
শেষ আপডেট: 9 January 2024 15:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যেমন তার কারুকাজ, তেমনই সৌন্দর্য। মেবারের রানাদের বিলাসব্যসনের কেন্দ্র ছিল এই প্রাসাদ। কথিত আছে মেবারের রানিরা এখানে রোদ পোহাতে আসত। পিচোলা লেকের ধারে ইতিহাস প্রসিদ্ধ এই লেক প্যালেসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক গল্পকথা। ইতিহাস বলে, এক নটিনীর অভিশাপ জর্জরিত এই প্রাসাদ। তবুও এর গুরুত্ব কমেনি। বর্তমানে এই লেক প্যালেস তাজ গ্রুপের মালিকানাধীন। বিশ্বের সেরা তিন ঐতিহাসিক প্যালেসের একটি। বিশ্বের নামকরা পাঁচতারা হোটেলও। এখানেই বসছে আমিরের মেয়ের বিয়ের আসর।
রাজস্থানের উদয়পুরের তাজ লেক প্যালেসে ঘটা করে বিয়ের সমস্ত আয়োজন হয়েছে ইরা খান এবং নূপুর শিখরের। সই-সাবুদের বিয়ে হয়ে গেছে গত ৩ জানুয়ারি। মুম্বইয়ের বান্দ্রার একটা পাঁচতারা হোটেলে সেদিন ছিল চাঁদের হাট। এবার নিয়মকানুন মেনে জমকালো বিয়ের অনুষ্ঠান হবে উদয়পুরের লেক প্যালেসে। জোরদার প্রস্তুতি চলছে। অতিথিদের জন্য ঘর বুক করা হয়েছে। ৬ তারিখ থেকে লেক প্যালেসেই বিয়ের নানা অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। সেইসব ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ারও হয়েছে। আত্মীয়পরিজনদের নিয়ে প্যালেসে শরীরচর্চা করতেও দেখা গেছে ইরা ও নূপুরকে। আগামী ১৩ জানুয়ারি নীতা মুকেশ আম্বানি কালচারাল সেন্টারে হবে ইরার বিয়ের গ্র্যান্ড রিসেপশন।
বলি তারকাদের মধ্যে এখন ডেস্টিনেশন ওয়েডিং খুব ট্রেন্ডিং ব্যাপার। প্রিয়ঙ্কা চোপড়া-নিক জোনাস, কিয়ারা-সিদ্ধার্থ, ক্যাটরিনা-ভিকি, ইশা আম্বানি-আনন্দ পিরামলের বিয়ে হয়েছে উদয়পুরের এই লেক প্যালেসে। এখানকার অফিশিয়াল ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, লেক প্যালেসের এক একটি লাক্সারি রুমের ভাড়া শুরু হয় ৬৯ হাজার টাকা থেকে। এক রাতের জন্যই গুনতে হবে এই ভাড়া। আর যদি গ্র্যান্ড প্রেসিডেন্সিয়াল রুম নিতে হয় যেখান থেকে পিচোলা লেকের সুন্দর ভিউ পাওয়া যাবে, তাহলে তার এক রাতের খরচ পড়বে সাড়ে দশ লাখের মতো।
পাঞ্জাবি খাবারই থাকছে মেনুতে। তাছাড়া ইতালি, আরবের নানা কুইসিন থাকছে। তাজ আরাভালি রিসর্টে ১৭৬টি রুম বুক করা হয়েছে। ২৫০ জন অতিথি থাকবেন ইরা-নুপূরের বিয়েতে। রাজকীয় সেই বিয়েতে আমন্ত্রিত আমির খানের বলিউডের তারকাবন্ধুরাও। তাঁদের জন্যও বিশেষ আয়োজন রয়েছে।
মেবারের রানাদের গ্রীষ্মকালীন নিবাস ছিল এই লেক প্যালেস
সালটা ১৮২১ থেকে ১৮৩৮। মেবারের মসনদে তখন রানা জওয়ান সিং। মদ্যপ রানা ভোগবিলাসে মত্ত থাকতেন বেশিরভাগ সময়েই। তবে তাঁর শৌখিনতা ছিল প্রশংসনীয়। ইতিহাস বলে, নেশাতুর রানার একবার ট্রাপিজের খেলা দেখার শখ হয়। পিচোলা হ্রদের উপর বিশাল দড়ি বাঁধেন রাজ কর্মচারীরা। রানা এক নর্তকীকে নির্দেশ দেন নাচ দেখাতে দেখাতে হ্রদের উপর বাঁধা দড়ি দিয়ে হাঁটতে হবে। গোটা হ্রদ পেরোতে পারলেই অর্ধেক রাজত্ব পুরস্কার। রানার নির্দেশ অমান্য মানেই শাস্তি। ভয় পেলেও সেই দড়ির উপর দিয়ে হাঁটা শুরু করেন সেই নর্তকী। কিন্তু হ্রদ পেরনোর আগেই জলে পড়ে যান ও ডুবে মৃত্যু হয় তাঁর।
শোনা গিয়েছিল ষড়যন্ত্র করে নাকি সেই দড়ি কেটে দেওয়া হয়েছিল। নেশাতুর রানা বুঝতে পারেননি। নেশা কাটার পরেই বোঝেন কী সর্বনাশ হয়েছে। জনশ্রুতি, সেই নর্তকীর অভিশাপ থেকে এখনও মুক্তি পায়নি মেবারের রাজবংশ। জওয়ান সিংয়ের পরে বংশ পরম্পরায় দত্তক নিতে হয়েছে অপুত্রক রানাদের। দত্তক নেওয়া ছেলেদের নিয়েই চলছে রাজবংশ।
যে হ্রদকে নিয়ে এত জনশ্রুতি তারই নাম পিচোলা। ১৩৬২ খ্রিস্টাব্দে এই হ্রদ তৈরি করেছিল বানজারা সম্প্রদায়ের লোকজন। পরে এই হ্রদকে ঘিরেই তৈরি হয় মেবারের রাজপ্রাসাদ। রাজধানী উদয়পুর প্রতিষ্ঠা করেন দ্বিতীয় উদয় সিংহ ১৫২২ খ্রিস্টাব্দে।
এই হ্রদে চারটি দ্বীপ আছে--জগ নিবাস, জগ মন্দির, মোহন মন্দির এবং আরশি বিলাস। প্রতিটায় তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল প্রাসাদ। তার মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত জগ নিবাসের লেক প্যালেস।
এই লেক প্যালেস তৈরি করে রানা দ্বিতীয় জগৎ সিং। ১৭৪৩ থেকে ১৭৪৬, মোট তিন বছর লেগেছিল এই প্রাসাদ তৈরি করতে। শোনা যায়, এই লেক প্যালেস ছিল মেবারের রানাদের ভোগবিলাসের জায়গা। এখানেই গরমকালে রানিদের নিয়ে থাকতেন রানারা। পরবর্তী সময়ে এই প্রাসাদের মালিকানা বহুবার বদল হয়েছে। ঐতিহাসিক প্রাসাদকে হোটেলের রূপ দেওয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালে লেক প্রাসাদের নতুন কর্ণধার হয় তাজ গ্রুপ। নতুন নক্সায় সেজে ওঠে মেবারের রানাদের রাজপ্রাসাদ। বর্তমানে বিশ্বের সেরা হোটেলের তালিকায় তৃতীয় স্থানে লেক প্যালেস। রাজস্থানি হস্তশিল্পের সেরা নিদর্শন এই প্যালেস। এখানকার গ্যারেজে সার বেঁধে থাকে ভিন্টেজ সব গাড়ি। লর্ড কার্জন থেকে প্রয়াত প্রাক্তন মার্কিন ফার্স্ট লেডি জ্যাকলিন কেনেডি, বিশ্বের নামী সেলেব্রিটিরা অতিথি হয়েছেন এই হোটেলের।