
তাজমহলের সামনে জাকিরের সেই চায়ের বিজ্ঞাপন।
শেষ আপডেট: 16 December 2024 13:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছ’দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় সঙ্গীত জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি (Zakir Hussain) ছন্দে ছন্দে। তবলার বোলে তিনি যে কেবল অনন্য পারফরম্যান্সের নজির গড়েছেন তাই নয়, তবলাকে একক শিল্পের মর্যাদা দিয়েছেন বিশ্বের দরবারে। তাঁর সুরেলা হাতের নাচন থামতেই দেশজুড়ে আজ শোকের ছায়া।
তবে সুর-তালের এই প্রাণচঞ্চল ছন্দময়তা যে কেবল তাঁর হাতের শিল্পেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়। মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন তাঁর তবলার বোলের মতোই উচ্ছল। তাঁর চিরহাস্যময় মুখটিই সকলের মনের মণিকোঠায় সাজানো রয়েছে। এমনকি এমনই এক হাস্যময়তা দিয়েই উস্তাদ জাকির হুসেনকে অনেকেই প্রথম চিনেছিলেন।
নয়ের দশকের ব্রুক বন্ড তাজমহল চায়ের বিজ্ঞাপন। তাজমহলের পটভূমিতে বসে, ঝাঁকড়া চুলে ভরা মাথা নাড়িয়ে, মনের সুখে তবলা বাজাচ্ছেন জাকির। আসলে শেখাচ্ছেন এক ছোট্ট শিষ্যকে। তার পরেই ঐশ্বরিক বোলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে তাঁর সেই বিখ্যাত সংলাপ, ‘ওয়াহ উস্তাদ নয়, ওয়াহ তাজ বলো!’ এ দৃশ্যের ঝলক আজও বহু মানুষের স্মৃতিতে অমলিন।
দেখুন বিজ্ঞাপনটি।
১৯৬৬ সালে কলকাতায় ব্রুক বন্ড তাজমহল চা চালু হয়েছিল। তবে শুরুতে কোম্পানি জাকির হুসেনকে তাদের ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত করেনি। পরে জনপ্রিয়তার কথা ভেবে, আটের দশকে তারা উস্তাদ জাকির হুসেনকে নির্বাচন করে বিজ্ঞাপনী মুখ হিসেবে। জানা যায়, সে সময়ের কপিরাইটার কেএস চক্রবর্তী তবলার অনুরাগী ছিলেন এবং তিনি জাকির হুসেনকে সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেছিলেন এই ভূমিকায়।
বিজ্ঞাপনের ভাবনা ছিল সরল। উস্তাদ ঠিক যতটা মনোযোগ দিয়ে তবলার অনুশীলন করেন, ঠিক তেমনই মনোযোগ দিয়ে তাজমহল চা-ও তৈরি করা হয়। ১৯৯১ সালের আর্থিক উদারীকরণের পরে কেবল টিভি আসার সঙ্গে সঙ্গে এই বিজ্ঞাপন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

দীর্ঘ কর্মজীবনে জাকির হুসেন সব ধরনের সীমানা ভেঙে ফেলেছিলেন— শ্রেণি, দেশ, ভাষা, ধর্মের। তাঁর তবলার সুরে আমরা বৃষ্টির শব্দ শুনেছি, শিবের ডমরুর ছন্দ কল্পনা করেছি। তার ঝাঁকড়া চুলের দোলায় যেন তালের সুর মিশে যেত।
জীবনের সংগ্রামের কথা স্মরণ করে উস্তাদ একবার বলেছিলেন, "একসময় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে দ্বিতীয় শ্রেণির পেশা হিসাবে দেখা হত। সেই পেশায়ও তবলা ছিল আরও নীচের ধাপে। অনেক সময় রেকর্ডে তবলাবাদকের নামও উল্লেখ করা হত না।"

সেখান থেকে ছবিটা বদলে দিয়েছিলেন উস্তাদ জাকির হুসেন। তিনি তবলাকে কেবল গানের সঙ্গতযন্ত্র থেকে বার করে স্বাধীন শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সঙ্গীতের দূত, যাঁর হাতের জাদু বিশ্বজুড়ে ভারতীয় সঙ্গীতের পরিচিতি নতুনভাবে তুলে ধরেছিল। তাঁর প্রয়াণে দেশ হারাল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।