কিউবায় রাজনৈতিক শিক্ষা নিয়ে বাসচালক থেকে কীভাবে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছলেন নিকোলাস মাদুরো?

নিকোলাস মাদুরো
শেষ আপডেট: 4 January 2026 17:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ৮ ডিসেম্বর, ২০১২। ভেনেজুয়েলার টিভি পর্দায় একসঙ্গে হাজির হয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উগো চাভেজ (Hugo Chavez) ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী নিকোলাস মাদুরো (Nicolas Maduro)। ক্যানসারে আক্রান্ত চাভেজ তখন চতুর্থবার দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন মাত্র দু’মাস। ভোটের সময় নিজের অসুস্থতার কথা লুকিয়েছিলেন। সেদিন হাতে সংবিধান তুলে দেশবাসীর উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন, তিনি না থাকলে মাদুরোকেই যেন প্রেসিডেন্ট করা হয়।

এর তিন মাস পর চাভেজের মৃত্যু, আর সেখান থেকেই ভেনেজুয়েলার ক্ষমতায় বসেন মাদুরো। ১২ বছর পর সেই ‘অজেয়’ প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস (Cilia Flores) আজ মার্কিন সেনার হাতে বন্দি। আমেরিকা জানিয়েছে, তাঁদের সঙ্গে বন্দির মতোই আচরণ করা হবে এবং বিচার করা হবে।
বাসচালক থেকে প্রেসিডেন্ট, মাদুরোর এই উত্থান, বিতর্ক আর পতনের কাহিনিই এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।

তেলের দেশ, দারিদ্র্যের শৈশব
ষাটের দশকে ভেনেজুয়েলা ছিল ‘লাতিন আমেরিকার সৌদি আরব’। তেল উৎপাদনের জোরে দেশ ফুলেফেঁপে উঠলেও সেই অর্থ পৌঁছত মূলত উচ্চবিত্তদের হাতে। সাধারণ মানুষ থাকত দারিদ্র্যে। এমন সময়ে, ১৯৬২ সালের ১৩ নভেম্বর, কারাকাসে জন্ম নিকোলাস মাদুরোর। বাবা যিশু নিকোলাস (Jesus Nicolas) ছিলেন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, মা তেরেসা (Teresa) কলম্বিয়ার বাসিন্দা, যা পরে মাদুরোর নাগরিকত্ব নিয়ে বড় বিতর্কের কারণ হয়।

স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই পড়াশোনা ছেড়েছিলেন মাদুরো। ২১ বছর বয়সে বাম ঘরানার নেতা হোসে ভিসেন্তে রাঙ্গেলের (Jose Vicente Rangel) দেহরক্ষী হন। এরপর বাসচালক, সেখান থেকে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। ৮০-র দশকে কিউবায় (Cuba) গিয়ে রাজনৈতিক শিক্ষা নেন। বিরোধীদের অভিযোগ, সেখানেই কিউবার গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠে তাঁর।
চাভেজের ছায়ায় ক্ষমতার শিখরে
১৯৯৯ সালে চাভেজ প্রেসিডেন্ট হতেই মাদুরোর রাজনৈতিক উত্থান। ২০০০ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য, ২০০৫-এ সংসদের প্রধান, ২০০৬-এ বিদেশমন্ত্রী। এই সময়েই তিনি ভারত সফরে এসে পুট্টাপার্থীর প্রাশান্তি নিলয়ম আশ্রমে সত্য সাঁইবাবার (Satya Sai Baba) আশীর্বাদ নেন। তাঁর সেদিনের সঙ্গী ছিলেন সিলিয়া ফ্লোরেস। তাঁকে পরে বিয়ে করেন মাদুরো।

২০১৩ সালের এপ্রিলে অল্প ব্যবধানে জিতে প্রেসিডেন্ট হন। তারপর একের পর এক নির্বাচন, বিরোধীদের কারচুপির অভিযোগ, আন্তর্জাতিক চাপ, তবু ক্ষমতা ধরে রাখার অদম্য জেদ ছিল তঁর মধ্যে। ২০১৮ থেকে ২০২৪- এই সময়কালে ড্রোন হামলা, ‘অপারেশন গিডিয়ন’ (Operation Gideon), বিদেশি ভাড়াটে সেনা গ্রেফতার- তিনবার প্রাণনাশের চেষ্টা হয় তাঁর ওপর।
আমেরিকার সঙ্গে সংঘাত ও পতনের অধ্যায়
আমেরিকার সঙ্গে মাদুরোর সংঘাত ক্রমশ তীব্র হয়। ২০১৯ সালে তাঁকে ‘নার্কো-টেরোরিস্ট’ (Narco-terrorist) ঘোষণা করে মাথার দাম ধার্য করে ওয়াশিংটন। অভিযোগ ওঠে ‘কার্টেল দে লস সোলেস’ (Cartel de Los Soles) নামের ড্রাগ নেটওয়ার্কে মদত দিয়েছেন তিনি। মাদুরোর পাল্টা দাবি ছিল, তেলের ভাণ্ডারের লোভেই আমেরিকার এই আক্রমণ।

এই রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেই বিরোধী নেত্রী মারিয়া মাচাদো (Maria Machado) উঠে আসেন সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় মুখ হিসেবে। শেষমেশ ক্ষমতার শীর্ষ থেকে বন্দিদশা- মাদুরোর রাজনৈতিক যাত্রা এখন ইতিহাসের এক অস্থির অধ্যায়।