
শেষ আপডেট: 4 July 2021 09:22
'মিনি জয়া' তে হিট রেকর্ড 'লাঠি'[/caption]
কদিন আগেই চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল 'মিত্রা' সিনেমা হল। যে সিনেমা হলের উদ্বোধনে হাজির ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। তখন হলের নাম 'চিত্রা'। নিউ থিয়েটার্সের বিএন সরকার যে হল প্রতিষ্ঠা করেন। 'চন্ডীদাস', 'ডাক্তার' বা প্রমথেশ-কানন যুগ থেকে উত্তম-সুচিত্রা যুগেও ছবি চলেছে চিত্রায়। নাম বদলে হল মিত্রা। সেও বন্ধ।
'যমুনা', 'জ্যোতি', 'গ্লোব' এ বসে বিলাসবহুল হলিউড বা বলিউড ছবি দেখা আজ গল্পকথা বা ভবানীপুরের 'ভারতী', 'পূর্ণ'তে বাঙালি মা কাকিমাদের দুপুরের ম্যাটিনি শো আজ অতীত মাকড়সার ঝুলে ভরা বন্ধ গেটে। বন্ধ বেহালার 'পুষ্পশ্রী'। যা একসময় বেহালা অঞ্চলের মানুষকে অনেক ভালো ছবি দেখিয়েছে। একে একে আলো নিভে আসার গল্প যেন বেড়েই চলছে।
'মিনি জয়া' সিনেমাহলের পুড়ে যাওয়া আরও একবার সিনেপ্রেমী দর্শক, হলমালিক, ডিস্ট্রিবিউটর ও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে যেন নাড়িয়ে দিয়ে গেল।
বাবা মায়ের সঙ্গে দেখতে গেলাম উত্তম-সুপ্রিয়ার 'জীবন-মৃত্যু'
১৯৬৭ সালে লেকটাউনের গৌরাঙ্গ বণিক তৈরি করেছিলেন 'জয়া' প্রেক্ষাগৃহ। যেটি মূল বড় জয়া সিনেমা। উত্তম কুমার-সুপ্রিয়া দেবীর 'জীবন-মৃত্যু' ছবি দিয়ে ১৯৬৭ তে উদ্বোধন হয় 'জয়া'র।
সেই স্মৃতি ভাগ করে নিলেন লেকটাউনের আদিবাসিন্দা অধ্যাপক ডঃ শঙ্কর ঘোষ। যিনি 'বাদশা' বাংলা ছবিতে শিশুশিল্পীর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। শঙ্কর ঘোষ জানালেন '১৯৬৭ সালে জয়া (মেন)-তে বাবা মায়ের সঙ্গে দেখতে গেলাম উত্তম-সুপ্রিয়ার 'জীবন-মৃত্যু'। ওই হলের সামনে সবসময় থাকতেন মালিক ও প্রতিষ্ঠাতা গৌরাঙ্গ চন্দ্র বণিক। ওঁদের অনেক হল ছিল 'জয়া' ,'বিজয়া' এবং সেগুলির নাম ওঁর নিজের মেয়েদের নামে রাখেন। তখন আমরা বেলেঘাটায় থাকি। লেকটাউন সবে গড়ে উঠছে এবং আমরা লেকটাউনে আসার জন্য জমি-জায়গা খুঁজছি। তখনই তৈরি হয় এই এলাকার একমাত্র চিত্রগৃহ 'জয়া'। গৌরাঙ্গ বণিক ছিলেন কাঠবাঙাল। তো তিনি বললেন "মাষ্টার শঙ্করকে সেরা জমিখান দিমু।" তারপর আমরা যে জমিটা পেলাম সত্যি সেরা জমি। ঠিক শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবের পুজোর বিপরীতে। গৌরাঙ্গ বণিকের থেকেই আমার বাবা জমিটা কিনে বাড়ি করেন। আমাদের এই শ্রীভূমি অঞ্চলে গৌরাঙ্গ বণিক আর পীযূষ ঘোষ বলে এক কংগ্রেস নেতা ছিলেন, তাঁদেরই সব প্লট ছিল। তো জয়া সিনেমা হল জড়িয়ে আছে আমার কৈশোরবেলা থেকে আজও। "
[caption id="attachment_2323140" align="aligncenter" width="712"]
'মিনি জয়া' তে শেষ চলা ছবি[/caption]
কিভাবে এগোব বুঝে উঠতে পারছিনা। - 'জয়া' মালিক
'জয়া' ও 'মিনি জয়া'র প্রতিষ্ঠাতা গৌরাঙ্গ চন্দ্র বণিক বহুকাল প্রয়াত। ২০০৩-০৪ হলের মালিক হন রবীন্দ্রনাথ বণিক। মানিকদা নামেই তিনি বিখ্যাত। সঙ্গে আছেন তাঁর ছেলে অর্থাৎ গৌরাঙ্গ বণিকের নাতি মনোজিৎ বণিক। মনোজিৎ বণিক জানালেন 'দাদুর আমল থেকে যখন বাবার হাতে হলটি আসে তখন নতুন করে সেটা আবার নবীকরণ করা হয়, উন্নত প্রযুক্তিযুক্ত করা হয়। মিনি জয়া হলটা আমরা শুরু করি ১৯৮০-৮১ নাগাদ। এখন বাবারই তত্ত্বাবধানে আছে সঙ্গে আমিও আছি।
দুটো হলেই প্রচুর ব্লকব্লাস্টার ছবি চলেছে। তাঁর একটা অংশ মিনি জয়া কাল ভস্মীভূত হয়ে গেল। জয়া ওয়ানের অডিটোরিয়াম ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। কিন্তু আংশিক ক্ষতি হয়েছে। জয়া ওয়ান আর জয়া টু বলেই আমরা হল দুটো চালাই। এখনও আমরা এই ঘটনার রেশ কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এখন আগুন লাগার কারণ ফরেন্সিক টিম এসে বার করবেন। তাই ভবিষ্যতে মিনি জয়া রিনোভেট করব না নতুন ফরম্যাটে আনব কিভাবে এগোব বুঝে উঠতে পারছিনা। করোনার মধ্যে অফিস দোকানপাট সব খোলা অথচ অনির্দিষ্টকালের জন্য সিনেমা হল বন্ধ। সরকারের নির্দেশের উপর সব নির্ভর করছে। এত লোকের পেটের ভাত জোটে সিনেমা হল থেকে। তারা যাবে কোথায়? সবকিছুই তো খুলছে তাহলে সিনেমা হল কী দোষ করল?'
'পুড়ে গেলে। আর কী হবে, মাল্টিস্টোরিড হবে! - চিরঞ্জিত
সুপারস্টার অভিনেতা চিরঞ্জিত চক্রবর্তী চিরকালই বাংলা ছবির ভবিষ্যত ও সিনেমাহলের সংখ্যা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। কারণ চিরঞ্জিত নিজেও একজন সফল পরিচালক। যাঁর পরিচালনায় একের পর এক সুপারহিট বাংলা ছবি সিঙ্গেল স্ক্রিনে আশি নব্বই দশকে তিনটে শো-এ হাউসফুল দাপিয়ে চলেছে। তাঁর পরিচালনায় 'মর্যাদা', 'সংসার সংগ্রাম',' কেঁচো খুড়তে কেউটে', 'ভয়' এর মতো ছবি বিগ হিট।
চিরঞ্জিত বললেন ' পুড়ে গেলে আর কী হবে, মাল্টিস্টোরিড হবে! যখনই কোনও সিনেমা হল পুড়েছে তার ভবিষ্যত এটাই দাঁড়িয়েছে। শপিং মল বিজনেসও এখন চলছে না। মাল্টিস্টোরিড ঐ জায়গার ভবিষ্যত। বাংলা সিনেমা অনেকদিনই মারা গেছে যেদিন থেকে মেনস্ট্রিম ছবিকে মার খাইয়ে দেবার চেষ্টা করেছে কিছু সমালোচকমহল। সেদিন থেকেই বাংলা ছবির বাজার শেষ। করোনার আগেই বাংলা ছবির বাজার শেষ হয়ে গেছে। যখন আমি, তাপস(পাল) ,বুম্বা(প্রসেনজিৎ) ছবি করছি তখন থেকেই রটানো হচ্ছে স্টুডিও বন্ধ হয়ে গেছে। কুকুর ঘুরে বেড়ায়, স্টুডিওপাড়ায় তালা পড়েছে। তাহলে আমরা তিনটে শো হাউসফুল দিতাম কী করে বড় বড় সিঙ্গেলস্ক্রিনে? এক শ্রেণীর আঁতেল সাজা সমালোচক বানিজ্যিক ছবি দেখার অযোগ্য এইসব সমালোচনা লিখে লিখে মেনস্ট্রিম ইন্ডাস্ট্রিকে শেষ করে দিয়েছেন। স্টার দিয়েও আজকাল ছবি চলছে না। কারণ সেইসব সংলাপ, মিউজিক ডিরেক্টররা আর উঠছেন না। একটা বানিজ্যিক ছবি সারা পরিবার মিলে দেখতে যেত যেমন মাসের পর মাস হিট আমার 'বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না', 'বেয়াদপ', 'শত্রু' যা ব্যবসা করেছে সেইরকম ভাবে আজকাল ফিল্ম চলে কোথায়।
বেশ মনে পড়ে একবার আমি গাড়ি করে লেকটাউনে 'জয়া' র সামনে দিয়ে যাচ্ছি। লোকের লাইনের ভিড়ে আমার গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। তাঁরা সবাই তরুণ মজুমদারের তাপস-দেবশ্রীর 'ভালোবাসা ভালোবাসা' দেখতে এসছেন। এত ভালো লাগল আমার। সেটা আজ খুব মনে পড়ছে। "
'সিনেমা হলের বেলায় এত বিমুখ কেন সরকার? '- শতদীপ সাহা
শতদীপ সাহা 'এস এস আর প্রাইভেট লিমিটেড' এর কর্ণধার জানালেন "কাল রাতেই ফোনে কথা হল জয়ার মালিকের সঙ্গে। জয়াতে আমাদের ছবির ডিস্ট্রিবিউশান যায়। আমাদের এক সহযোদ্ধার এত বড় ক্ষতি আমাদেরও ক্ষতি। সিনেমা হল উঠে যাচ্ছে এই বিমর্ষ বার্তার মাঝেও আমাদের মালিকানায় অনেক হলের মধ্যে কলকাতার বেহালার 'অজন্তা' সিনেমাহলকে আমরা নতুন প্রযুক্তিতে সাজিয়েছি। বেহালা ট্রামডিপোর বন্ধ হওয়া 'ইলোরা' হলকেও নবীকরণ করে শুরু করব। নীচটা হবে রিটেল উপরে সিনেমা হল। কিন্তু করোনা এসেই আমাদের সব শেষ করে দিল। হল যদি খুলতে দেওয়া না হয় আমরা চেষ্টা চালাব কীভাবে দর্শক আসার! আমরা হলে যেতে পারছি না কী হচ্ছে জানি না যার ফলাফল এই অগ্নিকান্ড। সরকারের কাছে আমরা হল মালিকরা 'ইম্পা'র তরফ থেকে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু সাতদিন কেটে গেছে কোনও উত্তরই আসেনি। ফুডকোর্ট, রেষ্টুরেন্ট সব চলছে করোনার মধ্যেও শুধু সিনেমা হল সবার প্রথমে বন্ধ হবে আর সবার শেষে খুলবে। এ কেমন বিচার! সিরিয়ালের শ্যুটিং বন্ধ হলে সরকার এত তৎপর কিন্তু সিনেমা হলের বেলায় এত বিমুখ কেন? শ্যুটিং যে হবে সেটা দেখাবে কোথায় যদি হল না থাকে? আমি সিঙ্গেল স্ক্রিন ও মাল্টিপ্লেক্স দুই হলই খোলার কথা বলছি। এত সিনেমার মুখরা রাজনৈতিক দলে সরকারের তরফে এমএলএ, এমপি কিন্তু তাঁরা কেউ সিনেমাহল খোলার বা বাঁচানোর উদ্যোগ সরকারের কাছে তোলেন না।"
'মেনস্ট্রিম ছবি কই?' - চিরঞ্জিত
এ প্রসঙ্গে মাননীয় বিধায়ক নায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তী বললেন "হল মালিকরা এটা কেন বলছেন না যে সেই মাপের ছবি হচ্ছে না তাই হল খুললেও চলছে না, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কেন খুলে বলা হচ্ছে না ছবি চলছে না তাই হল চলছে না। এটা প্রিয়ার মালিক অরিজিৎ যদিও বলেন। এবারের পুজোতে চল্লিশটা হল খোলা হয়েছিল তার মধ্যে সতেরটা টিকিট থেকে ম্যাক্সিমাম ঊনপঞ্চাশটা টিকিট বিক্রি হয়েছে। তাও শুধু সপ্তমী, অষ্টমীতে। জয়া বারাসাতে খবর নিলাম অর্ধ্বেক ছবি দর্শকশূন্য। তাহলে হল চালানোর খরচ এসি ইলেক্ট্রিকের খরচ কীভাবে উঠবে? মেনস্ট্রিম ছবি কই? ওসব পরীক্ষামূলক মননশীল ছবি কখনও হলের কর্মীদের পেট ভরায় না। আর ওটিটি বাংলা ছবির মধ্যবিত্ত দর্শকরা দেখে না সাবস্ক্রাইব করার খরচ অনেক।
হ্যাঁ একটা পয়েন্ট হল মালিকরা তুলতে পারেন যে হলগুলো বাঁচানোর কেউ চেষ্টা করছে না। সেটা আমি মানব। হলমালিক এবং আমরা সবাই বসে সমবেত চেষ্টা করতে হবে। যেটা শুধু হল খুলে রেখে হবে না। আর মেনস্ট্রিম ছবি বানিয়ে চেষ্টা করতে হবে। আমার খুব কষ্ট লাগে এ প্রজন্মের জন্য ইন্ডাস্ট্রিটা মরে যাচ্ছে। সমবেত চেষ্টা চাই সবার।"
'লোকে আজকাল ফ্রিতে সিরিয়াল দেখে।'
জয়ার কর্মীরা যেন চিরঞ্জিতের সুরেই সুর মেলালেন। বললেন, "ভগবানে বিশ্বাস করি বলেই বেঁচে আছি এই অন্ধকারে। আগেকার মতো পারিবারিক ছবি হচ্ছে না বলেই লোক আসে না হলে। 'জয়া ওয়ান' দর্শক পায় না বলেও বহুকাল বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে টিকিটের যে বিক্রি ছিল এখন সে বিক্রি কোথায়! লোকে আজকাল ফ্রিতে সিরিয়াল দেখে।"
'ছোট বউ' এর সুবর্ণ জয়ন্তী মিনি জয়াতেই
'মিনি জয়া'র সোনালী অতীতে ফিরে গেলেন অভিনেতা শঙ্কর ঘোষ। বললেন, " জয়াতে তো ছোটবেলায় ছবি দেখেইছি সুচিত্রা সেনের 'দেবী চৌধুরাণী', উত্তম কুমারের 'চৌরঙ্গী', 'চিড়িয়াখানা', 'অমানুষ'। মনে আছে 'অমানুষ' ছবিতে উত্তমের সঙ্গে মনমোহন, শম্ভু ভট্টাচার্যের টক্করের দৃশ্যতে ফেটে পড়েছিল দর্শক সিটি আর হাততালিতে।
তারপর জয়ার পাশে ওদের একটা কার পার্কিং জায়গা ছিল। যেখানে সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠা যেত। সেখানে গড়ে উঠল মিনি জয়া।
মিনি জয়াতে এই তো কদিন আগেই দেখে এলাম 'সুইজারল্যান্ড' আর 'ডিকশনারি'। অঞ্জন চৌধুরীর সব ছবি রমরমিয়ে চলেছে দুই জয়াতেই।
মনে পড়ছে আমার অভিনীত 'ছোট বউ' ছবি। রত্না ঘোষালের স্বামী অর্থাৎ লতু'র বরের ভূমিকায় অভিনয় করি। মিনি জয়াতে 'ছোট বউ' চলেছিল সতের সপ্তাহের বেশি। তখন 'ছোট বৌ' এর সুবর্ণ জয়ন্তীর সাকসেস পার্টি দিলেন ছবির প্রযোজক প্রবীর রক্ষিত। সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের মাঠে। তো মিনি জয়ার থেকে গৌরাঙ্গ বণিকও এসেছিলেন এবং আমার সঙ্গে আবার দেখা করেছিলেন। মিনি জয়া-সহ 'ছোট বউ' যে কটা সিনেমা হল সতের সপ্তাহ টেনেছিল তাঁদের প্রত্যেককে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। এটা তো মেনস্ট্রিম বাংলা ছবির ইতিহাসে বড় ঘটনা। ১৯৮৮-র রথের দিন মুক্তি পেল 'ছোট বৌ' তারপর আর হাউসফুলের লাল বোর্ড নামছেই না। মাল্টিপ্লেক্সে অত টাকার টিকিট কেটে মধ্যবিত্ত দর্শক যায় না। আমরা ছোটবেলায় পঁচিশ জন গেছিলাম 'হাতি মেরে সাথী' দেখতে 'রিগ্যাল' সিনেমা হলে। এখন টিকিটের দাম বেশি আর অনু পরিবারের দৌলতে দর্শকের একতা যেন কমে গেছে। ফি বছর বিরাট করে ফিল্মোৎসব হয় কিন্তু এক একটা সিঙ্গেলস্ক্রিন কীভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে! মুখ্যমন্ত্রী যদি চলচ্চিত্র উৎসবের কিছুটা অনুদান বা ছবি দেখানোর ব্যবস্থা সিঙ্গেল স্ক্রিনে করেন দর্শক তাহলেও কিছুটা হলমুখী হবে।'