
শেষ আপডেট: 9 May 2023 12:01
বাংলা টেলিভিশনের প্রথম জনপ্রিয় সিরিয়াল ছিল 'তেরো পার্বণ' (Tero Parbon Teleserial)। রেডিও ছেড়ে বাঙালিকে টেলিভিশন দেখায় আকৃষ্ট করেছিল এই সিরিয়াল। সদ্যপ্রয়াত সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের কাহিনি (Samaresh Majumdar Novel) অবলম্বনে 'তেরো পার্বণ' সিরিয়াল করেন সিরিয়ালের জনক জোছন দস্তিদার। যে সিরিয়াল বঙ্গজীবনে মুক্ত অক্সিজেন এনেছিল। সিরিয়ালের দু'টি চরিত্র গোরা আর টিনা হয়ে উঠেছিল সবার নয়নের মণি। কিন্তু সমরেশ মজুমদার ভরসা করতে পারেননি নতুন দুটি ছেলেমেয়ে সব্যসাচী চক্রবর্তী (Sabyasachi Chakraborty) আর খেয়ালি দস্তিদারের (Kheyali Dastidar) উপর। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রে মানাবে কিনা তাঁরা!

এই কাহিনির একটা বিশেষত্ব ছিল, যেটা বাবাকে খুব টেনেছিল। যে গল্প তখনকার দিনে একদম ফ্রেশ ঘরানার। একটি ছেলে বিদেশ থেকে কলকাতা ফিরেছে সদ্য, যার নিজের দেশের প্রতি ভীষণ ভালবাসা। সেই চরিত্রটাই গোরা, করেছিলেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। মনে হয়েছিল এই গল্পটা একটু অন্যরকম যা সবার ভাল লাগতে পারে। সমরেশদাও অনুমতি দিলেন। সমরেশদার সঙ্গে আমার বাবার ভীষণ বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল। বাবার সঙ্গে সমরেশদার মেন্টালিটিও খুব ম্যাচ করত। এটাই শুরু সমরেশদার সঙ্গে কাজ।

সিরিয়াল তখন একদমই নতুন একটা কনসেপ্ট। এখন তো সবাই জানে কীভাবে সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট লিখতে হয়। তখন তো কিছুই ছিল না। দূরদর্শন থেকে একটা ফরম্যাট দেওয়া হয়েছিল, ক'বার বিজ্ঞাপন যাবে ইত্যাদি। তখন নিজেদের বিজ্ঞাপন জোগাড় করে প্রযোজকরা কাজ করতেন।
সমরেশদা ভীষণ আমুদে মানুষ ছিলেন। গল্প চিত্রনাট্য নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে ওঁর আড্ডাও হত, কাজও হত। দু'জনের তর্কও হত, সেই তর্ক মিশে গিয়ে আবার বন্ধুত্ব হত। বাবা সমরেশ মজুমদারকে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, 'নাটক-চিত্রনাট্য কী হবে সেটা আমি ভালই বুঝি। এগুলো আমার উপর ছেড়ে দিন। আপনি গল্পটা বলুন।' সমস্ত চরিত্র কীভাবে কথা বলবে, সেটা জোছন দস্তিদার ও সমরেশ মজুমদার দু'জনের ব্রেন চাইল্ড বলতে পারা যায়। সমরেশদা শ্যুটিং ফ্লোরে আসতেন। হাসাহাসি হত, গল্প হত, খুব মজা করেই কাজটা হত। শুরুর সময় তো চ্যালেঞ্জ থাকে, কিন্তু অদ্ভুত ভাবে চাপমুক্ত হয়ে কাজ করেছিলাম আমরা।

আসলে আমি বা সব্যসাচী কেউই ট্র্যাডিশানাল সুন্দর দেখতে ছিলাম না। আমাদের কেউ চিনত না। যে অর্থে সুন্দরের সংজ্ঞা, সেটা আমরা ছিলাম না। যার ফলে সমরেশদা একটু দ্বিধাগ্রস্থ ছিলেন এই চরিত্র দু'টো এমন দু'জন নবাগত পারবে কিনা। আমাদের দু'জনকে ভরসা করতে পারছিলেন না উনি। বলতে গেলে আমাদের পছন্দ হয়নি ওঁর। মনে হয়েছিল, 'গোরা টিনা এরা করলে ভাল কী হতে পারে?' আমরাও চ্যালেঞ্জ নিলাম, দেখি না কী হয়। কিন্তু টেলিকাস্ট হওয়ার পরে যখন গোরা টিনা আর তেরো পার্বণ দর্শকের মন ছুঁয়ে গেল, তখন থেকে উনি খুবই খুশি ছিলেন। ওঁর থেকে ভাল লাগা শোনাটা মনে আজও দাগ কেটে আছে।

উপন্যাস নিয়ে সিরিয়াল করতে গেলে তার শুরুও আছে শেষও আছে। সেটা ২০০ পর্ব অবধি খুব বেশি হলে হবে। ৪০০ পর্বের হবে না। দ্বিতীয়ত, লেখকদের লেখা থেকে করলে সিরিয়ালের গল্প অন্যদিকে যেতে পারবে না। এছাড়াও টিআরপি বলে একটা বস্তু এখন আছে। টিআরপি দেখে যার ট্র্যাক ভাল যাচ্ছে, তার গল্পটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সেটা সাহিত্যিকদের গল্প নিলে অসুবিধে। আর এখন চ্যানেলঅ সর্বেসর্বা। ওরাই আমাদের গল্পের আউটলাইন দিয়ে দেয়।
সবাই বলে সাহিত্যি নিয়ে গল্প করুন, কিন্তু সাহিত্য নিয়ে সিরিয়াল করলে সেই গল্প দর্শকের ভাল না লাগলে সেটা বদল করার কোনও উপায় থাকে না। এটা একটা বিরাট অসুবিধে চ্যানেলের। ঋতুপর্ণ ঘোষের 'গানের ওপারে' যদি টিআরপি দিত, তাহলে সিরিয়ালের ইতিহাসটাই অন্যরকম হত। তাহলে অন্যরকম সিরিয়াল করতেও অনেকে সাহস পেত। আমরা যারা সাহিত্যিধর্মী সিরিয়াল দেখতে চাই তাঁরা অবশ্যই একটু বঞ্চিত হচ্ছি।
সমরেশ বলেছিলেন, ‘সিরিয়ালে আর লেখা দিই না, ওখানে গল্পের গরু গাছে উঠে ঘাস খায়’