
শেষ আপডেট: 7 March 2022 12:30
কিন্তু এখন, নারীদের সিঁথিতে সিঁদুর দেখলে নারীবাদী (feminist) মহল ধিক্কার জানায়। শাঁখা, পলা তো বেরি, দাসত্বের শৃঙ্খল! সে নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন এখনকার নারীরাও, শুধু ফ্যাশনের জন্য পরবেন না স্বামীর মঙ্গল কামনায়? কী হবে সিঁদুর না পরলে? আচ্ছা, সিঁদুর (sindoor) নিয়ে যে ঐতিহাসিক জনশ্রুতি চালু রয়েছে সে কি সত্যি? সত্যিই কি মাথা ফাটিয়ে নারীদের জয় করে আনার ঘৃণ্য ইতিহাসের স্মারক ওই সিঁদুর? প্রসঙ্গ তুলতেই ইতিহাসবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী রীতিমত রেগে গেলেন। বললেন, শুধু কি এই বিকৃত ইতিহাসটুকুই চোখে পড়ে? সিঁদুর যে শক্তির প্রতীক, নারীই যে শক্তির আধার, সেই ক্ষমতায়নের চিহ্ন হিসেবে কি কখনই দেখা হবে না সিঁদুরকে? সে নিয়ে কথায় কথায় সমুদ্র গড়াল। তাতে দ্বিধা কতটা দূর হল তা সময় বলবে। তবে সিঁথি থেকে সিঁদুর সরিয়ে রেখে অন্য কয়েকটি দিক থেকে সিঁদুরকে (sindoor) বিচার করা গেল।
কী এই সিঁদুর (Sindoor)?
সাংখ্য ও বেদান্ত দর্শন মতে পুরুষ সাক্ষীস্বরূপ। আর যে জ্ঞেয় বস্তুর সাক্ষী পুরুষ, তা-ই প্রকৃতি। প্রকৃতি শুরুতে অব্যক্ত থাকে, তার মধ্যেই সুপ্ত অবস্থায় থাকে সৃষ্টির মৌলিক উপাদান — পদার্থ ও শক্তি, গুণত্রয় (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ), এবং দেশ ও কাল। এটাই হল জগতের কারণ বা বীজাবস্থা। প্রকৃতি অব্যক্ত থাকার কারণে পুরুষ দেশ-কাল-গুণ রহিত এক শূন্যতার সাক্ষী।
অর্ধেক আকাশের কথা উপনিষদে রয়েছে, এ কথা কেবল মাও সেতুংয়ের নয়। প্রতি প্রাণী অসম্পূর্ণ, তার অর্ধাংশ হয় আরেক প্রাণ। দুইয়ে মিলে সৃষ্টি। যেমন দ্বিদল কথা থেকে ডাল শব্দটা এসেছে, যে ডাল আমরা খাই। ওপরের পাতলা আবরণ সরালে ভেতরে পাশাপাশি দুটি বীজের দোসর, যেন নারী আর পুরুষ। নারী তেমনই প্রকৃতির প্রতীক কিন্তু উপনিষদ বলে পুরুষ নির্গুণ। তার ভোগশক্তি নেই, কেবল অনন্ত চেতনা আছে। আর নারী নিস্তরঙ্গ, তার ভোগশক্তি আছে। পুরুষের চেতনার দৃষ্টিতে নারী চৈতন্যময়ী। সেইসময়ে জাগতিক চাঞ্চল্যে সৃষ্টি হয় প্রাণ। তাই নারীর মধ্যেই রয়েছে রজ: গুণ। রয়েছে তম: গুণও, যা অন্ধকার, প্রলয়ের প্রতীক। বলতে বলতেই স্পষ্ট ভেসে আসতে পারে কালীর অবয়ব। কালী কারও স্ত্রী নন। তিনি শক্তির প্রতীক।
ধনুকে তির জোড়ার ভঙ্গিতে বাঁ পা পিছিয়ে ডান পা এগিয়ে দেন শিবের বুকে। আর শিব নীচে নিথর পড়ে থাকেন, শবের মতো। এই ভঙ্গিতে এসে মিশে যায় রজ: এবং তম: গুণ, যা সৃষ্টি আর প্রলয়ের দুই পিঠ। সে হেন কালীকে রক্ত দিয়ে পুজো করা হবে, সিঁদুরের টিকা পরানো হবে এই তো স্বাভাবিক। কারণ লাল রজ: গুণের প্রতীক। খেয়াল করলে দেখা যাবে ক্ষত্রিয়দের পৈতের রং ছিল লাল। রজ: অর্থাৎ রাজসিক চিহ্ন ধারণ করতেন ভারতীয় বীরেরাও।
তন্ত্র সাধনায় কোনও মূর্তি পুজো না হলেও শক্তির উপাসনার মাধ্যমে সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ গুণের স্তব করা হয়। সেখানে লাল রং অপরিহার্য। সে সিঁদুরে হোক কিংবা রক্তে। কখনও কখনও সিঁদুর আর রক্ত এক হয়ে গিয়েছে সাধনায়। যেমন এক হয়েছে ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে সৃষ্টি। কারণ, রক্ত ছাড়া যে প্রাণ অচল! রক্ত খুন না জীবনের গান গায় সে ইতিহাসও লুকিয়ে আছে আদিতেই। সিঁদুরও তেমনই, বিভিন্ন সভ্যতা তাকে উজ্জ্বল এক রং হিসেবে বরণ করে নিয়েছে, নাম দিয়েছে ভার্মিলিয়ন রেড। চীনে লাল রঙে যে বিপ্লবের গন্ধ তা কিন্তু এই সিঁদুরেও। বিষাক্ত কিংবা প্রাকৃতিক, সমাজ হোক বা সন্ত্রাস, নারীর সিঁথিতে চড়ার অপেক্ষা করেনি এই রং, সে আদি অনন্তের প্রতীক, আবহমান।
গয়নার বিকল্প হতে পারে সিঁদুর! কীভাবে, বলছেন মেকআপ ডিজাইনার