
শেষ আপডেট: 24 March 2023 12:27
শুক্রবার ভোররাতে দাদা মারা গিয়েছেন। দাদা মানে পরিচালক প্রদীপ সরকার (Pradeep Sarkar)। সকালে যখন ওঁর মৃত্যু সংবাদ পেলাম, প্রথমেই মনে পড়ছিল দু'জনের প্রথম কথা হওয়ার দিনটা। দাদার সঙ্গে আমার ফোনেই আলাপ। 'চোখের বালি' ছবিতে আমার কাজ ওঁর খুব ভাল লাগে। সে কথা জানাতে উনি নিজে আমার নম্বর জোগাড় করে একদিন ফোন করেন। এরপর প্রথমেই 'তুই' সম্বোধন করে বলেন, "টোটা (Tota Roy Chowdhury), তোর কাজ আমার খুব ভাল লেগেছে। একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছে রইল।" দাদার মুখে সেই কথা শোনার পর আমার আনন্দে মনটা ভরে গিয়েছিল, এই ভেবে যে বলিউডের (Bollywood) একজন মানুষ আমার কাজের প্রশংসা জানাতে নিজে ফোন নম্বর জোগাড় করে কথা বলছেন।
সেদিন আমার মনে হয়েছিল উনি মাটির কাছাকাছি থাকা একজন অত্যন্ত ভদ্র মানুষ। ওঁকে তখন আমি জনপ্রিয় মিউজিক ভিডিও এবং বিজ্ঞাপন পরিচালক হিসেবে চিনতাম। পরবর্তীকালে ওঁর সঙ্গে একাধিকবার আমার কাজের সুযোগ এসেছিল। কিন্তু কোনও না কোনও কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। অবশেষে 'হেলিকপ্টার ইলা'র সময় দাদা আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, "এত বছর পর তোর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ এসেছে। তুই ফ্রি রাখিস নিজেকে।"
সবথেকে বড় বিষয়, এই ছবিতে কাস্ট করার আগে উনি আমার কোনও অডিশন নেননি। ওঁর কাস্টিং ডিরেক্টর বলেছিলেন অডিশনের কথা। আমার তাতে সমস্যা না থাকলেও দাদা তৎক্ষণাৎ নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, "আমি জানি টোটা কী করতে পারে। আমি ওঁকেই নেব।" কিছু কিছু ব্যাপারে দাদা আবার সোজাসাপ্টা কথা বলতে পছন্দ করতেন। ওঁর সঙ্গে ছবিটা করতে গিয়ে উপলব্ধি করেছিলাম, যে উনি অত্যন্ত সংবেদনশীল একজন মানুষ। সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোর ব্যাপারে ভীষণ ওয়াকিবহাল। বিশেষ করে সেটা ছবিতে কীভাবে দেখানো যায়, সেসব মাথায় রাখতেন। চেঁচামেচি করতে পছন্দ করতেন না বা রাগও করতেন না। মানুষজনের মাঝে থাকতে ভালবাসতেন। খেতে এবং খাওয়াতেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল।

'হেলিকপ্টার ইলা'র অনেক আগেই 'পরিণীতা', 'লাগা চুনরি মে দাগ', 'মর্দানি'র মতো ছবি করে ফেলেছেন তিনি। এমনকী বিজ্ঞাপন জগতেও তিনি একজন কিংবদন্তি। কিন্তু কখনও ওঁর মধ্যে সেই নিয়ে অহঙ্কার ছিল না। মুম্বই ইন্ডাস্ট্রির মানুষজন দাদাকে খুব ভালবাসেন। শ্যুটিংয়ের ফাঁকে দুপুরে আমরা একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করতাম। সব ধরনের বাঙালি খাবার খেতে ভালবাসতেন। তবে একটু মশলাদার খাবার এবং কাবাব বেশি প্রিয় ছিল। ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও সেসব খাবার খেতেন। অদ্ভুত ব্যাপার ছিল, উনি সকলের সঙ্গে বাংলায় কথা বলতেন। ইউনিটে অবাঙালি কেউ থাকলেও দাদার সঙ্গে কাজ করতে করতে সবাই বাংলা শিখে গেছেন। আসলে বাংলাকে উনি খুব ভালোবাসতেন।
এর পাশাপাশি অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়ের বড় ভক্ত ছিলেন প্রদীপদা। ১৭-১৮ বছর আগে যখন প্রথম ওঁর অফিসে গিয়েছিলাম, তখন দেখি সেখানে 'চারুলতা' ছবির সাদা কালো একটা পোর্ট্রেট রয়েছে। এরপর ২০২০ সালে লকডাউনের আগেও সেখানে গিয়ে দেখলাম পোর্ট্রেটটা রয়ে গিয়েছে। 'হেলিকপ্টার ইলা' ছবির শ্যুটিংয়ের সময় থেকেই দাদার শরীর ঠিক ছিল না। তবুও কাজের সময় উনি কিছু বুঝতে দিতেন না। খুব মজা করে কাজ করতেন। ভবিষ্যতে ওঁর আরও কাজ করার ইচ্ছে ছিল। সেসব নিয়ে পরিকল্পনাও করছিলেন। কিন্তু সব যেন আচমকা থমকে গেল।"
শেখর চরিত্রে প্রদীপ সরকারের প্রথম পছন্দ ছিলেন অভিষেক, তবু সেফই পেলেন বিপুল খ্যাতি