উনিশ শতকের নবজাগরণে উপেক্ষিত মুসলমান সমাজে আলো জ্বালানো বেগম রোকেয়ার সংগ্রাম, শিক্ষা বিস্তার, ‘অবরোধবাসিনী’ ও ‘সুলতানার স্বপ্ন’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

বেগম রোকেয়া।
শেষ আপডেট: 9 December 2025 13:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস যখনই সামনে আসে, আলোটা প্রায়ই গিয়ে পড়ে কলকাতা-কেন্দ্রিক অভিজাত সমাজের ওপর। গবেষণার পাতায় রামমোহন, বিদ্যাসাগর, দীনবন্ধু— এঁদের নাম জ্বলজ্বল করলেও, একই সময়ের মুসলমান সমাজে যে সমানতালে নবজাগরণের ঢেউ উঠেছিল, তা যেন ইচ্ছে করেই আড়ালে ঢেকে রাখা হয়। আর সেই ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল, অথচ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত নাম— বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০–১৯৩২)।
উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে বাংলার সমাজজীবন বদলে দিচ্ছিল যে নববোধ, রোকেয়া ছিলেন তার অন্যতম প্রখর মুখ। কিন্তু মূলধারার ঐতিহাসিকরা এই অবদানকে কখনও সমমর্যাদা দিতে চাননি। না নওয়াব আবদুল লতিফকে, না সৈয়দ আমির আলিকে, না ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীকে, না রোকেয়াকে। যেন নবজাগরণ কেবল হিন্দু অভিজাতেরই সম্পত্তি!
কলকাতা-কেন্দ্রিক বয়ানে চাপা পরে গেছে পূর্ববঙ্গের কুমিল্লা, রংপুর, বরিশালের গল্প, যেখানে মুসলমান অভিজাত সমাজে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছিল আধুনিক শিক্ষা, ইউরোপীয় নববোধ, যুক্তিবাদ।
কুমিল্লায় ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর উদ্যোগে মেয়েদের জন্য স্কুল, তাঁর লেখা ‘রূপজালাল’— এসব আমরা কোনও পাঠ্যবইয়ে পাই না। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অম্লান দত্ত পর্যন্ত তাঁরই প্রতিষ্ঠিত স্কুলে পড়েছেন, তবে সেভাবে কখনও কিছু লেখালেখি করেননি এ নিয়ে। শুধু ক্ষেত্র গুপ্ত ছিলেন সেই বিরল ব্যতিক্রম, যিনি সত্যিই বাঙালি মুসলিম সমাজের নবজাগরণকে সম্মান দিয়েছেন।
এই অন্ধকারেই উদ্ভাসিত হয় রোকেয়ার পরিবার। রংপুরের পায়রাবন্দের গজনভী ভাইরা, দিগন্ত উজ্জ্বল আধুনিক শিক্ষায় বিশ্বাসী, যাঁদের লেখাপড়া, দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজবোধ রোকেয়ার আত্মজাগরণের ভিত গড়ে দেয়।
রোকেয়া জানতেন, নারীর মুক্তি শুরু হয় শিক্ষার আলোয়। তাই তাঁর সারা জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল, মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা, বিশেষ করে মুসলমান মেয়েদের প্রথাগত রক্ষণশীলতার জাল ছিঁড়ে শিক্ষার জায়গায় আনা।
স্বাভাবিকভাবেই সমাজ তাঁকে থামাতে চেয়েছে। কটূক্তি, সন্দেহ, বাধা— কিছুই কম ছিল না। তবু তিনি থামেননি।
ভাগলপুরে স্বামীর মৃত্যু, সতীন-কন্যার শত্রুতামূলক আচরণ, আর্থিক সংকট— সবকিছুর মধ্যেও নিজের সামান্য স্ত্রীরূপে পাওয়া সম্পদ নিয়েই প্রথম স্কুল শুরু করেন। স্বামীর সহকর্মীদের সমর্থনে এগিয়ে যান। পরে বাধ্য হয়ে কলকাতায় চলে আসলেও একই নিষ্ঠায় আবার শুরু করেন নতুন লড়াই। লক্ষ্যেও পৌঁন।
রোকেয়ার জীবনের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ অস্ত্র ছিল তাঁর কলম। শৈশব-কৈশোরে দেখা পর্দার যন্ত্রণা তাঁকে দগ্ধ করেছিল। আর সেই আগুন থেকে জন্ম নেয় ‘অবরোধবাসিনী’— মুসলমান নারীর অন্তঃপুরের যন্ত্রণার প্রথম বাস্তব, ধারালো, শ্লেষাত্মক দলিল।
হিন্দু সমাজে নারীর নিগ্রহ নিয়ে ‘পিঞ্জরে বসিয়া’ যেমন হৃদয়বিদারক, অবরোধবাসিনী সেই যন্ত্রণার অন্য রূপ। আরও নীরব, আরও কঠিন, আরও নির্যাতনঘন।
এই লেখাই প্রথম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, পুরুষতন্ত্র নারীর স্বাধীনতা কেড়ে নেয় এ কথা যেমন ঠিক, তেমনই নারীর ভিতরেও রয়ে গেছে নানা ভয়, লজ্জা, গ্লানি থেকে জন্ম নেওয়া আত্ম-অবরোধ।
রোকেয়ার ‘Sultana’s Dream’ শুধু কল্পবিজ্ঞান নয়, শুধু নারীবাদ নয়— এটি নারীর নিজের পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন। যেখানে সমস্ত কাজ, বিজ্ঞান, শক্তি নারীর হাতে। পুরুষরা সেখানে অনুপস্থিত, কারণ তারা নিপীড়ক নয়, বরং সমাজের রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় অপ্রাসঙ্গিক।
কিন্তু দুর্ভাগ্য, এই সাহসী কল্পনা আজও অনেকেই ভুল বুঝে ‘পুরুষবিদ্বেষ’ বলে চালান। অথচ অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘রত্ন ও শ্রীমতী’তে একই ধরনের নারী-ভুবন গঠনের কল্পনায় কেউ তাঁকে ‘পুরুষবিদ্বেষী’ বলে না।
নারীর লেখায় নারীর স্বপ্ন দেখলে সমস্যা কেন, এই প্রশ্নের উত্তর মেলা আজ আর কঠিন নয়।
রোকেয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর বুদ্ধিমত্তা। তিনি জানতেন, নারীর মুক্তি পুরুষকে শত্রু বানিয়ে নয়, সমাজকে সঙ্গী করেই সম্ভব।
তাই তিনি আন্দোলন করলেও কখনও চিৎকার করেননি। প্রতিবাদের আগুন জ্বেলেও সংঘাত তৈরি করেননি। সাহস, শ্লেষ, ব্যঙ্গ— সবই ছিল, কিন্তু অশান্তি ছিল না।
স্কুল পরিচালনার সময় তিনি নিজের অবস্থান নিয়ে কখনও সমাজকে প্ররোচিত করেননি, প্রয়োজনে কর্মসমিতির বৈঠকে থেকে চিকের আড়ালে থেকেছেন। পরিচারিকার মাধ্যমে কথা বলেছেন। কারণ তিনি জানতেন, লক্ষ্য বড়, অহং নয়। পরিবর্তন বড়, প্রতিশোধ নয়।
এই পরিমিতিবোধই তাঁকে আলাদা করে।
বেগম রোকেয়ার জন্মদিন, এবং মৃত্যুদিবস— দুটোই ৯ ডিসেম্বর। তিনি ছিলেন নবজাগরণের সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যিনি নীরব, ধারালো, তীব্র শক্তিতে ইতিহাসের অন্ধকারকে চিরে দিয়েছেন।
আজও তাঁর লেখা, তাঁর পথ, তাঁর স্বপ্ন আমাদের শেখায়, শিক্ষাই মুক্তি। শেখায়, সমাজ বদলায় যুক্তিতে, ত্যাগে, বুদ্ধিমত্তায়। এবং সব শেষে, সাহসী কণ্ঠ কখনও নেভে না।