
প্রণব মুখোপাধ্যায় ও বিনোদ খান্না
শেষ আপডেট: 26 April 2025 12:57
ছ’বছর আগে ২৭ এপ্রিল মৃত্যু হয়েছিল বলিউডের অন্যতম সুপার স্টার বিনোদ খান্নার (Vinod Khanna death anniversary)। অমিতাভ বচ্চনের পরম বন্ধু ছিলেন বিনোদ। অমিতাভ যখন ‘অ্যাংরি হিরো’ হিসাবে রূপোলি পর্দায় কাঁপাচ্ছেন, তখনও বলিউডে সুপুরুষ বলতে বিনোদের আলাদা একটা ইমেজ ছিল। আটের দশকের শেষে তাঁর সিন্থল সাবানের বিজ্ঞাপন আন্দোলিত করে তুলেছিল কত সহস্র মন!
এহেন বিনোদ খান্না রাজনীতিতে এসেছিলেন ’৯৭ সালে। তখন বিজেপিতে আডবাণী-বাজপেয়ী জমানা। লালকৃষ্ণ আডবাণী ও অটল বিহারী বাজপেয়ী দুজনেই সিনেমা দেখতে ভালবাসতেন। একটা সময়ে বিজেপি যখন তেমন বড় দল নয়, তখন আকছার কনট প্লেসে সিনেমা দেখতে যেতেন দু'জনে। তাঁদের হাত ধরেই বিজেপিতে এসেছিলেন বিনোদ। পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর কেন্দ্র থেকে তাঁকে প্রার্থী করা হয়েছিল। বিনোদ জিতেছিলেন। ১৯৯৯ সালের ভোটেও গুরুদাসপুর থেকে জিতেছিলেন বিনোদ খান্না।

পাঞ্জাবে তাঁর নির্বাচন কেন্দ্র গুরুদাসপুর নিয়ে বরাবরই যত্নশীল ছিলেন বিনোদ। এখন যেমন দেব-মিমি চক্রবর্তীরা সাংসদ হয়েও সংসদ ভবনে বিশেষ যান না। অধিবেশনে বিশেষ যোগ দেন না। বিনোদ তেমন ছিলেন না। ২০০২ সালে প্রথমে তাঁকে সংস্কৃতি ও পর্যটন দফতরের মন্ত্রী করেছিলেন বাজপেয়ী। পরে বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন বিনোদ।
২০০৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির ভরাডুবি হলেও ফের গুরুদাসপুর আসন থেকে জিতেছিলেন বিনোদ খান্না। সে সময়ে নোকিয়ার কমিউনিকেটর নামে একটা ফোন ছিল। সেই ফোন ফোল্ড করা যেত। ওই রকম দুটো ফোন তাঁর এক হাতের মুঠোয় রেখে কাঁধ চওড়া করে হাঁটতেন বিনোদ খান্না। সাদা কুর্তা পাজামা পরে সংসদের অলিন্দ দিয়ে যখন হেঁটে যেতেন, কে বলবে তাঁর বয়স হয়েছে। অথচ কথায়-বার্তায় ততটাই নম্র।
২০০৫ সাল নাগাদ প্রণব মুখোপাধ্যায় (Pranab Mukherjee) যখন কেন্দ্রে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, তখন একদিন একটা মজার ঘটনা ঘটে গেল। সিনেমার জগৎ থেকে বরাবরই শত যোজন দূরত্ব ছিল প্রণববাবুর। যে সময়ের কথা হচ্ছে, তার আগে বড়জোর ‘পথের পাঁচালি’ আর ‘হারানো সুর’ দেখেছেন প্রণব। আর একটা দুটো ছবি দেখলেও মনে করে বলতে পারতেন না।

সেদিন দুপুর ১টা নাগাদ লোকসভা মুলতুবি হয়ে যাওয়ার পর লবি দিয়ে হেঁটে তাঁর কক্ষে ফিরছেন প্রণব। তখন লোকসভার নেতা তিনি। সংসদ ভবনে ১৩ নম্বর ঘরে বসেন। সভা মুলতুবি হলে প্রণব মাথা নিচু করে গটগট করে হেঁটে কক্ষে ফিরতেন। ওটাই ছিল তাঁর স্টাইল। সেদিন সেরকম ভাবেই ফেরার সময়ে বিনোদ খান্না তাঁর পাশে পাশে হাঁটছিলেন। প্রণব ছিলেন খর্বকায়। বিনোদ ছ’ফুটেরও বেশি লম্বা। মাথাটা অনেকটা ঝুঁকিয়ে বিনোদ প্রণবকে পাশ থেকেই বলেন, ‘স্যার আই এম বিনোদ খান্না’। প্রণব প্রথমে শুনতে পাননি। ফের বিনোদ বলেন, ‘স্যার আই এম বিনোদ খান্না, আই নিড টু টক টু ইউ (স্যার আমি বিনোদ খান্না, আপনার সঙ্গে একটু দরকার ছিল)'। প্রণব তাঁর দিকে না তাকিয়েই ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বলেন, কৌন খান্না (Pranab Mukherjee couldn't recognize Vinod Khanna)?
প্রণববাবু কিন্তু থামেননি। হাঁটতে হাঁটতেই এ কথা বলেন। বিনোদও সমান গতিতে তাঁর পাশে পাশে হাঁটছিলেন। ‘কৌন খান্না’ শুনে বিনোদ বলেন, “স্যার আই এম গুরুদাসপুর এমপি বিনোদ খান্না।” সংসদীয় আচার আচরণ নিয়ে প্রণবের মত দড় মানুষ কম ছিলেন। ‘এমপি’ শব্দটা শুনেই থমকে দাঁড়ান প্রণব। বিনোদের মুখের দিকে তাকান তিনি। তার পর বলেন, "আরে প্লিজ কাম, প্লিজ কাম ইনসাইড।" এ কথা বলে তাঁর ঘরে নিয়ে যান।
বিনোদ খান্না কত বড় অভিনেতা তা জানার দরকার প্রণবের ছিল না। লোকসভার নেতার সঙ্গে একজন সাংসদ দেখা করতে চাইছেন, এটাই ছিল তাঁর কাছে বড় ব্যাপার। আবার বিনোদও প্রাক্তন মন্ত্রী হিসাবে তাঁর পরিচয় দেননি। বলেছিলেন, তিনি একজন সাংসদ। এতটাই বিনয়ী ছিলেন তিনি। সংসদ ভবনে এমন সম্পর্কের রসায়ন ও পারস্পরিক মর্যাদা দেওয়ার পরম্পরা এখন আর দেখা যায় কি?