
জয়দীপ কুন্ডু
শেষ আপডেট: 21 November 2024 16:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করতে করতে, কয়েকদিন ধরেই বারবার একটি নির্দিষ্ট ভিডিও আসছে নিউজ ফিডে। একটি জনপ্রিয় মেগা সিরিয়ালের টুকরোচিত্র। তাতে দেখা যাচ্ছে, একটি বাড়িতে হচ্ছে লক্ষ্মীপুজো। বাড়ি জুড়ে সাজোসাজো রব। এ অবস্থায় হঠাৎ করেই একটি চিতাবাঘ ঢুকে পড়েছে অন্দরমহলে। সে করিডরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে আসছে।
ঠিক তখনই সিরিয়ালের মুখ্য অভিনেতা চলে আসেন করিডরে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাঘমামা। অন্যদিকে হিরো ভীত। সন্ত্রস্ত। চিৎকার করে বাড়ির সদস্যদের বলছেন, করিডরে যেন না আসেন কেউ। কিন্তু সে সবের তোয়াক্কা না করে উৎসুক অভিনেত্রী সটান চলে আসেন সেই করিডরে।
তবে সামনে বাঘ দেখতে পেয়ে, তাঁরও ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। কীভাবে তিনি বাঁচাবেন অভিনেতা ‘স্যর’কে!
অভিনেত্রী ছুটে যান ঠাকুরঘরে। হাতে তুলে নেন একটি শঙ্খ। ছুটে আসেন ফের করিডরে। আর তারপর বাজাতে থাকেন শাঁখ। বাড়ির সবাই ততক্ষণে জেনে গিয়েছেন বাঘ কাণ্ড। কেউ প্রমাদ গুনছেন। বয়স্করা করজোড়ে ঈশ্বরকে ডাকছেন। ওই বাঘকে ‘মানুষ মারা’ বলে চিহ্নিত করে অভিনেত্রী সবাইকে নির্দেশ দেন, ‘যে যা পারো বাজাও, জোরে-জোরে বাজাও, থালা-বাটি-কাঁসর-ঘন্টা...’
যেমন বলা তেমনই কাজ। বাড়ির সবাই রণং দেহি মূর্তি ধারণ করেন। একে একে কেউ কাঁসর, ঘন্টা আবার কেউ চিৎকার করতে থাকেন তারস্বরে। বাঘ বাবাজি প্রথমে ভ্যাবাচাকা খায়। তারপর সে এমন এক অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখে, কিছু না বুঝতে পেরে পিছোতে থাকে ধীরে ধীরে। তারপর সে গর্জাতে থাকে, শেষে দরজা দিয়ে এক লাফে বেরিয়ে যায়।
অভিনেত্রীও তখন তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে এসে, বাঘ তাড়িয়ে দরজাটি বন্ধ করে দেয়।
এই ভিডিও ছড়িয়ে গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে। আর তাতে ধরা পড়েছে নানা মুনির নানা মত। হাসির রিঅ্যাকশন পড়েছে মুহুর্মুহু।
জয়দীপ কুণ্ডু, যিনি শের (সংরক্ষণ প্রচারক, বন্যপ্রাণী রক্ষাকারী সংগঠন)-এর সাধারণ সম্পাদক, তিনি জানালেন, ওই ভিডিও তিনিও দেখেছেন। ‘দ্য ওয়াল’-এর প্রশ্ন ছিল সোজাসাপটা, সত্যিই কি শাঁখ বাজিয়ে ‘মানুষখেকো’ চিতাবাঘ তাড়ানো সম্ভব?
জয়দীপের কথায়, ‘দেখুন, একটি বন্যপ্রাণী মানুষের অ্যাকশনে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে কেউ বলতে পারে না। তাই সম্ভব-অসম্ভবের বাইরে গোটা বিষয়টিকে নিয়ে একটু আলাদা করে ভাববার দরকার রয়েছে। আমি গোটা বিষয়টিতে যা দেখতে পাচ্ছি তা অজ্ঞানতার ছোঁয়া। সাধারণ মানুষদের বিভ্রান্ত করার প্রবণতা এতে রয়েছে। একটি সিরিয়ালকে আরও ‘সেন্সিটাইজ’ করতে যা খুশি, তা-ই দেখানো যায় না। তাহলে তো যৌনক্রিয়াকলাপ দেখানো হতো সিরিয়ালের টিআরপির স্বার্থে। তা আমরা দেখাচ্ছি না, কারণ মানুষের মধ্যে এখনও সুস্থ চেতনা রয়েছে। কিন্তু সিজিআইয়ের মাধ্যমে একটি লেপার্ডকে দেখানোয় সুস্থ চেতনা লোপ পাচ্ছে।’
কিন্তু একটি সিজিআই গ্রাফিক্সের মাধ্যমে চিতাবাঘ দেখানো তো অপরাধ নয়, কম্পিউটার প্রযুক্তির যে উন্নতি, তার উন্মোচনও তো প্রয়োজন!
এর উত্তরে জয়দীপ বলেন, ‘আপনি একটু বড় করে দেখলে বুঝবেন, উত্তরবঙ্গে প্রান্তিক গ্রামের আশপাশে এ ধরমের লেপার্ড হামেশাই দেখা যায়, বনাঞ্চল ছেড়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে তারা। এ খবর কিন্তু নতুন নয়। এবার ভাবুন, এমনই এক সিরিয়াল দেখে যদি মা-বোনরা বাড়িতে ঢুকে আসা বাঘের সামনে কাঁসর-ঘন্টা, শাঁখ বাজাতে থাকে, আর বাঘটি পালিয়ে না গিয়ে তাঁদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কী হবে ভাবতে পারছেন? ওটা কিন্তু সিজিআইয়ের বাঘ নয়, সত্যিকারের রক্তমাংসের চিতাবাঘ! আর সে ক্ষেত্রে যদি প্রাণ হারান কোনও প্রান্তিক মানুষ, তার দায়িত্ব কি নেবে সিরিয়ালটির প্রযোজনা সংস্থা?’
সত্যি কথা বলতে, বাঘের মুখোমুখি পড়লে ঠিক কী করতে হয়, বা করতে হয় না, তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। আরেকদিকে এও সত্যি যে কোনও বন্যপ্রাণী আনপ্রেডিক্টেবল! তাই সিরিয়ালের বাঘই হোক কিংবা ‘হীরক রাজার দেশে’ হিরের সিন্দুক আগলানো বাঘ হোক, তার সামনে শঙ্খ বাজানো কিংবা গান গাওয়া, এসব ঝুঁকি নেওয়ার কোনও অর্থ নেই। বাঘের থেকে দূরত্ব বজায় রাখাই শ্রেয়। সিরিয়ালে হোক, কিংবা রিয়ালে।