
সিলসিলা (১৯৮১) চলচিত্রের একটি দৃশ্যে ভাং-পানরত অমিতাভ বচ্চন।
শেষ আপডেট: 24 March 2024 19:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ' যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি। একেবারে ছিছিক্কার করার মত নয়। লোকে শুনলে ঘরে শেকল তুলে দেবে না। পুলিশের ভয় নেই, খুব রক্ষণশীল বাড়ি হলেও ভয়ে ভয়ে খোলসা করা যায়। আবার একটা নিষিদ্ধ, রহস্যময় মদিরতার আভাসও আছে। দোলে তুমুল রঙ খেলার পর সেটা যেন অনেকটাই তরতাজা কেকের ওপর সুমিষ্ট ক্রিমের প্রলেপ!
আজ্ঞে হ্যাঁ, ভাঙের কথাই হচ্ছে!
কতই তার রঙ, কতই তার রূপ! চাইলে লস্যির মত এলাচের সুমিষ্ট আস্বাদ দিয়ে খাওয়া যেতে পারে। না হলে কুলফি-মালাই আছে। চাইলে চকোলেট, কেক, কুকিজেও মিশিয়ে নেওয়া যায়। আরও কত রকম পন্থা আছে! ভাঙ হলেই হল! কবি তো সেই কবেই বলে গিয়েছেন, ভাংকে... থুড়ি, গোলাপকে যে নামেই ডাকো না কেন...!
কিন্তু একটা প্রশ্ন তো প্রথমেই খোঁচা মারে। ভাঙ এবং গঞ্জিকা আসলে একই মায়ের দুই সন্তান। ভাং বানানো হয় 'ক্যানাবিস', অর্থাৎ গাঁজা গাছের পাতা থেকে। অথচ গাঁজা বা গঞ্জিকা আসে সেই একই গাছের বীজ অথবা বোঁটা থেকে। অথচ গঞ্জিকা সেবন শব্দটা শুনলেই রে রে করে তেড়ে আসে হাজারটা নিষেধাজ্ঞা, এমনকি আইনি বাধাবিপত্তিও। অথচ ভাঙে এরকম কিছুই নেই। উলটে সমাজ-সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙের মাহাত্ম্য ও আবেদন দুইই বেশ স্বীকৃত।
এক যাত্রায় এ'হেন পৃথক ফল কেন?
বস্তুত, 'আজ' নয়, বহুকাল আগেই দু'জনার দু'টি পথ দু'টি দিকে বেঁকে গিয়েছে। সৌজন্যে, ভারতের ১৯৮৫ সালের 'নারকোটিক্স ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্স' আইন। গাঁজা গাছের উপাদান সেবন আইনসিদ্ধ কিনা, সেই নিয়ে বিতর্ক যদিও বহুদিন আগে থেকেই ছিল। কিন্তু সেই সেবন ও অপরাধ-প্রবণতাকে এক করে দেখার চল আশির দশকের। এসব ক্ষেত্রে খানিক মার্কিন প্রভাবও ছিল। টলায়মান সোভিয়েতের দুর্দিনে আমেরিকার নেকনজরে থাকা ভারতের জন্য দরকার ছিল। ফলে ভারতে আইন পাশ হয়ে যায়। কিন্তু আইনটিকে এমন সুচারুভাবে লেখা হয় যে, গাছের ফুল-ফল-বীজ সবকিছু নিষেধাজ্ঞার আওতায় গেলেও গাছের পাতাকে বাদ রাখা হয়। ফলে আইনের হাত থেকে জোর বাঁচান বেঁচে যায় ভাঙ।
আদতে, এই বাদ রাখাটাও যথেষ্ট ভেবেচিন্তেই করা হয়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে ভাঙের ব্যবহার ও সেবন সুপ্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব এক সহস্র বছর আগে রচিত বিভিন্ন লেখমালায় ভাঙের উল্লেখ আছে। অথর্ববেদেও ভাং-এর নজির উপস্থিত। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, আপামর সাধারণ মানুষের মধ্যে এর ব্যবহার। উত্তর ও মধ্যভারতের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে গঞ্জিকা পাতা শুকনো করে গুঁড়ো করে বা পেষাই করে ঠাণ্ডা জল বা টক দই বা দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার প্রথা বেশ সুপরিচিত। এতে যেমন বিষয়টা সহজলভ্য হয়, পাশাপাশি অ্যালকোহলের বিষক্রিয়ার মত একাধিক রাসায়নিক কুপ্রভাবও এড়ানো যায়। ফলে দৌড়ে গঞ্জিকা হেরে গেলেও বেশ ভাল নম্বর পেয়েই পাশ করে যায় ভাং।
পাশাপাশি, ভাঙের ধর্মীয় স্বীকৃতিও আছে। এই ব্যাপারে আশীর্বাদ বর্ষিত করেছেন স্বয়ং বাবা মহাদেব। মহাশিবরাত্রির মত একাধিক পুণ্য দিনে প্রসাদ হিসেবে ভাঙের ব্যবহার সুপরিচিত। ত্রিকালজ্ঞ শিব আশুতোষ, তিনি অল্পেই সন্তুষ্ট। তাঁর তুষ্টিতে অর্ঘ্য হিসেবে জুড়ি মেলা ভার।
বিভিন্ন চলচ্চিত্রে, হিন্দি হোক বা বাংলা, ভাঙের ব্যবহার সুপরিচিত। বস্তুত, সহজলভ্যতা তো আছেই, পাশাপাশি ভাং বেজায় নিঃস্বার্থ। কোনও ইগো নেই, দিব্যি মিলেমিশে থাকতে পারে। ভাং উদারভাবে মিশে যায় দুধ ও দুইতে। 'ঠাণ্ডাই' বলে পরিচিত ভাং পানীয় হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়। মিশে যায় কুলফিতে, পকোড়াতে, মিষ্টি সন্দেশে। দরকার শুধু ভাঙের গুঁড়ো বা পেস্ট। বেশ কিছু রাজ্যে রীতিমত সরকারি দোকান থেকে কিনতে পাওয়া যায়। নিয়ে এসে মিশিয়ে ফেলুন পছন্দের মাধ্যমে। তারপর সেবন করুন আর দোলের রঙ খেলাকে আরও রঙিন করে তুলুন!
নিয়ম শুধু দুটোই। ভাংমিশ্রিত খাবার আসলে পরিবেশের মতই। যত সবুজ হবে, তত ভাল। তবে সবুজ যতই হোক না কেন, সতর্কতাই হচ্ছে আসল। একটু দেখেশুনে ব্যাট চালাবেন। অধিকন্তু ন' দোষায় বলে বটে, তবে এক্ষেত্রে অধিকন্তুতে সমস্যাও অধিকন্তু হতে পারে। উইকেট ধরে খেলুন, ছড়াবেন না।