
শেষ আপডেট: 4 July 2022 12:51
তরুণ মজুমদার (Tarun Majumdar) মারা (Death) গেলেন। খুব মন খারাপ। তরুণ মজুমদারের শেষ দু’টি ছবি, ‘চাঁদের বাড়ি’ (Chander Bari) ও ‘ভালবাসার বাড়ি’ (Bhalobasar Bari), দুটিই আমার গল্প। আমার কাহিনিতে উনি ছবি করেন। তরুণ বাবু যে চলে গিয়েছেন, এটা এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি যখন হাসপাতালে যাই, তখনও ওঁর কাছে পৌঁছইনি, কিন্তু পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে খুব ভাল লাগছিল এটা জেনে যে উনি আস্তে আস্তে ভাল হয়ে উঠছেন। শেষ পর্যন্ত উনি চলে গেলেন।

আমি মনে করি, হয়তো সবাই মনে করে, সাহিত্য-শিল্প–সংস্কৃতি–বিজ্ঞান–সমাজসেবা–রুচি ও মানুষের মঙ্গলের জন্য যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা তো চলে যান না, তাঁরা থেকে যান। তরুণ মজুমদার রয়ে গেলেন। এই মানুষটা আমার থেকে বয়সে অনেক বড়। জ্ঞানে, বুদ্ধিতে, কীর্তিতে তিনি বিরাট। তিন প্রজন্মের তিনি শুধু চলচ্চিত্র (Cinema) পরিচালক (Producer) নন, বাঙালির হৃদয়ে যে শিল্পবোধ, রুচি ও শিক্ষার পতাকা আছে, সেই পতাকা যাঁরা যাঁরা উত্তোলন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন তরুণ মজুমদার। তিনি আমার দুটো গল্প নিয়ে ছবি করেন। তিনি কার না কার সব গল্প নিয়ে ছবি করেছেন।

২০০৬ সাল। একদিন হঠাৎ তরুণ বাবু আমাকে টেলিফোন করেন। ফোনের ওপার থেকে বলেন, ‘আমি তরুণ মজুমদার বলছি’। শুনেই তো আমার বুকের ভিতরটা ধ্বক করে ওঠে। মনে হয় যেন রূপকথার জগত থেকে নেমে এসে কথা বলছেন তিনি। তারপর তরুণ বাবু বলেন, ‘আপনি আমাকে একটা পরিবার আছে, পরিবারের সুখ-দুঃখ আছে, এমন একটা গল্প দিতে পারবেন? আপনার কিছু গল্প আমি পড়লাম। আমার মনে হল ঠিক এই ধরনের গল্প আপনার কাছে পেতে পারি। এই ধরনের গল্প কি কিছু আছে?’

আমার মনে আছে, আমার কৈশোরে শ্রীমান পৃথ্বীরাজ (Shriman Prithwiraj) ছবিটা পুরো মুখস্থ বলতে পারতাম। সেই মানুষটা আমাকে ফোন করেছেন, এ আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। আমি দু’তিনটে গল্প দিয়েছিলাম, তার মধ্যে মূল গল্পটা ছিল ‘চাঁদের বাড়ি’। এর পর বেশ কিছু মাস কেটে গিয়েছে। আমিও ভুলে গিয়েছি। এর পর আবারও একদিন তরুণ বাবু আমাকে ফোন করেন। বলেন, ‘আমি তরুণ মজুমদার বলছি। বর্ধমানে বসে আপনার গল্পটা পড়লাম।’

আমি তো অবাক! এত বড় একজন মানুষ, তিনি সাহিত্য নিয়ে এই ধরনের ছবি করবেন, এ তো আমি ভাবতেই পারছি না। ওঁকে যে জিজ্ঞাসা করব এ ব্যাপারে কিছু, সে সাহসও আমার নেই। আমি তরুণ মজুমদারের ফোন কানে নিয়ে বসে আছি, তিনি রীতিমতো আমাকে জেরা করছেন। ‘এর সঙ্গে ওর সম্পর্কটা কেন এই রকম? আপনি যে বলেছেন এ ওর উপর রেগে আছে, তাহলে ভিতরের ভালবাসাটা কীভাবে বোঝাচ্ছেন? আমি আমার মতো করে যতটা সম্ভব উত্তর দিতে শুরু করলাম। সব শুনে তিনি বললেন, ‘আচ্ছা আমি না ভেবেছি আপনার এই গল্পটা নিয়ে ছবি করব, আপনার কোনও আপত্তি নেই তো?’ আমি এর উত্তরে বেশি কিছু বলতে পারিনি।

তার পরের ঘটনা তো ইতিহাসের মত। উনি এনটি ওয়ান স্টুডিওতে আমাকে ডেকেছিলেন। তখনও একই প্রশ্ন। তখন আমি শিখলাম, জানলাম যিনি সাহিত্য নিয়ে চলচ্চিত্র করছেন, তিনি কতটা নিবিষ্ট হলে তবে একজন সফল চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়া যায়, মানুষের হৃদয় ছোঁয়া যায় তা তরুণ বাবুকে দেখে বোঝা যায়। উনি একেবারে গল্পটার প্রতিটি চলচ্চিত্রের গভীরে চলে যেতে থাকলেন। যে সময়ের বাংলা চলচ্চিত্র সারা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেই সময়ের একজন চলচ্চিত্রকার তরুণ মজুমদার। সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, তপন সিনহা, রাজেন্দ্র প্রসাদের সঙ্গে তরুণ মজুমদারের নাম নেওয়া হয়, তা তো এমনি এমনি নয়। তিনি যে কেন ওই উজ্জ্বল সময়ের মানুষ হতে পেরেছেন তা যখন উনি আমার নিজের কাহিনি নিয়ে ছবি করেছেন তখন বুঝেছি।

আমি তো চলচ্চিত্র জগতের মানুষ নই, কিন্তু আমি ওঁর কাজ দেখব বলে শ্যুটিং চলাকালীন পুরো সময়টা ওখানেই ছিলাম। এত বড় গুণীজন আমার বন্ধু হয়ে গেলেন। একদিন আমি ওঁকে প্রশ্ন করলাম, যে কোনও সাহিত্যকেই কি চলচ্চিত্র করে তোলা যায়? উত্তরে তিনি আমায় বলেছিলেন, ‘আপনি চাঁদের বাড়ি লিখেছেন, আপনি নিজের মতো একটা মূর্তি বানিয়েছেন। আমি মূর্তিটাকে ভেঙে ফেলব। ভেঙে ফেলছি দেখুন। ভেঙে ফেলে আপনার যে মাটিটা পাচ্ছি, যে মাটি দিয়ে আপনি মূর্তি বানিয়েছিলেন, আমি সেই মাটি দিয়েই একটা অন্য মূর্তি বানাচ্ছি।’ আমি সেদিন অনেক কিছু শিখেছিলাম।

এখন অনেক সময় শোনা যায়, অমুকের গল্প কেন তমুক পরিচালক এইভাবে ছবি করল? কিন্তু তরুণ মজুমদার সেদিন আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, সাহিত্য আর চলচ্চিত্র দুটো শিল্পমাধ্যম আলাদা হলেও, মাটিটা এক। এই জন্যেই তো তিনি তরুণ মজুমদার। যত দিন বাঙালি থাকবে, বাঙালির শিল্প–সংস্কৃতি–রুচি থাকবে, ততদিন তরুণ মজুমদার বেঁচে থাকবেন।
এর ঠিক দশ বছর পরে, অর্থাৎ ২০১৬ সালে একটি খবরের কাগজের প্রথম পাতায় আমার গল্প বেরোল। তার নাম ‘ভালবাসার বাড়ি’। সকালবেলায় টেলিফোন তরুণ মজুমদারের, ‘এই গল্পটা আপনি কাউকে দিয়ে দিলেন নাকি?’ ততদিনে আমার সঙ্গে ওঁর বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে। আমি বললাম, কাকে কী দেব? উনি বললেন, ‘এটা কাউকে দেবেন না। এটা দিয়ে খুব সুন্দর ছবি হবে। একটা চেষ্টা করি বুঝলেন? আমি আপনি দু’জন মিলেই একটা চেষ্টা করি।’
বাংলা ছবির স্বর্ণযুগের পরিচালক কেন তরুণ মজুমদার, কেন তাঁদের ছবি দেখার জন্য হাউসফুল হয়ে থাকত সিনেমা হল, কেন শিক্ষিত, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, পড়ুয়া, সাধারণ বাঙালি তাঁর ছবি দেখার জন্য মেতে থাকত, সেই প্রমাণ দিতে এই কথাগুলো বলা। তাঁর ছবির প্রতি ডেডিকেশন ছিল চূড়ান্ত। যাঁরা রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর পড়তে ভালবাসতেন, তাঁরা হুড়মুড়িয়ে হলে চলে যেতেন তাঁর ছবি দেখতে। সিনেমা হলের সামনে বৃষ্টির জল জমে গিয়েছে। তখন সিনেমা হলে ‘সংসার সীমান্তে’ চলছে। টিকিট কাটার জন্য লোকে হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে আছে।

আমার তাঁর সঙ্গে কাজ করতে পারার সুযোগ তো আমাকে ধন্য করেইছে, তা ছাড়াও আমার একটা অভিজ্ঞতা হয়ে রইল এই মানুষটি। তাঁকে আমার কাছ থেকে কে নেবে? কেউ নিতে পারবে না। তিনি আমার বন্ধু হয়ে ছিলেন, বন্ধু হয়েই থাকবেন।
ইস্টবেঙ্গল নিয়ে ছিল ‘গোপন প্রেম’, শতবর্ষের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন অশক্ত শরীরেও