Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
অ্যাপল ওয়াচ থেকে ওউরা রিং, কেন একসঙ্গে ৩টি ডিভাইস পরেন মুখ্যমন্ত্রী? নেপথ্যে রয়েছে বড় কারণপ্রসবের তাড়াহুড়োয় ভয়াবহ পরিণতি! আশাকর্মীর গাফিলতিতে দু'টুকরো হল শিশুর দেহ, মাথা রয়ে গেল গর্ভেই২০ বছরের 'রাজ্যপাট'! ইস্তফা বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ‘সুশাসন বাবু' নীতীশ কুমারের, উত্তরসূরির শপথ কবেমুম্বইয়ের কনসার্টে নিষিদ্ধ মাদকের ছড়াছড়ি! 'ওভারডোজে' মৃত্যু ২ এমবিএ পড়ুয়ার, গ্রেফতার ৫IPL 2026: ‘টাইগার জিন্টা হ্যায়!’ পাঞ্জাবকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ভাইরাল মিমের স্মৃতি উসকে দিলেন সলমন আইপ্যাকের ডিরেক্টর গ্রেফতারের পর এবার পরিবারের পালা! ইডির নজরে প্রতীক জৈনের স্ত্রী ও ভাই, তলব দিল্লিতেSakib Hussain: গয়না বেচে জুতো কিনেছিলেন মা, সেই ছেলেই আজ ৪ উইকেট ছিনিয়ে আইপিএলের নতুন তারকা হয় গ্রেফতার, নয় কৈফিয়ত! অমীমাংসিত পরোয়ানা নিয়ে কলকাতার থানাগুলোকে নির্দেশ লালবাজারের‘মমতা দুর্নীতিগ্রস্ত! বাংলায় শুধু সিন্ডিকেট চলে, কাজই বেকারের সংখ্যা বাড়ানো’, মালদহে রাহুল‘আমার মতো নয়’! সন্দেহের বশে ৬ বছরের ছেলেকে নদীতে ফেলে খুন, দেহ ভেসে উঠতেই ফাঁস বাবার কীর্তি

কোপনস্বভাব জমিদারের মন হরণ করেছিল জনাইয়ের ‘মনোহরা’, ইতিহাস মনে রেখেছে পরান ময়রাকে

হালুইকর প্রাণ নাগের উপর আস্থা রাখত মুখোপাধ্যায় পরিবার। প্রাণ ময়রার আরেক পরিচয় তিনি ভীম নাগের বাবা। যে সময়ের কথা বলছি, তখন পরপর দু’বছর তিনি তেমন তাক লাগানো মিষ্টি উপহার দিতে পারেননি।

কোপনস্বভাব জমিদারের মন হরণ করেছিল জনাইয়ের ‘মনোহরা’, ইতিহাস মনে রেখেছে পরান ময়রাকে

জনাইয়ের মনোহরা

শেষ আপডেট: 15 April 2025 13:41

রূপক মিশ্র

সেটা ছিল পরান ময়রার তিন নম্বর সুযোগ।

আগের দুবার তুষ্ট করতে পারেননি জমিদার পার্বতীচরণ মুখোপাধ্যায়কে। অষ্টমীর দিন বন্ধুবান্ধবেরা এসেছিলেন। খেতে বসেছিলেন সদলবলে। কিন্তু দু’বারই নিরাশ হয়েছেন সকলে। রান্নার বাকি পদ সুস্বাদু হলেও শেষপাতের ‘অভিনব’ মিষ্টিটি ঠিক মন হরণ করতে পারেনি।

জনাইয়ের মুখোপাধ্যায় পরিবারে দুর্গাপূজার রমরমা বরাবরই ছিল। তবে তাক লাগাত অষ্টমীর আয়োজন। ভোগের থালা সেজে উঠত নৈবেদ্য আর রকমারি পদে। কিন্তু সবার নজর থাকত মিষ্টান্নের দিকে। কারণ, পারিবারিক প্রথা মেনে ফি-বছর নতুন আনকোরা ধরনের মিষ্টি তৈরির বরাত দেওয়া হত ময়রাকে।

হালুইকর প্রাণ নাগের উপর আস্থা রাখত মুখোপাধ্যায় পরিবার। প্রাণ ময়রার আরেক পরিচয় তিনি ভীম নাগের বাবা। যে সময়ের কথা বলছি, তখন পরপর দু’বছর তিনি তেমন তাক লাগানো মিষ্টি উপহার দিতে পারেননি। এদিকে ছোটকর্তা পার্বতীচরণ কোপনস্বভাবের মানুষ। অল্পেই রেগে আগুন। তাই এবার তুষ্ট করতে না পারলে শাস্তি জোটাও অসম্ভব কিছু নয়।

যথারীতি অষ্টমীর দিন জমিদারবাবুরা বন্ধুবান্ধব মিলে খেতে বসেছেন। শেষপাতে পরিবেশিত হল বিশেষ মিষ্টান্ন। সকলের থালায় নিজহাতে পরিবেশন করলেন প্রাণ নাগ। অনেক কষ্ট করে বুদ্ধি খাটিয়ে বানিয়েছেন সেবারের মিষ্টি। রূপে-রঙে-রসে একেবারে নতুন। সকলে খাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু প্রাণ ময়রার নজর শুধুমাত্র পার্বতীবাবুর দিকে। জমিদারভ্রাতা হাতে তুলেই মুখে পুরেছেন। আর বারকয়েক কামড় দিয়েছেন। হঠাৎ প্রাণ ময়রা খেয়াল করলেন বাবুর মুখ গম্ভীর। অথচ চোখ বুজে এসেছে। এ কী প্রশান্তির সংকেত নাকি বিরক্তির? বোঝার চেষ্টা চালালেন প্রাণ ময়রা। কিন্তু কিছুই মাথায় ঢুকল না।

বাধ্য হয়ে জোড় হাতে দুরুদুরু বুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন লাগল বাবু? আপনি খুশি তো?’

কথাটা কানে যেতেই চোখ খুললেন পার্বতীচরণ। তারপর একগাল হেসে বলে উঠলেন, ‘শুধু ভাল? কোন অপূর্ব মিষ্টি বানিয়েছ তুমি! এ যে আমার প্রাণ হরণ করে নিল। মন হরণ করে যে, সেই তো মনোহরা!’

জমিদারবাবুর মুখভরা প্রশান্তি আর ওই একটি কথাই মিশে যায় নবজাত মিষ্টির নামকরণে। লোকমুখে প্রবাদের মতো ছড়িয়ে যায় ‘মনোহরা’র সুখ্যাতি।

তবে অন্যান্য লোকশ্রুতির মতোই মনোহরার জন্মরহস্য একটিমাত্র কাহিনিতে আটকে ছিল না। দ্বিতীয় গল্পের পটভূমি বর্ধমান। সেখানে অতিথি হিসেবে আসবেন লর্ড ক্যানিং। আর তাঁকে উপঢৌকনে দিতে হবে বিশেষ কোনও মিষ্টি। ফলে ডাক পড়ল নেরা ময়রার। তিনিও প্রাণ নাগের মতো মাথা খাটিয়ে অভিনব এক মিষ্টান্ন তৈরি করলেন। আর তা খাওয়া মাত্র আপ্লুত হলেন ক্যানিং সাহেব। আর সেই থেকে ছড়িয়ে পড়ল মনোহরার সুখ্যাতি।

সাহিত্যের ইতিহাসকারেরা অবশ্য এই শ্রুতিগল্প মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, উনিশ শতক নয়, মধ্যযুগ থেকেই বাংলা রসনাসংস্কৃতির সঙ্গে মনোহরার নিবিড় যোগ। ‘পদ্মপুরাণে’ এই বিশেষ মিষ্টান্নের উল্লেখ রয়েছে। সেই ধারাকেই নিজের গানে সংশ্লেষ করেছেন রামনিধি গুপ্ত। টপ্পা গানের বোলে মিলিয়ে দিয়েছেন মনোহরার মিষ্টত্ব। লিখেছেন:

‘খাওয়াইব গন্ডা গন্ডা মনোহরা দেদো মণ্ডা

খেয়ে খেয়ে যাবে প্রাণটা, বলবে বলিহারি যাই।‘

ছানা, চিনি, এলাচ, জায়ফল আর পেস্তার গুঁড়ো মনোহরার মূল উপকরণ। প্রথমে ছানার সঙ্গে চিনি, জায়ফল আর এলাচ মিশিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। তৈরি হয় পাক। এরপর পাক তৈরি হলে উনুন থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করার পালা। কিছুক্ষণ বাদে সেই মিশ্রণ হাতে নিয়ে গোল্লা পাকিয়ে পেস্তার গুঁড়ো মাখিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় চিনির রসে। সিরায় খানিক চুবিয়ে ফের তুলে আনলেই তৈরি হয় মনোহরা।

আগে ফ্রিজিংয়ের চল ছিল না। তাই মিষ্টির মেয়াদ বাড়াতে রসে-চুবোনোর ফলে উপরে জমাট বাঁধা চিনির আস্তরণকে কাজে লাগানো হত। কারণ এর ফলে মনোহরা সহজে নষ্ট হত না। অনেক দিন রেখে খাওয়া যেত।

জনাই বাজারে রয়েছে কমল ময়রার দোকান। চাকচিক্যহীন, সাদামাটা। ভীম নাগেরই আত্মীয়। কমলবাবুর ছেলে নবকুমার দাস দোকান সামলান। কোনও কারিগর নেই। একা হাতে মিষ্টি বানান। কিন্তু ছানা ও দুধের গুণমান কমে যাওয়ায় ইদানীং এর চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি মিষ্টত্বের পরিমাণ অনেকটা বেশি হওয়ায় ঐতিহ্যকে দূর থেকে নমস্কার করছে এখনকার প্রজন্মের বাঙালি গ্রাহক; মনোহরাকে মুখে তোলা কারও সাহসে কুলিয়ে উঠছে না।

মিষ্টান্নের এই রুচিবদলকে একদিক দিয়ে হীনপ্রভ বাঙালির ক্রমিক ক্ষয়ের অকাট্য দলিল হিসেবেও দেখা যায় না কি?


```