেপি প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত অটলবিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আদবানি মিলে দল গঠনের অনেক আগে থেকেই একসঙ্গে কাজ করেছেন। আদর্শগত ও চরিত্রগত বহু অমিল সত্ত্বেও তাঁরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দল গঠন থেকে দলকে ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছে দিয়েছেন। হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা থেকে আজকের ভারতীয় রাজনীতিতে দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসকদল বিজেপির ইস্পাতকঠিন ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। তাই অনেকেই বিজেপির এই সাফল্যের নেপথ্যে বাজপেয়ী-আদবানির যুগলবন্দি লড়াইকে কুর্নিশ করেন।
একইসঙ্গে আজকের মোদী-শাহ জোড়িকে অনেকেই পূর্বসূরিদের এই অটুট বন্ধুত্বের সঙ্গে তুলনা টানেন। কিন্তু, অনেকের মতে, এই তুলনা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ, বাজপেয়ী-আদবানি দুই ভিন্ন চরিত্রের মানুষ ছিলেন। হিন্দু জাতীয়তাবোধ, অযোধ্যা কিংবা ২০০২ সালে গুজরাত দাঙ্গায় তাঁরা ভিন্ন মতপোষণ করতেন। ব্যক্তিত্বের দিক থেকেও দুজনের ভিন্নতা দৃশ্যমান। কিন্তু, লেখক-রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিনয় সেনাপতি তাঁর Jugalbandi: The BJP before Modi গ্রন্থে লিখেছেন, মোদী-শাহ একেবারে রাজযোটক।
তাঁর মতে, ৯০ শতাংশ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁদের সাদৃশ্য রয়েছে। একটি মিল রয়েছে, আদবানি-বাজপেয়ীর তা হলে দুজনেই সমান ছিলেন। কিন্তু, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে একটা বিষয় স্পষ্ট, কে প্রধান ভূমিকায় মঞ্চে রয়েছেন। তিনি লিখেছেন, বাজপেয়ী-আদবানি হিন্দু জাতীয়তাবাদ নিয়ে আন্দোলন করেছেন যখন এটাকে সংসদের ভিতরে-বাইরে অচ্ছ্যুৎ মনে করা হতো। এর কারণ ১৯৫০ সালে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ভারতের সংসদ চলেছে নেহরুবাদী তত্ত্বের উপর ভিত করে। বিশেষত গান্ধী হত্যার পর থেকে হিন্দুত্ববাদকে রাজনৈতিক-সামাজিক চোখে অস্পৃশ্য করে রাখা হয়েছিল।

সে কারণে বাজপেয়ী এবং আদবানিকে মানুষের মন থেকে সেই তৈরি করা ঘৃণা সরানোর লড়াই চালাতে হয়েছে নিরন্তর। আজকের জোড়ি সংসদে বিপুল সংখ্যায় আসীন বলে তাঁরা অনেকটাই ফ্রন্ট ফুটে খেলছেন। যেটা তৈরি করে দিয়ে গিয়েছে বাজপেয়ী-আদবানির যুগলবন্দি। দুজনের মধ্যে তালগত মিল হচ্ছে, বাজপেয়ী ভালবাসতেন গণতান্ত্রিক শক্তিতে। তাই তিনি কাজ করে গিয়েছেন সংসদের ভিতর থেকে। আর আদবানি ভালবাসতেন দল এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের নীতি পালনে। বাজপেয়ী দলের সদর কার্যালয়ে অনেকটাই কোণঠাসা ছিলেন। তাই তিনি সেই কাজটা আদবানির উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন।
পরে বাজপেয়ী বুঝে গিয়েছিলেন যে, তাঁর মধ্যপন্থার হিন্দুত্ব অকেজো দলের ভিতরে। যে কারণে তিনি হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন দলের অনুগত কর্মীর। যেমন বাজপেয়ীর পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গঠনের চেষ্টা দলের ভিতরে সমালোচিত হয়েছে। দেশের আর কোনও প্রধানমন্ত্রী এমনভাবে হাত মেলানোর চেষ্টা করেননি। এই কাজে আদবানি সেই ব্যক্তি, যিনি বাজপেয়ীকে একশো শতাংশ সমর্থন করতেন। এত বড় রাজনৈতিক জীবন, এত দীর্ঘ এবং ঘটনাবহুল কর্মজীবন! কিন্তু তিনি কি এর যথাযোগ্য পুরস্কার পেলেন? প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সমস্ত যোগ্যতা থাকলেও তাঁর তো আর ক্ষমতার ওই সর্বোচ্চ মসনদে বসাই হল না। কারণ, তার আগেই নতুন প্রজন্মের নেতাদের হাতে দল ক্ষমতা সমর্পণ করে। ২০১৪ সালে মুরলিমনোহর জোশি, অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে বিজেপির 'মার্গ দর্শক মণ্ডল'-এর মতো বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই পান আদবানিও।