.jpeg)
গোলাপ ফুলের মাহাত্ম্য।
শেষ আপডেট: 7 February 2025 14:20
গোলাপের কুঁড়ির ভিতর লুকিয়ে ছিল তার মন। আনমনে কখন যেন প্রেম হয়ে ধরা দিল তার অনন্ত যৌবন। গোলাপ সকলের সুপরিচিত ফুল, যা চিরকালীন সৌন্দর্যের এবং ভালবাসার প্রতীক। Rosaceae পরিবারের Rosa নামের এক প্রকারের গুল্ম জাতীয় গাছে গোলাপ ফুল ফোটে। দেহসর্বস্ব প্রেমের ঊর্ধ্বে নিকষিত প্রেমের রূপকল্পে প্রায় ১০০ প্রজাতির বিভিন্ন বর্ণের গোলাপ ফুল রয়েছে।
গোলাপ পাপড়ির গড়ন ও বিন্যাসে একরূপ নান্দনিকতা রয়েছে যা মানুষকে আকৃষ্ট করে। সুগন্ধী গোলাপের ঘ্রাণও মানুষের প্রিয়। গোলাপি বর্ণ ছাড়াও নানা বর্ণের গোলাপ জন্মে থাকে। যেমন লাল,হলুদ, সাদা, সবুজ, এমনকী কালো বা বেগুনি ইত্যাদি। ইদানীং গার্ডেন রোজ নামে বিভিন্ন হাইব্রিড গোলাপের উৎপাদনও হচ্ছে। যেগুলো একই একই ফুলের পাপড়িতে দুই বা ততোধিক রংয়ের হতে পারে। গোলাপের প্রতি আমাদের ভালবাসার মূলে রয়েছে কয়েক হাজার বছরের প্রশংসা, চাষাবাদ এবং সংকরায়ন। জীবাশ্ম তথ্য থেকে জানা যায় যে, ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকায় ৩ কোটি বছর আগেও গোলাপের অস্তিত্ব ছিল।
গোলাপের উৎপত্তি নিয়ে গ্রিক পুরাণে বেশকিছু গল্প আছে। ফুলের দেবী ক্লোরিস একদিন বনের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। পথের ধারে তিনি একটি মৃত পরী (Nymph) দেখতে পান। তিনি ভালবেসে সেই পরীকে ফুলে রূপান্তর করেন। এরপর তিনি অন্যান্য দেবদেবীদের আহ্বান করেন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি এসে দেন সৌন্দর্য, সুরার দেব ডায়োনাইসিস এসে দেন সুগন্ধ, এরপর জিউসের তিন কন্যা যৌবনের প্রতীক থ্যালিয়া এসে দেন মুগ্ধ করার ক্ষমতা, আনন্দের প্রতীক ইউফ্রোসাইন এসে দেন আনন্দদানের ক্ষমতা আর ঔজ্জ্বল্যের প্রতীক এগলাইয়া এসে ফুলের ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়ে দেন। বাতাসের দেবতা জেফিরস এসে মেঘ সরিয়ে নেন, এতে করে সূর্যদেব অ্যাপোলো প্রচুর সুর্যালোক দিতে পারেন। এভাবেই তৈরি হয় ফুলের রানি এবং ভালবাসার ফুল গোলাপ।

প্রাচীন গ্রিসের আর একটি পৌরাণিক কাহিনিতে গোলাপের অন্য একটি জন্ম ইতিহাস পাওয়া যায়। এডোনিসের প্রেমে পড়েছিলেন আফ্রোদিতি। এডোনিস বনের ভিতর শিকার করতে গেলে আফ্রোদিতিও স্বর্গ ছেড়ে মর্ত্যে এসে এডোনিসের সঙ্গলাভের জন্য বনের ভিতর ঘুরতে থাকেন। বিষয়টি আফ্রোদিতির অপর প্রেমিক রণদেবতা অ্যারেস স্বাভাবিকভাবে নেননি। তিনি বন্য শূকরে রূপান্তরিত হয়ে এডোনিসকে মারাত্মকভাবে আহত করেন। বনের ভিতর আহত অবস্থায় তাঁকে রক্ষা করে আফ্রোদিতি। এডোনিসের রক্ত আর আফ্রোদিতির চোখের জলে জন্ম নেয় লাল গোলাপ।
আরেকটি পুরাণে বলা হয় সমুদ্রের ফেনা থেকে জন্ম হয় আফ্রোদিতির। আফ্রোদিতি যখন সমুদ্র থেকে উঠে আসেন, তাঁর শরীর থেকে ফেনা মাটিতে পড়ে জন্ম হয় সাদা গোলাপের। আহত এডোনিসের কাছে ছুটে যাওয়ার সময় সাদা গোলাপের কাঁটার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হলে আফ্রোদিতির রক্ত পড়ে সাদা গোলাপের উপর। তখন সাদা গোলাপ পায় রক্তলাল রং।

গ্রিক পুরাণে গোলাপ সৃষ্টির যে কাহিনি বর্ণিত, তা রদবদল করে রয়েছে রোমান মিথোলজিতে। সেখানে গোলাপ সৃষ্টির জন্য উল্লেখ করা হয়েছে প্রেমের দেবী ভেনাসের কথা। এটি ছাড়াও রোমান পুরাণে গোলাপের আর একটি জন্মকাহিনি পাওয়া যায়- রোমে এক সুন্দরী নারী ছিলেন, তাঁর নাম ছিল রোডান্থি। তাঁকে সবসময় উত্ত্যক্ত করত কয়েকজন যুবক। একদিন সেই যুবকদের তাড়া খেয়ে রোডান্থি দৌড়ে আশ্রয় নেন তাঁর বান্ধবী ডায়ানার মন্দিরে। রোডান্থির রূপে মুগ্ধ হয়ে ডায়ানার পূজারীরা রোডান্থিকে পুজা করতে থাকেন। এতে ডায়ানা ঈর্ষান্বিত হয়ে রোডান্থিকে বানিয়ে দেন গোলাপ আর তাঁর প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া যুবকদেরকে বানিয়ে দেয় গোলাপের কাঁটা।

এ তো গেল গ্রিক ও রোমান পুরাণের কথা। হিন্দু পুরাণেও গোলাপের কথা লেখা আছে। বিষ্ণু মর্ত্যে এসে যে সরোবরের জল ব্যবহার করতেন সেখানে ফুটে থাকত এক পদ্মফুল। অনেকে একে ব্রহ্মকমল বা কেউ পারিজাত বলেও ব্যাখ্যা করেন। সেই পদ্মফুল থেকে ব্রক্ষা বেরিয়ে এসে বলেন- এটিই পৃথিবীর সেরা ফুল। বিষ্ণু তখন ব্রহ্মাকে ডেকে নিয়ে আসেন বৈকুণ্ঠে। সেখানে তাঁকে একটি গোলাপ ফুল দেখান। ব্রহ্মা তখন স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, স্বর্গ-মর্ত্যের সেরা ফুল হল গোলাপ।
গোলাপ নিয়ে একটি আরব্য কাহিনিও আছে। এ কাহিনীটিও বেশ করুণ- একদা এক বুলবুলি পাখি একটি সাদা গোলাপের প্রেমে পড়ে। সাদা গোলাপ বুলবুলিকে বলে- যেদিন আমার রং লাল হবে, সেদিন তোমাকে আমি ভালবাসব। বুলবুলি অপেক্ষা করতে থাকে, সাদা গোলাপ আর লাল হয় না। বুলবুলির প্রতীক্ষার ধৈর্য যখন শেষ হয়ে আসে, তখন একদিন নিজেকে গোলাপের কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত করে। তার বুক বিদীর্ণ হয়ে রক্তে ভেসে যায় সাদা গোলাপের পাপড়ি। গোলাপ পায় রক্তলাল রং। সেই থেকে লাল গোলাপ ভালবাসার প্রতীক হয়ে আছে।
গোলাপ সম্বন্ধে এইরকম অনেক গল্প আছে। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালে গ্রিক কবি সাফো 'ওড টু দ্য রোজ' নামে একটি কবিতায় লিখেছিলেন যে এই ফুলটিকে 'ফুলের রানি' হিসেবে বিবেচনা করা হতো। শতাব্দী ধরে এই অনুভূতি বহুবার প্রকাশ পেয়েছে। তবে, রোমানদের মতো খুব কম সংস্কৃতিই গোলাপের প্রশংসায় আনন্দিত হয়েছিল। রোমান বাড়িতে, মেঝে কার্পেট করার জন্য, স্নানের জল ভর্তি করার জন্য, বিভিন্ন ভোজসভায় এবং এমনকী খাওয়ার জন্য গোলাপের পাপড়ি ব্যবহার করা হতো। রোম রাজসভার ছাদ থেকে ঝুলন্ত গোলাপ গোপনীয়তার প্রতীক ছিল এবং সভার বিষয়বস্তু বাইরে গোপন রাখা হতো।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি নিশ্চিত করে যে গোলাপ পৃথিবীতে ফুটে ওঠা প্রাচীনতম ফুলগুলির মধ্যে একটি, যা সমগ্র উত্তর গোলার্ধে জংলি ফুল হিসেবে ছড়িয়ে পড়ার আগে প্রথম এশিয়ায় দেখা গিয়েছিল। যার জন্ম সম্ভবত চিনে। জীবাশ্ম প্রমাণ অনুসারে, গোলাপের বয়স ৩ কোটি ৫০ লক্ষ বছর, আমেরিকান ইনস্টিটিউট অফ ফ্লোরাল ডিজাইনার্সের প্রাক্তন সভাপতি এবং ফুলের সাজসজ্জা বিশেষজ্ঞ শ্যারন ম্যাকগুকিনের মতে, প্রায় ৫,০০০ বছর আগে বাগানে গোলাপ চাষ শুরু হয়েছিল, সম্ভবত চিনে। ধারণা করা হয় যে, গোলাপ প্রথম চিনে চাষ করা হত, যেখানে কনফুসিয়াস (খ্রিস্টপূর্ব ৫৫১-৪৭৯) বর্ণনা করেছেন যে চৌ রাজবংশের রাজকীয় উদ্যানগুলিতে এগুলির চাষ হতো।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গোলাপ বাগানগুলির মধ্যে একটি ফ্রান্সের সম্রাজ্ঞী জোসেফাইন মালমাইসনে তাঁর বাসভবনে রক্ষণাবেক্ষণ করেছিলেন। ১৮১৪ সালে তাঁর মৃত্যুর সময়, সম্রাজ্ঞী জোসেফাইনের গোলাপ বাগানে প্রায় ২৫০ প্রজাতি এবং বিভিন্ন ধরনের গোলাপ ছিল, যা সেই সময়ে পরিচিত প্রতিটি জাতের প্রতিনিধিত্ব করে। পিয়েরে-জোসেফ রেডউট এবং ক্লদ আন্তোইন থোরি তাঁদের চিত্রকর্ম, লেস রোজেস -এ এই বিখ্যাত গোলাপ বাগানের ছবি এঁকে গিয়েছেন।
১৭০০ শতকের শেষের দিকে এবং ১৮০০ শতকের গোড়ার দিকে, ইউরোপে রোজা চিনেনসিসের প্রবর্তনের মাধ্যমে গোলাপের প্রজননে বিপ্লব ঘটে। এই প্রজাতি এবং অন্যান্য চিনা গোলাপ বারবার ফুল ফোটতে সক্ষম ছিল। ইউরোপীয় গোলাপ বছরে মাত্র একবার অল্প সময়ের জন্য ফোটে। এশিয়া থেকে আসা গোলাপের প্রচলন ইউরোপীয়দের কাছে নতুন ফুলের রঙ, যেমন হলুদ, নিয়ে আসে। এই এশিয়ান গোলাপগুলিকে ইউরোপীয় গোলাপের সাথে প্রজনন করা হয়েছিল। যাতে একটি নতুন শ্রেণির গোলাপ, হাইব্রিড তৈরি করা হয় এবং ১৯ শতকের শেষের দিকে বারবার ফুল ফোটানো গোলাপের একটি রংধনু তৈরি হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই, হাইব্রিড-টি গোলাপ ব্যাপকভাবে জন্মানো গোলাপের ধরনের হয়ে ওঠে। আজও, হাইব্রিড-টি গোলাপ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় গোলাপ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কয়েক দশক ধরে ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে এটিই সবচেয়ে বেশি বিক্রিত ফুল।
প্রেরিত গোলাপের সংখ্যা দিয়ে একেকটি তাৎপর্য বহন করা হয়। যেমন- একটি গোলাপ ফুলের উপহার প্রথম দর্শনে প্রেমের প্রতীক বলে মনে করা হয়। দুটির অর্থ গভীর এবং ব্যক্তিগত প্রেম এবং তিনটি গোলাপের অর্থ 'আমি তোমাকে ভালোবাসি।' সাতটি গোলাপ তার প্রাথমিক পর্যায়ে মোহ বা প্রেম প্রকাশ করে, নয়টি গোলাপ চিরন্তন প্রেম ঘোষণা করে এবং এক ডজন গোলাপ প্রেমিকের বিশেষত একসঙ্গে উপরের সবকিছুকে বোঝায় বলে মনে করা হয়।
১। পাপা মিলাঁ
২। আইসবার্গ
৩। রোজ গুজার্ড
৪। বেংগলি
৫। কুইন এলিজাবেথ
৬। জুলিয়াস রোজ
৭। ডাচ গোল্ড
৮। সানসিল্ক
৯। কিংস র্যানসন, উল্লেখযোগ্য।

এই অনন্য ফুলগুলি ঘিরে মনোমুগ্ধকর কিংবদন্তি তাদের আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে তোলে। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, একসময় তুর্কি শহর হালফেতিতে খাঁটি কালো গোলাপ ফুল ফুটেছিল। কিংবদন্তিটি আরও ইঙ্গিত দেয় যে, একজন তুর্কি রাজপুত্র যখন কাঁদছিলেন তখন তার হৃদয় ভেঙে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ফুলগুলি কালো হয়ে যায়। যাইহোক, এই প্রাকৃতিক ফুলগুলিতে লাল রঙের সবচেয়ে গাঢ় ছায়া দেখা যায়, পাপড়িগুলি প্রায় কালো রঙ ধারণ করে। ভালবাসার প্রতীক হিসেবে লাল গোলাপের সঙ্গে মিল থাকা সত্ত্বেও, কালো গোলাপ এই অনুভূতিকে আরও তীব্র এবং রহস্যময় গুণে ভরিয়ে তোলে। আজকাল, কালো গোলাপ, বিশেষ করে ব্ল্যাক বাক্কারা জাতটি ধীরে ধীরে উদ্যানপালক এবং ফুলপ্রেমীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। তাদের অনন্য এবং মনোমুগ্ধকর চেহারার কারণে বাগান, তোড়া এবং ফুলের সাজসজ্জায় চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে।

কালো গোলাপ দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যে গভীর প্রতীক বহন করে আসছে। ইতিহাস জুড়ে, এটি রহস্য, শত্রুতা, মৃত্যু, অপমান, দুর্ভাগ্যজনক প্রেম এবং অতিপ্রাকৃতের সঙ্গে যুক্ত। সাহিত্য ও শিল্পে, কালো গোলাপ প্রায়শই করুণ রোমান্স এবং মানব আবেগের আরও অন্ধকার দিকগুলিকে প্রতিনিধিত্ব করে। মজার বিষয় হল, অন্ধকারের সাথে তাদের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, এই অনন্য ফুলগুলি সৌন্দর্য এবং নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে নতুন সূচনার সম্ভাবনার বাতাসও বহন করে। প্রতীকীর এই দ্বৈততা কালো গোলাপের স্থায়ী আকর্ষণ এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।