
শেষ আপডেট: 4 July 2023 09:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘কে যায় হোথায়?’ ‘সন্দীপ রায়’ ‘অত তাড়াতাড়ি ছুটছিস কেন?’ ‘পুরুত মশাই আসেনি এখনও’ ‘অ্যাঁ! সে কী!’ ‘যাই দেখি!’
বাঙালি আবেগের সিংহাসনজুড়ে রয়েছে এই ক’টা পংক্তি। ছন্দের মাধুর্য রুপোলি পর্দায় তুলে ধরে কীভাবে একটা সিনেমার আঙ্গিক সাজিয়ে তোলা যায়, কবিতা দিয়ে কীভাবে ছবির কলকব্জায় কারুকার্য আঁকা যায়, ‘দাদার কীর্তি’তে (Dadar Kirti) সেটাই দেখিয়েছিলেন তরুণ মজুমদার (Tarun Majumdar)। তখনও ‘হীরক রাজার দেশে’র সঙ্গে বাঙালির পরিচয় হয়নি। ১৯৮০-র নভেম্বর থেকে বাঙালি আবেগের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে ছন্দবাণী ক্লাব।

সিনেপ্রেমী বাঙালিকে কাঁদিয়ে সোমবার সকালে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন বর্ষীয়ান পরিচালক তরুণ মজুমদার। তাঁর রেখে যাওয়া কীর্তি আঁকড়ে নস্টালজিয়ায় ভাসছেন দর্শকরা। মনে পড়ছে ‘ছন্দবাণী ক্লাবের’ কথা, মনে পড়ছে ‘খোঁপার গোলাপের’ কথা। আর বারবার করে মনে পড়ছে জ্যোৎস্না মোড়া সেই ভবানীপুরের সান্যাল বাড়ির কথা। ‘চাঁদের বাড়ি’-র রূপকথা আঁকা হয়েছিল সেই দালানেই। আর কিছু না হোক, শুধু এদের হাত ধরেই যুগের পর যুগ বেঁচে থাকবেন তরুণ মজুমদার। এই কীর্তির কাছে মৃত্যু বড় তুচ্ছ।

১৯৮০ সালের নভেম্বর মাসে ‘দাদার কীর্তি’ যখন মুক্তি পেল, দর্শকমনে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন একুশ বছরের এক যুবক। তাঁর অভিনয় নিমেষে নজর কেড়েছিল সকলের। তরুণ মজুমদারের হাত ধরেই বাংলা সিনেমার জগতে পা রাখলেন তাপস পাল।

ঠিক এক মাস পরেই অবশ্য মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায়ের প্রবাদপ্রতিম ‘হীরক রাজার দেশে’, বাংলা সিনেমার আরেক মাইলস্টোন। তবে সিনেমাহলে যাঁরা নিখাদ বিনোদন খুঁজতে যান, বরাবর তাঁদের কথা মাথায় রেখেই সিনেমা বানিয়েছেন তরুণবাবু। বাণিজ্যিক ছবিতেই বাজিমাত করেছেন একের পর এক। সত্তর-আশি-নব্বইয়ের দশকে তরুণ মজুমদারের ‘গণদেবতা’, ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘বালিকা বধূ’, ‘ভালবাসা ভালবাসা’-- গোগ্রাসে গিলেছে বাঙালি।

তরুণ মজুমদারের সিনেমার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের এমন নিখুঁত নিটোল ব্যবহার বাংলা চলচ্চিত্রে আর ক'জন করতে পেরেছেন? রবীন্দ্রনাথ বাঙালি মননের সঙ্গে বরাবরই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন, তিনি চিরকালীন। কিন্তু তাঁর যে গানগুলো লোকের মুখে মুখে ফেরে না, যেসব গান গীতাঞ্জলির পাতায় খানিক অবহেলিত, সেই গানগুলো নিয়েই নিজের ছবিতে আঁকিবুকি কেটেছেন তরুণবাবু। 'চরণ ধরিতে দিও গো আমারে' , 'এই করেছো ভাল নিঠুর হে' কিংবা 'বধূ কোন আলো লাগল বুকে'র মন কেমন করা সুর তরুণ মজুমদারই বাঙালির নিভৃতের গুনগুনে তুলে আনলেন।

আজও টিভি চ্যানেলের ম্যাটিনি শো, কিংবা রবিবারের সন্ধ্যায় ড্রয়িংরুম একাই জমিয়ে রাখেন তরুণ মজুমদার। তাঁর বানানো ছবি পুরনো হয়েছে, কিন্তু তাতে ধুলো জমেনি এতটুকুও। ‘দাদার কীর্তি’র মতো ছবি তাই হাজার বার দেখলেও আশ মেটে না। বাঙালি মননে তরুণ মজুমদার চিরস্থায়ী, ছিলেন, আছেন, থাকবেন।
তরুণ মজুমদার (১৯৩১-২০২২): কানন দেবীর শিক্ষানবীশ থেকে বাঙালির 'ভালবাসার অনেক নাম'
পেনসিল, ব্লাউজ, মিষ্টি— তরুণ মজুমদারকে নিয়ে কত গল্প! স্মৃতির ঝুলি খুললেন তারকারা