নারীপ্রধান সিনেমার প্রশংসায় সোশ্যাল মিডিয়া সরব, কিন্তু প্রেক্ষাগৃহ ফাঁকা কেন? আমরা কি সত্যিই সাহসী নারী চরিত্রের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত, নাকি সমর্থন শুধুই ‘লাইক’ আর ‘শেয়ার’-এ সীমাবদ্ধ?

নারীপ্রধান ছবির প্রশংসা আছে, দর্শক নেই!
শেষ আপডেট: 24 February 2026 18:01
প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু তার গভীরে লুকিয়ে থাকা সত্যিটা বেশ অস্বস্তিকর। আমরা যখন কোনও কিছুকে মনে-প্রাণে পছন্দ করি, তখন কেন স্রেফ ‘লাইক’ বা ‘শেয়ারে’ থেমে যাই? কেন আমাদের সেই ভাললাগা সিনেমা হলের টিকিট কাউন্টার পর্যন্ত পৌঁছায় না? কেন আমাদের সমর্থন শুধুমাত্র ফেসবুকের লম্বা ক্যাপশনে আটকে থাকে, কিন্তু পকেটের টাকা খরচ করে টিকিট কেনার সময় আমরা পিছিয়ে আসি? বিশেষ করে হিন্দি সিনেমায় নারীপ্রধান চরিত্রগুলোর ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটা এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা কী চাই আর কী করি?
একটা জিনিস খেয়াল করে দেখবেন, আমরা প্রায়ই বলি, পর্দায় 'ইনডিপেনডেন্ট' নারী চরিত্র দেখতে চাই। এমন নারী, যারা শুধু নায়কের প্রেমিকা হয়ে থাকবে না, বরং যারা কথা বলবে, প্রশ্ন করবে এবং সমাজকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। আমরা সূক্ষ্ম অভিনয়ের প্রশংসা করি, ট্রেলার শেয়ার করে লম্বা পোস্ট লিখি যে, হিন্দি সিনেমা কত বদলে যাচ্ছে! কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই বদলেছে?
‘হক’ থেকে ‘মর্দানি’: প্রশংসা যখন আকাশছোঁয়া, প্রেক্ষাগৃহ তখন দর্শকশূন্য
উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যাক 'হক' সিনেমাটির কথা। একজন নারী যখন নিজের মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে ধর্মীয় কাঠামোর মুখোমুখি হয়, তখন আমরা ইন্টারনেটে ধন্য ধন্য করি। অথচ প্রেক্ষাগৃহে ছবিটির সাড়া ছিল ম্লান। যখন ওটিটি-তে এল, তখন শুরু হল কাটাছেঁড়া, বড় বড় প্রবন্ধ লেখা। প্রশ্ন হল, ছবিটির জন্য সব স্বীকৃতি কেন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে আসার পরেই মিলবে?

একই ছবি ধরা পড়েছে 'মর্দানি ৩'-এর ক্ষেত্রেও। ভারতের অন্যতম বিরল নারীপ্রধান ফ্র্যাঞ্চাইজি এটি। এর সাহস আর বাস্তবের রুক্ষতাকে আমরা বাহবা দিই ঠিকই, কিন্তু সেই প্রশংসা কি দর্শকদের হলে টেনে আনতে পারছে? স্রেফ হাততালি দিয়ে কি সিনেমাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব?

‘অসি’র কাঠগড়ায় এবার খোদ সিনেপ্রেমীরা
পরিচালক অনুভব সিনহার ছবি 'অসি' নিয়ে অভিনেত্রী তাপসী পান্নু ইদানীং বেশ সোজাসাপ্টা কথা বলছেন। তিনি স্পষ্টই জানিয়েছেন, হিন্দি সিনেমা বাস্তব গল্প বলে না, এমন অজুহাতের আড়ালে যেন দর্শকরা আর না লুকোয়। কারণ, যখন নারীদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া অপরাধের বাস্তবতাকে তথ্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়, যখন যৌন হিংসার স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন দর্শক হিসেবে আমরাই ইতস্তত বোধ করি।

আমরা আসলে কার জন্য লাইন দিই?
আমাদের কি তবে পর্দার কেন্দ্রে একজন সাহসী নারীকে দেখতে অস্বস্তি হয়? একজন পুরুষ নায়ক যখন অন্যায়ের প্রতিশোধ নেয়, তখন আমরা যতটা উৎসাহ পাই, একজন নারী যখন সেই অন্যায়ের ব্যবচ্ছেদ করে, তখন কেন আমরা চুপসে যাই?
'বর্ডার ২' বা 'ধুরন্ধর'-এর মতো বড় মাপের অ্যাকশন সিনেমার জন্য মানুষ লাইন দিচ্ছে, টাকা খরচ করছে—সেটা স্পষ্ট। কিন্তু সেই একই জিনিস কেন শুধু নারীপ্রধান সিনেমার ক্ষেত্রেই হারিয়ে যায়? কেন আমাদের সমর্থন এখানে এসে 'বাছাই করা' হয়ে যায়?
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষ প্রশ্ন, আমরা কি নারীপ্রধান গল্পের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত?
এই সিনেমাগুলো আমাদের নীতিশিক্ষা দিতে আসে না, এগুলো স্রেফ রক্তমাংসের নারীর বেঁচে থাকার আর লড়াই করার গল্প। সিনেমা কখনও শুধু প্রশংসায় বাঁচে না, সিনেমা বাঁচে টিকিট বিক্রির সংখ্যায়। যতবারই আমরা গুণমান বনাম ব্যবসার বিতর্ক তুলি না কেন, দিনশেষে টিকিট বিক্রির সংখ্যাই বলে দেয় সমাজ কোন গল্পটাকে গ্রহণ করেছে।
যদি সিনেমার পর্দায় লিঙ্গসাম্য আর সাহসী গল্পের জয়গান গাওয়া আমাদের সত্যিকারের লক্ষ্য হয়, তবে সেই লড়াইয়ের প্রমাণ সোশ্যাল মিডিয়ার ‘টাইমলাইন’ নয়, দিতে হবে প্রেক্ষাগৃহের ‘টিকিট কাউন্টারে’। আমরা যদি হলের অন্ধকার ঘরে বসে সেই লড়াই দেখার সাহস না দেখিয়ে স্রেফ ওটিটি-তে আসার জন্য দিন গুনি, তবে শিল্পের এই পরাজয়ের দায় কোনও নির্মাতার নয়, সেই দায় একান্তই আমাদের।
হিন্দি সিনেমা কেন নারীপ্রধান গল্প বলছে না, সেই একঘেয়ে অভিযোগ এবার তোলা বন্ধ করা উচিত। কারণ গল্প তো ঠিকই বলা হচ্ছে, কিন্তু আমরা কি সেই গল্পের হাত ধরার সাহসটুকু দেখাতে পারছি? তাই পরের বার বড় বড় বুলি আউড়ানোর আগে একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কি সত্যিই সেই সাহসী নারী চরিত্রের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত? নাকি আপনার সমর্থনটুকু কেবলই ইন্টারনেটের সস্তা হাততালিতেই সীমাবদ্ধ?