বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭৯ সালের ধর্মীয় বিপ্লবের পর থেকে ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে হওয়া ধারাবাহিক প্রতিবাদেরই নয়া অধ্যায়।
.jpeg.webp)
বিপ্লবেই ক্ষমতাচ্যুত হন শাহ (Shah) এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র (Islamic Republic)।
শেষ আপডেট: 13 January 2026 17:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইরানে চলতি বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক শিরোনামে উঠে এসেছে। সরকার ও বিরোধী— দু’পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হিংসা উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলছে। সরকারের দাবি, এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন হস্তক্ষেপ। বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭৯ সালের ধর্মীয় বিপ্লবের পর থেকে ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে হওয়া ধারাবাহিক প্রতিবাদেরই নয়া অধ্যায়। ওই বিপ্লবেই ক্ষমতাচ্যুত হন শাহ (Shah) এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র (Islamic Republic)। তবে গত পাঁচ দশকে ইরান শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতাই নয়— যুদ্ধ, ভূমিকম্প, নিষেধাজ্ঞা, পরমাণু উত্তেজনা, আঞ্চলিক সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কেন্দ্রগত দ্বন্দ্ব—সবকিছুরই মুখোমুখি হয়েছে।
নীচে গত পাঁচ দশকের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলির একটি সময়পঞ্জি দেওয়া হল
ফেব্রুয়ারি: ১৪ বছরের নির্বাসন শেষে ইরাকে ও ফ্রান্সে থাকা আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনি (Ayatollah Ruhollah Khomeini) ইরানে ফেরেন।
এপ্রিল: গণভোটের মাধ্যমে ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়।
নভেম্বর: তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে (US Embassy in Tehran) মার্কিন নাগরিকদের যুদ্ধবন্দি করার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দফার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আমেরিকা এর আগে ক্ষমতাচ্যুত শাহ মহম্মদ রেজা পহলভি (Mohammad Reza Pahlavi)-কে সমর্থন করেছিল এবং ১৯৫৩ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ মোসাদ্দেক (Mohammad Mosaddegh)-কে উৎখাতের অভ্যুত্থানেও যুক্ত ছিল—যাতে মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা ছিল।
সেপ্টেম্বর: ইরানের উপর আক্রমণ চালায় ইরাক। এই যুদ্ধে আনুমানিক পাঁচ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়, যার বড় অংশই ইরানের। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো যুদ্ধটি ভয়াবহ রূপ নেয়। ইরানি ও ইরাকি কুর্দদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্রও ব্যবহার করে ইরাক।
জানুয়ারি: বাকি সমস্ত মার্কিন বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়, শেষ হয় ইরান বন্দি সংকট (Iran Hostage Crisis)।
জুন: তেহরানে ইসলামিক রিপাবলিকান পার্টির (Islamic Republican Party) সদর দফতরে বিস্ফোরণে বিচার বিভাগের প্রধান মহম্মদ বেহেশতি (Mohammad Beheshti) সহ বহু শীর্ষ নেতা নিহত হন।
অগস্ট: প্রেসিডেন্ট মহম্মদ-আলি রাজাই (Mohammad-Ali Rajai) ও প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ জাভাদ বাহোনার (Mohammad Javad Bahonar) এক বৈঠকে বোমা হামলায় নিহত হন। সরকার এই হামলার দায় চাপায় বামপন্থী বিরোধী গোষ্ঠী মুজাহিদিন-ই-খালক (Mojahedin-e Khalq, MEK)-এর উপর।
জুন: ইজরায়েল লেবাননে হামলা চালায়। ইরান তখন থেকেই লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লা (Hezbollah)-কে অর্থ ও সমর্থন জোগাতে শুরু করে।
জুলাই: মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেনেস (USS Vincennes) পারস্য উপসাগরে একটি ইরান এয়ারের (Iran Air) যাত্রীবাহী বিমান গুলি করে নামায়। বিমানে থাকা ২৯০ জনের সবাই নিহত হন।
অগস্ট: রাষ্ট্রসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় ইরান-ইরাক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
জুন: ৩ জুন প্রয়াত হন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনি। পরদিন বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই (Ayatollah Ali Khamenei)-কে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেয়।
জুন: ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
মার্চ ও মে: ইরানের উপর তেল ও বাণিজ্য সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা চাপায় আমেরিকা। অভিযোগ করা হয়, ইরান সন্ত্রাসবাদে মদত দিচ্ছে এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।
সেপ্টেম্বর: তালিবান (Taliban) স্বীকার করে যে, আগের মাসে আফগানিস্তানের মাজার-ই-শরিফ (Mazar-i-Sharif) দখলের সময় আটজন ইরানি কূটনীতিক ও এক সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। এর জেরে আফগান সীমান্তে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করে ইরান।
জানুয়ারি: মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লু বুশ (George W Bush) ইরানকে উত্তর কোরিয়া ও ইরাকের সঙ্গে ‘শয়তানের আঁতাঁত’ (Axis of Evil) হিসেবে চিহ্নিত করেন।
মার্চ: ইরাক আক্রমণ করে আমেরিকা। ইরান সেখানে শিয়া ভাড়াটে সৈন্য ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলিকে অর্থ ও সহায়তা দিতে শুরু করে।
নভেম্বর: ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত করার ঘোষণা দেয় এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের (UN) কড়া পরিদর্শনে সম্মত হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) জানায়, পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রমাণ মেলেনি।
ডিসেম্বর: দক্ষিণ ইরানের বাম শহরে (Bam) ভূমিকম্পে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
ডিসেম্বর: রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UN Security Council) ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
অক্টোবর: যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে।
জুন: রাষ্ট্রসঙ্ঘ চতুর্থ দফার নিষেধাজ্ঞা চাপায়, যার মধ্যে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও কড়া আর্থিক বিধিনিষেধ ছিল।
সেপ্টেম্বর: ইরান অভিযোগ করে, তাদের পরমাণু কেন্দ্রের কম্পিউটার সিস্টেমে ম্যালওয়্যার ঢোকানো হয়েছে, যার আড়ালে রয়েছে ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।
মার্চ: সিরিয়ায় বিক্ষোভ শুরু হলে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ (Bashar al-Assad) তা দমন করেন। ইরান পরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড (IRGC) পাঠিয়ে তাঁকে সমর্থন দেয়।
জানুয়ারি: ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ইরানি তেল আমদানি বন্ধ করে।
সেপ্টেম্বর: IAEA অভিযোগ তোলে, পারচিন সামরিক ঘাঁটিতে (Parchin) পরিদর্শনে বাধা দিচ্ছে ইরান এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়িয়েছে।
অক্টোবর: আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার জেরে ইরানি রিয়াল (Iranian Rial) ডলারের তুলনায় ৮০ শতাংশ মূল্য হারায়।
জুলাই: আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা (Barack Obama) প্রশাসন, ইউরোপ ও অন্যান্য শক্তিধর দেশের সঙ্গে ইরান পরমাণু চুক্তি (JCPOA)-তে স্বাক্ষর করে। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার আশায় দেশজুড়ে উদ্যাপন হয়।
মে: ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) যুক্তরাষ্ট্রকে JCPOA থেকে প্রত্যাহার করে নেন।
জানুয়ারি: ইরাকি রাজধানী বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় আইআরজিসির কুড বাহিনী প্রধান কাসেম সোলেমানি (Qassem Soleimani) নিহত হন।
সেপ্টেম্বর: ১৬ সেপ্টেম্বর, ইরানের রাজধানী তেহরানের (Tehran) একটি হাসপাতালে সন্দেহজনকভাবে মৃত্যু হয় ২২ বছরের কুর্দি-ইরানি তরুণী মাহসা আমিনির (Mahsa Amini)। তিনি জিনা আমিনি (Jina Amini) নামেও পরিচিত ছিলেন। ইরান সরকারের নীতি পুলিশ আমিনিকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ ছিল, সরকারি বিধি অনুযায়ী তিনি ঠিকভাবে হিজাব (Hijab) পরেননি। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করে, পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন মাহসা আমিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে মৃত্যু হয়। তবে এই সরকারি বক্তব্যের বিরোধিতা করেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়। সিএনএন (CNN) এই আন্দোলনকে ২০০৯, ২০১৭ ও ২০১৯ সালের প্রতিবাদের চেয়েও বেশি বড় বলে বর্ণনা করে। ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে চলা এই আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৪৭৬ জন নিহত হন। মাহসার মৃত্যুই বিশ্বব্যাপী ‘উইমেন, লাইফ, ফ্রিডম’ (Woman, Life, Freedom) আন্দোলনের সূচনা করে। এই আন্দোলনের মূল দাবি— বাধ্যতামূলক হিজাব আইন প্রত্যাহার এবং ইরানে নারীদের উপর চলা বৈষম্য ও দমন-পীড়নের অবসান। এই আন্দোলনের সময় বহু নারী প্রকাশ্যে হিজাব খুলে ফেলেন, কেউ কেউ প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে চুল কাটেন। যা ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন প্রতিবাদের চিত্র হয়ে ওঠে।
এপ্রিল: ইজরায়েল দামাস্কাসে ইরানের দূতাবাসে বোমা হামলা চালায়। দু’জন আইআরজিসি জেনারেলসহ সাতজন নিহত হন।
মে: পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি (Ebrahim Raisi) মারা যান।
জুলাই: তেহরানে হামাস (Hamas) নেতা ইসমাইল হানিয়ে (Ismail Haniyeh) নিহত হন। এর জন্য ইজরায়েলকে দায়ী করা হয়।
জুন: ইজরায়েল ইরানে হামলা চালালে শুরু হয় ১২ দিনের যুদ্ধ। এতে অন্তত ৬১০ জন ইরানি ও ২৮ জন ইজরায়েলির মৃত্যু হয়।