
‘সপ্তপদী’
শেষ আপডেট: 5 April 2025 22:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৬১ সালে মুক্তি পাওয়া কালজয়ী ছবি ‘সপ্তপদী’কে আজও নিছক এক রোম্যান্টিক ছবি হিসেবে ভাবা যায় না—এ যেন বাঙালির ভালবাসার অভিধান। উত্তম-সুচিত্রার অনবদ্য রসায়ন, সেই অনন্ত পথের গান—‘এই পথ যদি না শেষ হয়’—সব মিলিয়ে ছবিটি হয়ে উঠেছে এক অনুভব। পরিচালক অজয় করের নিপুণ নির্মাণের পেছনে যদিও এক অজানা গল্প লুকিয়ে রয়েছে—ছবির আসল ক্লাইম্যাক্স বদলে গিয়েছিল সুচিত্রা সেনের কথায়!
প্রথমে পরিচালকের পরিকল্পনা ছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল উপন্যাস অনুসরণ করেই ছবির শেষ তৈরি করবেন। সেই অনুযায়ী ছবির নায়ক কৃষ্ণেন্দুর (উত্তম কুমার) কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা ছিল শেষ দৃশ্যে। কিন্তু সুচিত্রা সেনের মত ছিল একেবারেই ভিন্ন। তাঁর যুক্তি ছিল—রোম্যান্টিক হিরো হিসেবে উত্তম কুমারকে এই ধরনের অসুস্থতায় দেখলে দর্শকের মন ভেঙে যাবে। ছবির প্রেমালাপ যেমন, তার সঙ্গে এই পরিণতি মানায় না।
শোনা যায়, শ্যুটিং শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই সুচিত্রা নিজের চরিত্র রিনা ব্রাউনকে নিজের মতো করে সাজাতে শুরু করেন। আর ক্লাইম্যাক্সের পরিকল্পনা জেনে তিনি পরিচালককে স্পষ্ট জানান—এভাবে ছবির শেষ হওয়া ঠিক হবে না। উত্তমের দৃশ্য বাদ যাবে জেনেও, তিনিই উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসেন কাহিনি পাল্টাতে।
পরিচালক এরপর নাকি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু লেখক নিজেই তাঁর গল্পে এই পরিবর্তনে সম্মত হননি। তখন সুচিত্রা চাল দেন কৌশলে—উত্তম কুমারের ভাই, অভিনেতা তরুণ কুমারকে পাঠানো হয় সাহিত্যিকের কাছে। তরুণ বুঝিয়ে বলেন, একজন মানুষ যদি শুধুমাত্র প্রেমের জন্য ধর্ম, পরিবার সব কিছু ছেড়ে দেন, তাঁর প্রতি দর্শকের সহানুভূতি থাকবে। আর সেই মানুষকে যদি কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত দেখানো হয়, তবে ভালোবাসার মর্মটাই হারিয়ে যাবে।
এই ব্যাখ্যা শুনে নরম হন তারাশঙ্কর। শেষমেশ তিনি রাজি হয়ে যান ছবির শেষ পাল্টাতে। নতুনভাবে লেখা হয় ক্লাইম্যাক্স। সুচিত্রার উপস্থিত বুদ্ধি ও সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেয় গোটা ছবির মোড়। উত্তম কুমার যদিও জানতেন, এতে তাঁর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য বাদ পড়বে, তবু কিছু বলেননি। কারণ তিনিও বুঝেছিলেন—এই পরিবর্তনেই আসল সার্থকতা। আর বাকিটা ইতিহাস। ‘সপ্তপদী’ আজও ভারতীয় সিনেমার এক মাইলস্টোন। সুচিত্রা-উত্তমের সেই ভালবাসা সিনেমার পর্দা ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছে লক্ষ লক্ষ দর্শকের হৃদয়ে।