
এক ‘রাস’ভারি ছবি: গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 16 November 2024 16:04
ধীরে অথচ ক্রমশ বাঙালি সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে চিরাচরিত ঐতিহ্যগুলো। যৌথ বাঙালি পরিবার। অভ্যন্তরীন ভালবাসা। সম্পর্ক। বাঙালির মৌলিক মূল্যবোধ, তাও আজ যেন এক সমাপ্তির দিকে। এই টুকরো অনুভূতিগুলোই বাঙালিকে জড়িয়ে রেখেছিল আগাগোড়া। কিন্তু আজ তা...
বাস্তব জীবনে বিলুপ্তপ্রায় এই অনুভূতি ফিরে আসছে বড়পর্দায়। যিনি ফিরিয়ে আনছেন, তাঁর নাম তথাগত। পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায়। ছবির নাম ‘রাস’।
‘হোমকামিং’, যদি ছোট করে বোঝানো যায়, এই ছবির গল্প অনেকটা তা-ই। গল্পের মূল চরিত্ররা ফিরে আসে নিজের বাড়িতে। পরিবারের কাছে। ১৮ বছর পরে এক নাতি ফিরে আসে তাঁর আদরের দিদার কাছে, এক ছেলে ফেরে তাঁর শিকড়ের টানে। একটা ফেলে আসা সময়ের কাছে ফের ফিরে আসার গল্পই ‘রাস’।
এমন এক সময় যা-তে থাকে গ্রামের স্কুল, পুকুর, আমগাছ, বৃষ্টিতে ফুটবল, দিদার আচার, কোলে শুয়ে দেশ-বিদেশের গল্প শোনা, ঝুলন, পাড়ার নাটক, গ্রামের মেলা, বিচিত্রানুষ্ঠান, পিট্টু, ক্যারাম, পুকুরে মাছ ধরা, সাইকেল নিয়ে দূর-দূরান্তের অ্যাডভেঞ্চার, লোডশেডিংয়ে ছাদে মাদুর পেতে আড্ডা, যাত্রাপালা, বাড়ির সবাই মিলে সিনেমা দেখা, অঙ্কের মাস্টারের চলে যাওয়ার পর ভূতের গল্প...
এই টুকরো মুহর্তরা যখন সোনালী দিনগুলোয় ক্রমশ ধূসর হয়ে যায়। বড়বেলা উপচে পড়ে জীবনে। ছোটবেলা আটকা থাকে শুধু অতীতে। নিষ্ঠুর কোনও ঘটনাচক্রে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় পরিবারের প্রিয়মানুষদের সঙ্গে। যৌথ পরিবারে হঠাৎ এক দীর্ঘ শূন্যস্থান…
পরিচালক তথাগতর ছোটবেলা কেটেছে যৌথ পরিবারে। বাড়ি ছিল আলমবাজারে। এই ‘যৌথ’ অর্থাৎ একসঙ্গে একটা গোটা পরিবার এবং তার সঙ্গে জুড়ে থাকা স্মৃতি নিয়েই ‘রাস’।
ছবি প্রসঙ্গে তথাগত বললেন, ‘‘মূলত তিনটি দর্শন মাথায় রেখে আমার ‘রাস’ তৈরি। প্রথমত, আমরা আজকাল সেল্ফ কেয়ারে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছি। অন্য কেউ নয়, আমি নিজের জন্য বাঁচছি এমন এক ভাব। আমার ছবি এর বিরুদ্ধে কথা বলে। তা-ই মোশন পোস্টারে ‘একলা নিতাই’ গান ব্যবহার করেছি। জীবনে শুধু আনন্দ নেওয়া নয়, আনন্দ দেওয়াতেও যে আনন্দ, তার কথা ছবি বলবে।
দ্বিতীয়ত সোশ্যাল মিডিয়াতে ভ্যালিডেশন পাওয়ার যে প্রবণতা, শুধমাত্র কটা লাইক, শেয়ার নিয়ে দেখনদারি তা ছড়িয়ে গিয়েছে। এর বাইরেও এক জীবন আছে। নিজেকে খোঁজাও একটা জীবন। এই ছবি নিজেকে খুঁজতে শেখাবে।
এবং তৃতীয় যা আরও গুরুত্বপূর্ণ, আমরা সবার থেকে আলাদা হতে চাই, ভিড়ের মধ্যে একেবারে আলাদা। যেন কোনও না কোনওভাবে আমার উপরে নজর পড়ে। নজরকাড়া কোনও হাবভাব। আমার ছবি এর বিপরীত স্রোতে দাঁড়িয়ে, সাধারণ হওয়ার কথা বলবে, ভিড় হতে বলবে।’’
‘রাস’ ছবির চরিত্রগুলো উঠে এসেছে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প-উপন্যাস থেকে। আবার তরুণ মজুমদারের ছবির চরিত্রগুলোর সঙ্গে মিল রয়েছে ‘রাস’-এর সোমনাথ, রাই কিংবা ‘দিদিমা’র সঙ্গে, জানালেন পরিচালক।
বাঙালির চিন্তন কিংবা মননে মিশে থাকা অনুভূতির গল্পের এমন অনুপ্রেরণা এল কীভাবে?
উত্তরে তথাগত বললেন, ‘‘এটা আমার আত্মকথনের ছবি, গল্পে আমার ছোটবেলর স্মৃতি জুড়ে রয়েছে, যা একান্ত ব্যক্তিগতও বটে। সঙ্গে অম্বরীশ ভট্টাচার্যর (অভিনেতাবন্ধু) ছেলেবেলার এক ঘটনাও জড়িয়ে রয়েছে ছবিতে। ওর ছোটবেলাও যৌথ পরিবারেই তবে বড়বেলায় তা আর থাকেনি।’’
তথাগতর সহজ কথায় আরও পরিস্কারভাবে সম্পূর্ণ হল গল্পের টুকরো চিত্রপট।
দুটো পরম্পর বিরোধী সময়ে মূল্যবোধ। হারিয়ে যাওয়া ভালবাসা। বাঙালি মনন এই কাহিনির বীজ। শিকড়ের টান, নাড়ির টান আর বাঙালির সংস্কৃতি ধারণ করার কাহিনি ‘রাস’।
বাঙালি এবং এই যৌথ পরিবারের টানাপড়েন নিয়ে ছবি এর আগেও বহু হয়েছে। পরিচালক জুটি শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ছবিও তেমনই এক জঁর। সিনেমাহলে দর্শক টানার ক্ষেত্রে এক কথায় ‘ফ্যামিলি ফিল্ম’ কিন্তু ভীষণ কার্যকরী। ‘পারিয়া’র মতো অ্যাকশন থ্রিলারের পর এমন এক হালকা মেজাজের ‘গুড’ ফিল্ম বেছে নিলেন পরিচালক তথাগত। শিবু-নন্দিতার দেখানো পথেই কি হাঁটতে চলেছেন তথাগত?
‘‘আমি শুনেছি শিবুদা-নন্দিতাদি ভাল ছবি বানান। বক্স অফিসেও ভাল ফল হয়। তবে কখনও ওঁদের ছবি দেখিনি। আমার ফিল্ম বানানোয় এক দর্শন থাকে, বিনোদনের জন্য ছবি বানাই না। ‘ভটভটি’ ফ্যান্টাসি পলিটিক্যাল ছবি। গোপনে মদ ছাড়ান (রিলিজ হয়নি) ছিল ডার্ক কমেডি। ‘পারিয়া’ অ্যাকশন থ্রিলার ও সামাজিক বার্তা দেয়। ‘গাকি’ একেবারে হরর জঁর। তাই শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য আমি ছবি বানাই না।’’
প্রসঙ্গত, ‘রাস’ ছবিতে অভিনয় করছেন বিক্রম চ্যাটার্জী, দেবলীনা কুমার, অনসূয়া মজুমদার, অনির্বাণ চক্রবর্তী, রনজয় বিষ্ণু, অর্ণ মুখোপাধ্যায়, সুদীপ মুখার্জী, শংকর দেবনাথ প্রমুখ।