
ঘিবলি স্রষ্টা শিল্পী মিয়াজাকি
শেষ আপডেট: 30 March 2025 18:19
মানুষ নিজের মর্জির খামখেয়ালিপনাকে আশকারা দেয় বেশি। বৈচিত্রকামী এই চরিত্রের প্রগতিশীলতার অন্দরে সহাবস্থান সহিষ্ণু আর গ্রহিষ্ণু আত্মার। আর এর প্রতিচ্ছবি যদি কোথাও দেখা যায়, তা হল তার সৃষ্টিতে। কালিদাস কেমন লোক ছিলেন, তা তো আমাদের জানার কথা নয়, তবু আজও বিচার্য বিষয় তাঁর সৃষ্টি। পিকাসোকে নিয়ে কেচ্ছা-কেলেঙ্কারির নাকি শেষ নেই, সেই মনে করে কেউ যদি তাঁর আঁকা ছবিটাই না দেখে, তাহলে বঞ্চিত কে? রবিঠাকুর তো কবেই বলে গেছেন, 'দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি। সত্য বলে, আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?'
কিন্তু এখনকার সময়ে পৌঁছে, একটা প্রশ্ন নতুন করে ঘনিয়েছে। এই যন্ত্র আর শর্টকাটের যুগে সব সৃষ্টিই কি আদৌ সৃষ্টি? সবই কি শিল্পী আত্মার প্রতিচ্ছবি? উত্তর খুঁজতে একটু থমকে যেতে হবে বই কী।
দু'দিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে সবাই কার্টুন হয়ে গেছেন, সবই কার্টুন হয়ে গেছে। ঠিক কার্টুন নয়, জলছবিতে আঁকা স্বপ্নিল চরিত্র বলা যেতে পারে। কেন? কারণ হঠাৎ বহু মানুষ 'ঘিবলি' আর্টের বাড়বাড়ন্তে গা ভাসিয়ে ফেলছে। ট্রেন্ডের ফান্ডা এমনই, যে এই বিশেষ শিল্পের শৈলী হয়ে ওঠা আমাদের কারও মধ্যেই খুব একটা গভীর প্রভাব ফেলে না, আবার আলগা চটকটিকে এড়িয়েও থাকা যায় না।
বছর কয়েক আগে 'প্রিজমা' বলে একটি ফিল্টার সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেয়ে গিয়েছিল। যেখানে পছন্দসই ছবি দিলেই তেলরঙা ধাঁচে ছবি তৈরি হয়ে যেত। সে নিয়ে তখন খুব হইচই। এসব ট্রেন্ড মানুষকে ভাবার পরিসর তো দেয়ই না বরং চেতনে এক আশ্চর্য ফিয়ার অফ মিসিং আউট (ফোমো) তৈরি করে দেয়। ঠিক যেমন 'ঘিবলি' নিয়ে কেউ কেউ দুঃখসূচক পোস্ট করে লিখছেন, "আমিই কি একমাত্র, যে এখনও জানি না ঘিবলি কীভাবে করতে হয়?"
জাপানের কিংবদন্তি শিল্পী, এই ঘিবলি সটুডিওর নির্মাতা মিয়াজাকিদের মস্তিষ্কপ্রসূত 'স্পিরিটেড অ্যাওয়ে' বা 'মাই নেবার টোটোরো' তৈরি করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ম্যানুয়াল লেবার লেগেছে। সেই শ্রমের নির্যাসটুকু কি এক ক্লিকেই এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দফারফা করে দিতে পারে? শিল্পে পারঙ্গম না হয়েও শিল্প-শখ পূরণ করে দিতে সক্ষম? ইনস্ট্যান্ট শিল্পী হয়ে ওঠার উন্মাদনাই বা কতক্ষণ স্থায়ী হবে?
কার্টুন শিল্পী সেন্টু অবশ্য এমন ট্রেন্ডকে মানুষের সাময়িক মন ভোলানো হিসেবেই দেখছেন। তাঁর সরল প্রশ্ন, 'কোনও সৃষ্টি এক ক্লিকে হয় কি? আমরা সম্পাদকীয়তেও দেখছি এক ঘরানার লেখা বেরোচ্ছে। একজন ক্রিয়েটিভ মানুষ যখন লিখছেন বা একজন শিল্পী যখন আঁকছেন তখন তার মধ্যে যে মুন্সিয়ানা থাকবে, সেটা এক ক্লিকে কখনও সম্ভব না।'
সেন্টুর ব্যাখ্যা, 'যান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাজ করা এই প্ল্যাটফর্মে আমি কয়েকটা প্রম্পট দিলাম, তাতেই যতটুকু আউটপুট আসার সেটা আসে। এতে কেবল একঘেয়েমি থাকবে। ঘিবলি নিয়ে যেটা হচ্ছে, সেটাও রাম-শ্যাম-যদুর মতো একঘেয়ে। একই স্টাইল, একই প্রেজেন্টেশন। অর্থাৎ গতানুগতিক ঢঙে ছবি কপি করে আঁকা। কিন্তু একটা কাজ করতে আমাদের যে ভাবনা থাকে তার সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর সৃষ্টির মৌলিক পার্থক্য থাকে।'
শিল্পী বুঝিয়ে বললেন, 'আমি কার্টুনিস্ট হিসেবে যখন কোনও চরিত্র আঁকব, কোনও রাজনৈতিক চরিত্র সৃষ্টি করব, তখন তার ভাবনার স্তরে থাকবে চরিত্রটা কতটা উন্নাসিক, বা ধরা যাক, তার কতটা চারিত্রিক অধঃপতন রয়েছে। এতটা গভীর ও সূক্ষ্ম পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের শেষে আমার কলম আঁচড় কাটে। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে একই ঢঙের সৃষ্টি আমরা কতদিন নিতে পারি? আদৌ কি নিই?'
৩৫ হাজার লোককে নিয়ে করা একটি সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহার দৈনিক এক ঘণ্টা করে সময় বাঁচিয়ে দিচ্ছে আমাদের। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের সময় বাঁচছে দিনে ৭৫ মিনিট।
এআই এর জাঁকিয়ে বসা নিয়ে দু'পক্ষের তর্ক জোরালো হতেই পারে। ইন্টারনেটে কান পাতলে এর ভাল খারাপ নিয়ে মাথায় ঝিলমিল লেগে যাবে। আমরা কম্পিউটারকে যথেচ্ছ গালাগাল করলেও আপন করে নিয়েছি। ভবিষ্যতে এআই-ও তাই হবে, হতে বাধ্য।
আর সেই কথা মাথায় রেখেই কার্টুনিস্ট সেন্টু বলেন, 'এআই নিয়ে চর্চা করে যদি একটা অন্য রকম প্রেজেন্টেশন হয় তাতে ভাল বই খারাপ তো নয়। বিজ্ঞান বিজ্ঞানের মতো এগোচ্ছে। উচিত-অনুচিত বলে দাগিয়ে দেওয়ার আমরা কে? আমরা যদি সত্যিই ক্রিয়েটিভ মাইন্ডেড হই, তাহলে এ নিয়ে চিন্তা করার কোনও কারণই হয় না। তবু চিন্তা হচ্ছে কেন, কর্মসংস্থানের কথা ভেবে। আজ যে কাজটা একশো জন মিলে করে এআই-এর জন্য সেটাই হয়তো পাঁচ জনে করে ফেলতে পারছে। এখানেই শুধু ভাববার বিষয়। আমাদের এটা ভাবতে হবে যে সেই জায়গাটা আমার ক্রিয়েটিভিটি দিয়ে কীভাবে ভরাট করে ফেলব।'
তাঁর কথায়, 'আমাদের দেশে কার্টুন আঁকা শেখার কোনও মাধ্যম নেই। প্রতিষ্ঠান নেই। ওদেশে সেটা নিয়ে চর্চা হয়। আমার দেশ সেই ধাঁচ শেখায়নি, তাই ওদের স্টাইলটা নিয়েই আমরা ক্ষান্ত থাকছি। আমরা ওদের দৌলতে লায়ন কিং দেখেছি, টম অ্যান্ড জেরি দেখেছি, এটা কখনও এক ক্লিকে সম্ভব? আমরা শুধু রপ্ত করতে পারি। ঠিক তেমন ভাবেই আমাদের বিজ্ঞানকেও রপ্ত করতে হবে, সম্মান করতে হবে।'
তবে এর পাশাপাশিই তিনি মনে করিয়ে দিলেন, 'আমাদের ভাবতে হবে আমরা কী করতে পারি বা না পারি। আমাদের চিন্তা, এখন যে পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছি, সেখানে আর পাঁচজন করে খাব কীভাবে? এর পরে হয়তো কলকাতার বাবু কালচারের যে পটচিত্র সেটাও এআই তৈরি করে দেবে। কিন্তু সেই ফর্ম অফ আর্ট চিরস্থায়ী হবে না কখনওই। অন্তত বাংলা আর বাঙালির একটা অংশে তো সেই বোঝাপড়া থাকবেই, যে আমরা বাংলার কালচারকে আঁকড়ে ধরেই কাটিয়ে দেব। শিল্পীর জন্ম হবেই, নতুন নতুন আর্ট ফর্মও সৃষ্টি হতে থাকবে চিরকাল। এটা একটা ধারা, একটা ধারাবাহিকতা। তাকে এক ক্লিকে বন্দি করে ফেলা কোনও ভাবেই সম্ভব হবে না।'
প্রসঙ্গত, 'ঘিবলি' স্রষ্টা মিয়াজাকি নিজেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে চটজলদি আউটপুটের প্রবণতাকে ঘৃণা করেন। তিনি তাঁর রংতুলি দিয়ে যে সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখান, সেই ফর্ম নিয়ে মানুষ যতই 'জাস্ট ফর ফান' মনোভাবকে পুষ্ট করুক, ট্রেন্ডে থাকার তীব্র অথচ সাময়িক আনন্দের আবাদ করুক সে ফসল কখনওই চিরস্থায়ী হবে না। কারণ একবিংশ শতকের এক চতুর্থাংশ এগিয়ে যাওয়ার পরে নুডুলসের মতো আরও অনেক কিছুই ইনস্ট্যান্ট হতে পারে, তবে শিল্প কদাপি নয়। যন্ত্রকে ভরসা করে 'ইনস্ট্যান্ট শিল্পী' হয়ে উঠলে যে ইনস্ট্যান্ট তলিয়েও যেতে হতে পারে, তা নির্জলা সত্য।
কারণ, শিল্পের থেকে অনুভূতি বাদ দিলে যেটা পড়ে থাকে, তাকে আর শিল্প বলা যায় না, বলা যায় স্রেফ নকলনবিশি।