থরে থরে চন্দনকাঠে সাজানো অন্তিম শয্যায়, নিথর হয়ে শুয়ে আছেন জুবিন গর্গ। সুরের জগৎ হারিয়েছে তার এক প্রিয় সন্তানকে। এ যেন তাঁরই গাওয়া গান— ‘ইয়ে দিল জায়ে পত্থর কা, না ইসমে কোই হলচল হো’— জীবন্ত রূপে ফুটে উঠল বিদায়ের মুহূর্তে।

জুবিন
শেষ আপডেট: 24 September 2025 15:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: থরে থরে চন্দনকাঠে সাজানো অন্তিম শয্যায়, নিথর হয়ে শুয়ে আছেন জুবিন গর্গ। সুরের জগৎ হারিয়েছে তার এক প্রিয় সন্তানকে। এ যেন তাঁরই গাওয়া গান— ‘ইয়ে দিল জায়ে পত্থর কা, না ইসমে কোই হলচল হো’— জীবন্ত রূপে ফুটে উঠল বিদায়ের মুহূর্তে। গোটা দেশ, বিশেষ করে অসম কেঁদে উঠল এই ক্ষতি মেনে নিতে না পেরে। চোখের জল মুছতে মুছতে ভক্তরা শেষ যাত্রাতেও গাইলেন তাঁর গান ‘মায়াবিনী’— সেই গান, যা তিনি নিজেই একদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলে গিয়েছিলেন, “আমার মৃত্যুর পর যেন গোটা অসম এই গান গায়।”
১৯৯২ সালে পেশাগত জীবনে গান শুরু করেছিলেন জুবিন। অহমিয়া ছবির পাশাপাশি বাংলা সিনেমায়ও তাঁর সুরেলা কণ্ঠ ছুঁয়েছিল অগণিত হৃদয়। সঙ্গীত পরিচালক জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘মন মানে না’, ‘পিয়া রে’-র মতো গান তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। বলিউডে প্রীতমের হাত ধরে গ্যাংস্টার ছবির গান “ইয়া আলি” শুধু হিট হয়নি, গোটা দেশে ঝড় তুলেছিল। তবুও ঝড়ের মতো এসেছিল বিতর্কও। নেশাগ্রস্ত হয়ে মঞ্চে গান গাওয়ার অভিযোগে বহুবার সমালোচিত হয়েছেন তিনি। অনেকেই বলতেন, অসাধারণ প্রতিভা হয়েও অনিয়ন্ত্রিত জীবন তাঁকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল অন্ধকারের দিকে।
তবু তাঁর শিল্পীসত্তা ছিল অনন্য। তিন বছর বয়স থেকেই সঙ্গীতের সাধনা শুরু। প্রথম গুরু তাঁর মা। সেই সাধনা তাঁকে বানিয়ে দিয়েছিল অসমের সুরের সম্রাট। অথচ জীবনের অন্তিম অধ্যায়ে তিনি জানিয়েছিলেন এক গভীর ইচ্ছা— গুয়াহাটির মহাবহু ব্রহ্মপুত্র রিভার হেরিটেজ সেন্টার-এর শান্ত প্রাঙ্গণেই থাকতে চান জীবনের শেষ দিনগুলো। বলেছিলেন, “আমি একজম আর্মি। মৃত্যু নিয়ে ভয় নেই। মরার পর চাই আমাকে ব্রহ্মপুত্র নদে ভাসিয়ে দেওয়া হোক।”
সেই ইচ্ছার প্রতিধ্বনি মিলল তাঁর শেষকৃত্যের দিনেও। শেষ হল প্রিয় শিল্পীর অন্তিম যাত্রা। বৈদিক মন্ত্র আর অনুরাগীদের গানের সুরে আচ্ছন্ন পরিবেশে বিদায় জানানো হল তাঁকে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের মতোই শেষ সময়েও পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। যেহেতু সন্তানহীন ছিলেন জুবিন, তাই মুখাগ্নি করলেন ছোট বোন পামী বড়ঠাকুর। সঙ্গে ছিলেন তাঁর সহযোগী অরুণ ও কবি-গীতিকার রাহুল।
অসম সরকারও ভক্তদের হৃদয়ে চিরজীবী করে রাখতে নিয়েছে এক অভিনব উদ্যোগ। রাজ্যের শিল্প-সংস্কৃতি মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে এক বিশেষ অনলাইন পোর্টাল। সেখানে নাম-ঠিকানা লিখে আবেদন করলেই পাওয়া যাবে জুবিন গর্গের চিতাভস্মের অংশ। ইতিমধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রী ডা. রণোজ পেগু জানিয়েছেন, রাজ্যের যে কোনও অনুষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠান চাইলে এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবে, এবং প্রয়োজনে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হবে প্রিয় শিল্পীর চিতাভস্ম। এছাড়াও দ্বিতীয় সমাধিস্থল গড়ার লক্ষ্যে চিতাভস্মের একাংশ যোরহাটে পাঠানো হবে। একইসঙ্গে গুয়াহাটির কামারকুচি ময়দানে তৈরি হবে তাঁর স্মৃতিফলক।
আমাৰ আদৰৰ শিল্পী জুবিন গাৰ্গৰ শেষকৃত্য সুকলমে সমাপন হৈছে। ইতিমধ্যে অস্থি পৰিয়ালক অৰ্পণ কৰা হৈছে। চিতাভস্ম সংগ্ৰহ কৰি অসম চৰকাৰৰ সাংস্কৃতিক পৰিক্ৰমা বিভাগক অৰ্পণ কৰা হৈছে। সাংস্কৃতিক পৰিক্ৰমা বিভাগে ইয়াক সুৰক্ষিত কৰি ৰাখিব আৰু অসমৰ কোনো অনুষ্ঠান-প্ৰতিষ্ঠানে এই চিতাভস্ম বিচাৰিলে… pic.twitter.com/58pFJJZ7uo
— Ranoj Pegu (@ranojpeguassam) September 23, 2025
শেষকৃত্যের নানা ভিডিও ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেখানে দেখা যাচ্ছে— ভিড় জমেছে শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে, অশ্রুসজল চোখে ভক্তরা একবারের জন্য হলেও ছুঁয়ে দেখতে চাইছেন তাঁর স্মৃতি। অস্থি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার পর চিতাভস্ম সংরক্ষণ করেছে অসম সরকার। সেই স্মৃতি আজ ভক্তদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা যেন হয়ে উঠেছে জুবিনের অমরত্বের প্রতীক।
জীবনভর তিনি ছিলেন সঙ্গীতের সৈনিক। কখনও ভাঙা সুরে, কখনও অগ্নিময় কণ্ঠে ভরে তুলেছেন অগণিত মানুষের জীবন। আর মৃত্যুর পরেও সেই সুর যেন ভেসে বেড়াচ্ছে ব্রহ্মপুত্রের বুকে, গেয়ে চলেছে তাঁর অসম। সময় কেটে যাবে, প্রজন্ম বদলাবে, কিন্তু মায়াবিনীর মতোই ভেসে থাকবে তাঁর গান— আর ভক্তদের হৃদয়ে জুবিন থাকবেন চিরকাল।