
শেষ আপডেট: 21 January 2024 19:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এখন যাঁদের বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই, তাঁদের হয়তো মনে থাকবে দূরদর্শনে বিক্রম বেতাল দেখার কথা। প্রতি পর্বে নতুন নতুন কাহিনী। শেষটা হবে বেতালের অট্টহাসি দিয়ে। রাজা বিক্রমাদিত্যর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অরুণ গোভিল। আর বেতালের চরিত্রে সজ্জন। দু’বছর পর এই বিক্রমাদিত্যই টিভির পর্দায় ভেসে উঠেছিলেন রামের অবতারে। রামানন্দ সাগরের রামায়ণে তিনিই ছিলেন পুরুষোত্তম রাম।
অরুণ গোভিলের সেই রাম-রূপ থেকে গিয়েছে চির সবুজ হয়ে। বিক্রমাদিত্যকে অনেকেই মনে রাখেননি কিংবা বিক্রম বেতালের বাকি চরিত্রগুলোকে। অথচ শুধু অরুণ কেন, দীপিকা চিখলিয়া, সুনীল অরোরা সহ বিক্রম বেতালের পুরো কাস্টিং টিম রামায়ণে তুলে এনেছিলেন রামানন্দ। যেন ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে মেগা সিরিয়ালে এনে ফেলেছিলেন তাঁদের। টেলিভিশনে সেই প্রথমবার তৈরি হয়েছিল এক মহাকাব্য। টান টান ৭৮ এপিসোড। যার বাণিজ্যিক সাফল্যের রেকর্ড এখনও ছোঁয়া যায়নি।
তবে এই মহাকাব্য রচনার নেপথ্যে একটা ছোট গল্প ছিল। সেটি ১৯৭৬ সালের ঘটনা। রামানন্দ সাগরের ছেলে প্রেম সাগর তাঁর বইতে লিখেছেন সেদিনের কথা। ‘চরশ’ ছবির শ্যুটিং চলছিল স্যুইৎজারল্যান্ডে। তার পর একদিন আল্পস পর্বতে শ্যুট শেষ করে বিকেলে একটা কাফেতে বসে ওয়াইন অর্ডার করে রামানন্দ। বাইরে বরফ পড়ছে। হাড় হিম করা ঠান্ডা। একটা বড় পাত্র ভরে ওয়াইন নিয়ে বসেন রামানন্দ। তাঁদের সামনে রাখা ছিল একটা কাঠের ক্যাবিনেট। ওয়াইন পরিবেশনের পর রেস্তোরাঁর মালিক হঠাৎ সেই কাঠের ক্যাবিনেট খুলে দেন। ভিতরে একটা গ্লাস স্ক্রিন। তাতে একটা ফরাসি সিনেমা চলতে শুরু করল।
দেখে রামানন্দর চোখ স্থির হয়ে যায়। তাঁর ছেলেরও তাই অবস্থা। সেই প্রথম রঙিন টিভি দেখলেন তাঁরা। প্রেম সাগর তাঁর বইতে লিখেছেন, এরপর পাপাজি যেন কিছুক্ষণের জন্য স্থবির হয়ে যান। তার পর বলেন, না আর বড় পর্দার জন্য ছবি বানাব না। সব টেলিভিশনের জন্য বানাব।

কী বানাবেন রামানন্দ? ছেলে সুভাষ আর প্রেমকে বলেন, আমি বানাব, রামায়ণ, শ্রী কৃষ্ণ আর অনন্ত শক্তির দেবী মা দুর্গার কাহিনী নিয়ে ছবি।
এ কথা শুনেই দুই ভাই হেসে ফেলেন। বলেন, যে মানুষটা ‘বরসাত’-এর মতো সুপারহিট সিনেমা বানিয়ে বক্স অফিসে হিট করে দিয়েছিলেন, সেই তিনি কিনা বলছেন, ‘মুকুট আর মুছের (গোঁফ)’ ছবি বানাবে। পৌরাণিক ছবি মানেই ইয়া লম্বা গোঁফ আর মুকুট পরা রাজা, সেই কারণে প্রেম এ কথা বলেছিলেন। কিন্তু রামানন্দ বলেন, ওটাই লোকে দেখবে রে। তোরা ভারতকে চিনতে পারিসনি।
শুরু হয় প্রস্তুতি। প্রথমে তৈরি হবে সোমদেব ভট্টর লেখা বেতাল পঁচিশ নিয়ে ধারাবাহিক। তার রিসার্চ ওয়ার্ক শুরু হয়ে যায়। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে দূরদর্শনে মুক্তি পায় ‘বিক্রম বেতাল।’ সে ছিল রানওয়ে সাকসেস! ব্যাস। এর পর আর রামানন্দ সাগরকে পায় কে! ছেলে প্রেমকে বলেন, তুই এক মাসের জন্য বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে বেরিয়ে পড়। বিদেশে আমার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করবি। আর রামায়ণ তৈরির জন্য ফান্ড সংগ্রহের চেষ্টা করবি।
প্রেম সে কথা শুনেই বুঝতে পারেন কোনও সাড়া পাওয়া যাবে না। এক মাস বিভিন্ন দেশে গিয়ে অনাবাসী ভারতীয় ধনপতিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন প্রেম। কিন্তু কেউই উৎসাহ দেখাননি। কিন্তু রামানন্দ নাছোড়। তিনি স্ক্রিপ্ট তৈরি করে ফেলেন। তার পর কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের তৎকালীন সচিবের সঙ্গে দেখা করেন। সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম দূরদর্শন এখনও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের অধীন।

দেশে প্রধানমন্ত্রী হলেন রাজীব গান্ধী। আর তথ্য ও সম্প্রচার প্রতি মন্ত্রী ছিলেন ভিএন গ্যাডগিল। এই কংগ্রেসি নেতা ছিলেন বড় রক্ষণশীল। তিনি দূরদর্শনে রামায়ণ দেখানোয় বাধ সাধেন। তাঁর কথায়, ভারত বৈচিত্র ভরা দেশ। এই দেশে কোনও এক ধর্মের জন্য ধারাবাহিক কিছু দেখানো যাবে না। মন্ত্রী বাধ সাধায় সচিবরাও ঘোরাতে থাকেন রামানন্দ সাগরকে।
এক সময়ে দিল্লিতে অশোক হোটেল ভাড়া করে মাসাবধি ছিলেন রামানন্দ। আর প্রায়ই এই সচিবের অফিসে, মান্ডি হাউজে দূরদর্শনে অফিসে হত্যে দিতেন। কারণ, দূরদর্শন না দেখালে বা প্রযোজনায় সাহায্য না করলে এত লম্বা ধারাবাহিক তৈরি করা যাবে না। এক বার এক সচিবের বাড়িতে সাত সকালে পৌঁছে গেছিলেন রামানন্দ। সেই সচিব তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বাগান পরিচর্যা করছিলেন। এক প্রকার রামানন্দকে ভাগিয়ে দেন তিনি।
অথচ প্রেম সাগর তাঁর বাবার জীবন কাহিনী লিখতে গিয়ে জানিয়েছেন, গ্যাডগিল আপত্তি করলেও প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী কিন্তু ইতিবাচক মনোভাব নিয়েছিলেন। হতে পারে শাহবানু মামলার রায়ের পর ভারসাম্যের রাজনীতির জন্য রাজীব সে কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু জট কাটছিল না। শেষমেশ হয়তো সহায় হয়েছিলেন ভগবান রাম। নইলে রামায়ণ হয়তো আর দিনের আলো দেখত না।

৮৬ সালের শেষ দিকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের চার জন সচিবকে একই দিনে বদলি করা হয়। ভি এন গ্যাডগিলকে সরিয়ে দেওয়া হয় সেই মন্ত্রক থেকে। আর অজিত পাঁজাকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী করা হয়। প্রেম সাগরের কথায়, অজিত পাঁজা সিনেমা ভালবাসতেন। বলিউডের অনেকের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।
অজিত পাঁজা রাজীব গান্ধীর ভাবশিষ্য ছিলেন। উত্তর কলকাতার কংগ্রেসি নেতা ছিলেন তিনি। অজিত পাঁজা মনে করতেন, রামায়ণ হল মহাকাব্য। শুধু হিন্দু ধর্মের সঙ্গে তাকে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। ভারতের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে তা জড়িত। তাঁর সময়েই দূরদর্শনে রামায়ণ দেখানোর চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়া হয়। প্রতিটি পর্বের জন্য মাত্র ৯ লক্ষ টাকার বাজেট ছিল। অথচ শেষমেশ দেখা যায় প্রতি পর্ব থেকে গড়ে ৪০ লক্ষ টাকা বিজ্ঞাপন বাবদ রোজগার হয়েছিল দূরদর্শনের। সরকারি সম্প্রচার মাধ্যমের আর কোনও ধারাবাহিক এত সাফল্য পায়নি।