রাজামণির পরিবারও তাদের সমস্ত সম্পত্তি দেশমায়ের সেবায় দান করে দিয়ে ভারতে ফিরে আসে। পরবর্তীতে প্রচণ্ড দারিদ্রের মধ্যেই চেন্নাই শহরে দিন কাটছিল রাজামণির।

শেষ আপডেট: 26 January 2026 15:02
যাকে বলে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো, আক্ষরিক অর্থেই তাই। বাবা ছিলেন সোনার খনির মালিক। তামিলনাড়ুর ত্রিচি শহরে ছিল বসবাস। বরাবর জাতীয়তাবাদী ধারণায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। গোপনে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অর্থ সাহায্য করতেন। স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ শাসকের (English British) নজরে পড়ে যান। গ্রেফতারি এড়াতে এখানকার ব্যবসাপত্র গুটিয়ে পরিবার নিয়ে রেঙ্গুনে (Rengun) চলে যান। পরবর্তীতে রেঙ্গুনেও একজন ধনী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে স্বীকৃতি পান।
১৯২৭ সালে রেঙ্গুন শহরে জন্ম রাজামণির (Rajamoni)। পরিবার সূত্রেই পেয়েছিলেন দেশাত্মবোধ। তার যখন দশ বছর বয়স, তখন একদিন গান্ধীজি এসেছিলেন তাঁদের বাড়ি। পরিবারের সবাই প্রিয় নেতাকে আপ্যায়নে ব্যস্ত, আর রাজামণি তখন তাঁর বন্দুক নিয়ে মহড়ায় ব্যস্ত। অহিংসায় বিশ্বাসী গান্ধীজি (Gandhiji) বিস্মিত হলেন। ছোট্ট রাজামণিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন হাতে বন্দুক নিয়েছে সে! হিংসা যে ভাল নয়। কিন্তু মানাতে পারেননি। ছোট্ট রাজামণি যে মন থেকে বিশ্বাস করে যারা তার দেশকে লুঠ করছে, তাদের বাঁচিয়ে রাখা উচিত নয়। নিজের সঙ্কল্পের কথাও জানায় গান্ধীজিকে। বড় হয়ে অন্তত একজন ব্রিটিশ অফিসারকে সে মারবেই।
সেই সংকল্প নিয়েই বেড়ে উঠছিলেন রাজামণি। অবশেষে মিলল কাঙ্খিত গুরুর খোঁজ। নেতাজির নানা বক্তৃতায় দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ হলেন তিনি। ১৯৪২ সাল। নেতাজি তখন রেঙ্গুনে। আজাদ হিন্দ বাহিনীর (Azad Hind Fauj) জন্য সেনা নিয়োগ করছেন। রাজামণি দেখা করলেন তাঁর প্রিয় নেতাজির সঙ্গে। ফৌজকে মজবুত করতে তাঁর হাতে তুলে দিলেন নিজের সমস্ত সোনার গয়না।
বিচলিত হলেন নেতাজি (Netaji)। একটা বাচ্চা মেয়ের হাত থেকে কী করে নেবেন তাঁর সব গয়না? বাড়িতে এসে অভিভাবকদের সঙ্গে দেখা করে ফিরিয়ে দিতে চাইলেন সমস্ত অলঙ্কার। কিন্তু একরোখা রাজামণি। দেশমাতৃকাকে উৎসর্গ করা গয়না ফেরত নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। এবার পিছু হটলেন নেতাজি। রাজামণির নতুন নামকরণ করলেন সরস্বতী। বললেন, "লক্ষ্মী চঞ্চলা। তাই টাকা আসে টাকা যায়। কিন্তু জ্ঞানের আকর সরস্বতী ধীর স্থির। রাজামণির জ্ঞান আর চারিত্রিক দৃঢ়তায় সরস্বতীর খোঁজ পেয়েছি আমি।"
আজাদ হিন্দ ফৌজের (Azad Hind Fauj) ঝাঁসির রানি বাহিনীতে যোগদান করলেন সরস্বতী রাজামণি (Saraswati RajaMoni)। সেনাবাহিনীর সামরিক গোয়েন্দা শাখায় কাজ শুরু করলেন। ঝাঁসি রানি ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট হয়েছিলেন পরে। তাঁর সঙ্গে নেতাজির ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আজাদহিন্দ বাহিনীতে যোগ দেন রাজামণির আরও চার বন্ধু। পাঁচজনেই বালকবেশে ছড়িয়ে পড়লেন ব্রিটিশ ফৌজের আধিকারিকদের ঘর ও কর্মস্থলে। শুরু করলেন গোপন তথ্য হাতানোর কাজ। সরস্বতীকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভার দেন নেতাজি। প্রত্যেকটাই দায়িত্ব নিয়ে সম্পন্ন করে ছোট্ট মেয়েটি।
প্রায় দু-বছর চলল এমনভাবেই। একদিন তাঁর এক বন্ধু ব্রিটিশ সেনার হাতে ধরা পড়ে যায়। তাকে উদ্ধার করার জন্য, নর্তকীর পোশাক পরে ব্রিটিশ শিবিরে ঢোকেন রাজামনণি। দায়িত্বরত ব্রিটিশ অফিসারদের নেশাগ্রস্থ করে মুক্ত করেন সহযোদ্ধাকে। পালানোর সময় একজন ব্রিটিশ রক্ষী রাজামণির পায়ে গুলি চালায়, তাতেও অবশ্য রোখা যায়নি তাঁকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, আজাদ হিন্দ ফৌজ ভেঙে যায়। রাজামণির পরিবারও তাদের সমস্ত সম্পত্তি দেশমায়ের সেবায় দান করে দিয়ে ভারতে ফিরে আসে। পরবর্তীতে প্রচণ্ড দারিদ্রের মধ্যেই চেন্নাই শহরে দিন কাটছিল রাজামণির। ২০০৫ সালে সে খবর প্রকাশ্যে আসতে তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা তাঁকে পাঁচ লাখ টাকার এককালীন অনুদান দেন এবং বিনা ভাড়ায় একটি আবাসন ফ্ল্যাটে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। ২০১৮ সালের ১৩ জানুয়ারি চেন্নাই শহরে মৃত্যু হয় ভারতের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ মহিলা গুপ্তচর সরস্বতী রাজামণির।