২৪ ঘণ্টাও পেরোয়নি। সবে আঠারো–উনিশ ঘণ্টা। অথচ এই কয়েক ঘণ্টাতেই যেন দেশের সঙ্গীতজগৎ থমকে দাঁড়াল।

শেষ আপডেট: 28 January 2026 14:14
২৪ ঘণ্টাও পেরোয়নি। অথচ এই কয়েক ঘণ্টাতেই যেন দেশের সঙ্গীতজগৎ থমকে দাঁড়াল। ঠিক নতুন বছরের শুরুতেই দেশের সবচেয়ে বড় গায়ক একটিমাত্র পোস্টে জানিয়ে দিলেন—তিনি আর নতুন করে সিনেমার প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে কাজ করবেন না। শুভেচ্ছার সঙ্গে সঙ্গে ধন্যবাদ, আর শেষে এক লাইনের বিদায়—“যাত্রাটা ছিল সুন্দর।”
এই কয়েকটি শব্দেই যেন নিঃশ্বাস আটকে গেল কোটি শ্রোতার। সুর, তাল, লয়—সবকিছু হঠাৎই স্তব্ধ।
নিজের ব্যক্তিগত এক্স (প্রাক্তন টুইটার) অ্যাকাউন্টে অরিজিৎ সিং লিখেছিলেন, এই সিদ্ধান্ত কোনও হঠকারী আবেগের ফল নয়। বহুদিন ধরেই ভাবনা চলছিল। একাধিক কারণ জমতে জমতেই তিনি বুঝেছিলেন—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সাহস অবশেষে তাঁর হয়েছে। নিজের স্বভাবের কথাও অকপটে স্বীকার করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, তাঁর আগ্রহ খুব দ্রুত বদলায়। তাই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। গান তৈরির ধরন বদলানো, সুরের কাঠামো ভাঙা, লাইভে পরীক্ষা-নিরীক্ষা—এইসবের মধ্যেই তাঁর আনন্দ। কিন্তু সেই আনন্দই একসময় ক্লান্তিতে রূপ নেয়। নিজেকে নতুনভাবে সাজাতে হলে তাঁকে অন্য ধরনের সঙ্গীতের দিকে হাঁটতেই হবে—এই উপলব্ধিই তাঁকে এই পথে এনেছে। ( Arijit Singh, Arijit Singh songs, Arijit Singh voice, r national award winner, Filmfare Awards, Padma Shri awardee, Spotify most-followed artist)
তবে এখানেই শেষ নয়। অরিজিৎ লিখেছিলেন, নতুন প্রজন্মের গায়কদের গান শোনার জন্য তাঁর আগ্রহ বেড়েছে—যাঁরা তাঁকে সত্যিই নাড়া দিতে পারেন। নিজেকে তিনি বরাবরই একজন ভক্ত হিসেবে দেখেন, একজন শেখার মানুষ হিসেবে। ভবিষ্যতে তিনি ক্ষুদ্র শিল্পী হয়ে আরও শেখার, স্বাধীনভাবে গান বানানোর স্বপ্ন দেখছেন। তবু আশ্বাসও দিয়েছিলেন—গান বানানো বন্ধ হবে না। কিছু অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সেগুলো তিনি পূরণ করবেন। তাই এই বছরেও শ্রোতারা হয়তো তাঁর নতুন কাজ পেতে পারেন।
এই ঘোষণার পর মধ্যরাতে তাঁর আরেকটি পোস্ট—“আর বলো।” সেই পোস্টেই যেন জমে থাকা এক বিরাট আতঙ্ক ভাঙল। স্পষ্ট করে দিলেন—অরিজিনাল গান তিনি গাইবেন, মঞ্চে পারফর্ম তিনি করবেন। একজন ভক্ত আবেগে লিখলেন, “প্রাণ বের করে জিজ্ঞেস করছো আর বলো? মনে হয়েছিল মিউজিককে বিদায় জানালে।” উত্তরে অরিজিতের সেই চেনা সারল্য—“মিউজিককেই তো ‘হাই’ বলেছি রে পাগলা!”
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের অভিঘাত শুধু আবেগে থেমে থাকেনি। ভারতের বড় বড় মিউজিক কোম্পানি—টি-সিরিজ, সারেগামা, সোনি—সবার উপরেই বছরের পর বছর অরিজিতের উপর এক অদৃশ্য চাপ ছিল। কারণ, তিনি শুধু একজন গায়ক নন—তিনি ইন্ডাস্ট্রির ভিত্তি। ২০২৫–২৬ নাগাদ বিশ্বজুড়ে স্পটিফাইয়ে সবচেয়ে বেশি ফলোয়ার যার, তিনি অরিজিৎ সিং। সংখ্যাটা ১৬৮ মিলিয়নেরও বেশি। টেলর সুইফট, এড শিরানের মতো আন্তর্জাতিক তারকাদেরও পেছনে ফেলে দিয়েছেন তিনি। ভারতে টানা সাত বছর সবচেয়ে বেশি স্ট্রিমড শিল্পী। একক শিল্পী হিসেবে এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি স্ট্রিম তাঁরই। তাঁর গান মানেই হিটের গ্যারান্টি—এই বিশ্বাসেই কোটি কোটি টাকার হিসেব দাঁড়িয়ে আছে।
একটি গান গাওয়ানোর জন্য রেকর্ড লেবেলগুলোর মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক, লাইভ শোতে স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক, দু’ঘণ্টার অনুষ্ঠানে কোটি টাকার রাজস্ব—সবকিছুই অরিজিৎ নামক এক মানুষের কাঁধে ভর করে চলেছে। বহু পরিচালকের কাছেই তিনি ‘লাকি চার্ম’। সিনেমায় অন্তত একটি গান তাঁকে দিয়ে গাওয়ানো চাই—এই চাপ তিনি গত পনেরো বছর ধরে বহন করে এসেছেন।

অথচ এই মানুষটি এখনও চল্লিশেও পৌঁছাননি। এপ্রিলে তাঁর বয়স হবে ৩৯। কেরিয়ারের শুরুটাও ছিল দ্রুত। তবু সেই শুরুর দিনেই তিনি দেখিয়েছিলেন নির্মোহতা কী। অ্যাশ কিংয়ের গলায় ‘তি আ মো’ গানটি গাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সুরকার প্রীতমকে রাজি করান। ‘মোহ মোহ কে ধাগে’ গানটি পাপনের জন্য ছেড়ে দেওয়া—নিজের জায়গা ছেড়ে দেওয়ার সাহস খুব কম শিল্পীরই থাকে। অরিজিতের মনে হয়েছিল, এই গান অন্য কেউ আরও ভালো গাইবে। শিল্পসত্তা যদি নির্মোহ না হয়, এমন সিদ্ধান্ত সম্ভব নয়।
আজ সেই মানুষটিই নিজের কেরিয়ারের শিখরে দাঁড়িয়ে সিনেমার প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ালেন। অথচ প্রাপ্তির খাতায় কী নেই তাঁর? আটটি ফিল্মফেয়ার—কিশোর কুমারের পাশে তাঁর নাম। দুটি জাতীয় পুরস্কার। ২০২৫ সালে পদ্মশ্রী। আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি। প্রশ্ন ওঠে—আর কী পাওয়ার বাকি? হয়তো অস্কার, হয়তো গ্র্যামি। কিংবা তারও বেশি—নিজের সঙ্গীতকে নতুন ভাষা দেওয়া।
ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত মিলছে সেই পথের। ২০২৩ সালে তৈরি হয়েছে ‘অদিতি সুর সাধনালয়’—মায়ের নামে গড়া এক সঙ্গীত শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে শিশুদের প্রতিভা খুঁজে নিয়ে তাকে যত্নে বড় করার স্বপ্ন। পাটিয়ালা ঘরানার ক্লাসিক্যাল সংগীতে তাঁর গভীর আগ্রহ, অনুষ্কা শঙ্করের সঙ্গে বাইনারাল সাউন্ড নিয়ে পরীক্ষার পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে স্পষ্ট, তিনি সিনেমার ইন্ডাস্ট্রির নন; তিনি স্রেফ মিউজিকের মানুষ।
লাকি আলি এখন আর প্লেব্যাক করেন না, তবু তাঁর জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। অনুষ্কা শঙ্কর সিনেমায় গান না গেয়েও বিশ্বমানের শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মাইকেল জ্যাকসনের উদাহরণও সামনে আসে। সম্ভবত সেই পথেই হাঁটছেন অরিজিৎ—নিজের মতো করে, নিজের শর্তে শিল্পে অবদান রেখে যাওয়ার লক্ষ্যেই।
রাজসিংহাসন ছেড়ে দেওয়া মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়। কখনও কখনও তা আরও বড় যাত্রার শুরু। হয়তো ঠিক সেই কারণেই এই বিদায় এতটা ভারী—কারণ এটা শেষ নয়। এক নতুন সুরের প্রথম রেওয়াজের মতো।