Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

৪৫ বছর পার করেও 'দাদা' চিরসবুজ! তাঁর 'কীর্তি' আজও চিরবসন্তের ফাগে রাঙায় বাঙালির প্রেমিকমন

শিমুলতলার সেই বাড়ি, সরস্বতী-বিনির ঝোলা বিনুনি, দেওর-বৌদির চিরন্তন মধুর সম্পর্ক, সরস্বতী পুজো, বিজয়ার প্রণাম থেকে বসন্তোৎসব-- সব মিলিয়ে রীতিমতো মজে গেল বাঙালি।

৪৫ বছর পার করেও 'দাদা' চিরসবুজ! তাঁর 'কীর্তি' আজও চিরবসন্তের ফাগে রাঙায় বাঙালির প্রেমিকমন

দাদার কীর্তি

শেষ আপডেট: 14 March 2025 10:25

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

'সবুজ প্রাণের সবুজ প্রেমের ছবি'-- ১৯৮০ সালের আসন্ন ছায়াছবির প্রচারের শিরোনাম ছিল এটাই। সেই ছবি রূপবাণী, অরুণা, ভারতীতে শুভমুক্তির পরে ইতিহাস সৃষ্টি করল এবং সেই সবুজ চিরহরিৎ হয়ে রইল বাঙালির মনে।

তরুণ মজুমদারের (Tarun Majumdar) 'দাদার কীর্তি' (Dadar Kirti) ছবি ৪৫ বছর পূর্ণ করছে এবছর। সেই উপলক্ষে 'দাদার কীর্তি'-র অভিনেতা, অভিনেত্রী, গায়িকা, কলাকুশলীরা ভাগ করে নিয়েছেন ছবি ঘিরে নানা গল্প।

উত্তম কুমারের মহাপ্রয়াণের বছর সেটা। ১৯৮০। আকস্মিক এই খবরে বন্ধ হতে বসেছে টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়া। সুচিত্রা সেন অন্তরালে। যাঁদের ঘিরে ছবিতে লগ্নি হত তাঁরাই নেই। নতুন জুটি সৃষ্টি হচ্ছে না। প্রযোজকরাও দিশাহারা। সেই বছরের ২৮ নভেম্বর ১৯৮০ তরুণ মজুমদার নিয়ে এলেন নতুন প্রজন্মের প্রেমের ছবি, 'দাদার কীর্তি'।

একঝাঁক নতুন প্রতিভাদের নিয়ে ছবি বানালেন তরুণ বাবু। টালিগঞ্জ পাড়ার বিষাদের শৈত্যপ্রবাহকে যেন বসন্তে মুখরিত করে দিল 'দাদার কীর্তি'। যেমন গল্প, তেমন অভিনয় আর তেমনি গানের দৃশ্যায়ন। দুটো জুটিকে নিয়ে গল্প।

মহুয়া রায়চৌধুরী তখন বেশ জনপ্রিয় মুখ, তাঁর সামনেই তরুণ বাবু হাজির করলেন নিতান্ত সারল্যে ভরা নবাগত তাপস পালকে। উত্তম কুমারের পরে যে নায়কের লিপে প্রচুর গান হিট। আরেকটি জুটির নায়ক 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ' অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর নায়িকা 'কুহেলী'র সেই ছোট্ট মেয়েটি, নবাগতা দেবশ্রী রায়। যিনি টলিউড সম্রাজ্ঞী হয়ে শাসন করলেন কয়েক দশক।

শিমুলতলার সেই বাড়ি, সরস্বতী-বিনির ঝোলা বিনুনি, দেওর-বৌদির চিরন্তন মধুর সম্পর্ক, সরস্বতী পুজো, বিজয়ার প্রণাম থেকে বসন্তোৎসব-- সব মিলিয়ে রীতিমতো মজে গেল বাঙালি।

তরুণ মজুমদার তাঁর ছবি প্রসঙ্গে বলছেন, 'আমি বরাবরই ভীষণ আটপৌরে জীবন পছন্দ করি। আমার কাছে প্রেমটাও খুব আটপৌরে। সেই প্রেম যত ঢেকে থাকে, তত তার সৌন্দর্য। 'দাদার কীর্তি' ছবিতে কিন্তু তাপস মহুয়ার খুব বেশি হলে ছ'টি সংলাপ আছে। কিন্তু তাও তাঁদের প্রেম বুঝতে অসুবিধে হয় কি? শরীরসর্বস্ব প্রেম দেখানোর দরকার নেই তো। আর আমার ছবিতে কখনও কোনও ভিলেন আসেনি। পরিবেশ, পরিস্থিতি ভিলেন হয়েছে।'

পেরিয়ে গেছে ৪৫ বছর। ছবির নায়ক তাপস পাল ট্র্যাজিক হিরো হয়ে আজ আর আমাদের মাঝে নেই। চলে গেছেন এই ছবির বহু কলাকুশলী। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের শতবর্ষও পেরিয়েছে। কিন্তু আজও যাঁরা আছেন তাঁরাই নানা গল্পে রামধনু এঁকে দিলেন।

মর্নিং শিফ্টে ব্যাঙ্কের চাকরি সামলে দুপুরে 'দাদার কীর্তি'র শ্যুটিং করেছিলাম: অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়

তাঁর আসল নাম পার্থসারথি বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ' অয়ন। সেই নায়ক এতযুগ পর বলতে রাজি হলেন সেসব সোনাঝরা গল্প। আজও তাঁর সেই মিষ্টি হাসি আর রোম্যান্টিক কন্ঠ এবং এখনও তিনি সুদর্শন।

অয়ন বললেন, ''শ্রীমান পৃথ্বীরাজ'-এর পর গ্র্যাজুয়েশন পাশ করে ল পাশ করি। তারপরেই 'স্টেট ব্যাঙ্ক অফ মহীশূর'-এ চাকরি পেয়ে যাই। ভাগ্যবলে আমার মর্নিং শিফ্টে চাকরি ছিল। আমার ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ ছিল রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে, ঠিক প্রিয়া সিনেমার বিপরীতে। দীর্ঘ আটত্রিশ বছর চাকরি করেছি। তো আমার ম্যানেজার বাঙালি ছিলেন। উনি আমার 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ' দেখেছিলেন। ওঁর অনেক সহযোগিতা পেয়েছিলাম। 'দাদার কীর্তি'র আগে থেকেই আমি চাকরি করি। দুপুরে আর বিকেলে শ্যুটিং করতাম। আউটডোরের সময় পাওনা ছুটি নিয়েছিলাম ব্যাঙ্ক থেকে।

তরুণ মজুমদারের মতো গুণী, রুচিবান ব্যক্তির সঙ্গে থাকতেই ভাল লাগত, সমৃদ্ধ হতাম। বাংলা ছবিতে সাহিত্যের মূল্য সবসময় ছিল। আমার 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ'-এর গল্প বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর সঙ্গে আমি দেখাও করেছি। আবার 'দাদার কীর্তি' শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তখন আমি প্রায়ই সন্ধ্যা রায় ও তরুণ মজুমদারের বাড়ি যেতাম। ওঁরা পুজোর সময় আমায় নিয়ে গিয়ে দোকান থেকে জামাপ্যান্ট কিনে দিতেন আমার পছন্দ মতো। আমিও চাকরি পাওয়ার পরে ওঁদের পুজোয় জামাকাপড় দিতাম। আর তখন তো শারদীয়া পূজাবার্ষিকী বাঙালির ঐতিহ্য ছিল। কিনতাম বইগুলো এবং গল্পগুলো যত তাড়াতাড়ি শেষ করা যায় পুজোর আগেই, এত আগ্রহ নিয়ে পড়তাম।

সেরকমই আমি পুজোর ঠিক আগেই একদিন গেছি তনুদার বাড়িতে। আমাদের বই, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হত। তনুদা কথায় কথায় আমায় বললেন, 'তুমি শরদিন্দু বাবুর প্রজাপতি নির্বন্ধ বিষয়ের গল্পটা পড়েছ আনন্দবাজার শারদীয়া পূজাবার্ষিকীতে?' আমি বললাম 'হ্যাঁ। দারুণ।' তনুদা বললেন 'আমিও তো পড়েছি। এটা নিয়েই ছবি করলে কেমন হয়!' এখান থেকেই সেদিন জন্ম হল 'দাদার কীর্তি' ছায়াছবির।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের ছায়াছবিতে দৃশ্যায়নে তনুদা সেরা। তপন সিনহাও ভাল করেছেন যদিও। সত্যজিৎ রায় তো শ্যুটিং দেখতে আসতেন ''শ্রীমান পৃথ্বীরাজ'-এর এবং সত্যজিৎ রায় তনুদাকে বলতেন, 'বাংলার সেরা বুদ্ধিদীপ্ত পরিচালক।
তরুণ মজুমদার আর সন্ধ্যা রায়কে আমার বলা আছে তোমাদের যে কোন প্রয়োজনে আমি শেষ মানুষ দাঁড়িয়ে আছি তোমাদের সাহায্য করতে।'

এখন আমি গান শুনে সময় কাটাই। প্রচুর রেকর্ড,ক্যাসেট রয়েছে আমার কালেকশনে। ক্লাসিকাল মিউজিকও শুনি। ফটোগ্রাফি আজকাল নেশা। ছবি তুলতে ভালবাসি। কখন থামতে হবে তা যদি জানতে পারে মানুষ, জীবনে তাহলে কোথাও কোনও অসুবিধা থাকবে না। সংযমটা জরুরি সব ক্ষেত্রেই। আমি ফিল্ম জগতে যাওয়ারও চেষ্টা করিনি বেরোনোরও চেষ্টা করিনি। ছবির জগতে ওঁরাই ধরে নিয়ে গেছেন। আবার ব্যাঙ্কের সুন্দর চাকরি দিয়ে সুন্দর সুস্থ জীবন দান করেছেন আমায় ভগবান। আর আমিও দেখলাম 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ'-এর মতো ছবি জীবনে আর পাব না। আমি কেন, কোনও আর্টিস্টই পাননি 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ'-এর মতো ছবি। ফিল্মের মোহময় জগতে না হেঁটে সুস্থ সুন্দর জীবন পেয়েছি এটাই ঈশ্বরের আশীর্বাদ মনে করি। দর্শকরা আজও ভালবাসেন সেটাই বা কম কী!'

আমি সবার ছোট ছিলাম, তাই আদরও যেমন পেয়েছি ভূতের ভয়ও তেমন পেয়েছি: দেবশ্রী রায়

বিন … আকাশী শাড়ি, নীল পাড় আর 'তোমার ডাকে সাড়া দিতে বয়েই গেছে' বলেছিল যে। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্তা অভিনেত্রী দেবশ্রী রায় জানালেন, 'দাদার কীর্তি, এমন একটা ছবি, এমন কোনও বাঙালি নেই যিনি এ ছবি দেখেননি। 'দাদার কীর্তি' ছবি থেকেই আমার দেবশ্রী রায় নামটা রাখা হয়েছিল। আমাদের তনুদা মানে তরুণ মজুমদার আমার এই দেবশ্রী রায় নামটা রেখেছিলেন। তার আগে ছোটবেলায় তনুদা সন্ধ্যাদির (সন্ধ্যা রায়) 'কুহেলি' ছবিতে অভিনয় করেছিলাম। তাই ইউনিটের সবার সঙ্গে একটা পারিবারিক সম্পর্ক ছিলই। 'দাদার কীর্তি'র পর তো ফিরে তাকাতে হয়নি। 'ভালোবাসা ভালোবাসা'ও কী বিশাল হিট। 'দাদার কীর্তি' ঘিরে প্রচুর স্মৃতি। একবারে সব বলাও যায় না।

একটা কথা খুব মনে পড়ছে, যেহেতু 'দাদার কীর্তি'র ইউনিটে আমি সবার ছোট ছিলাম, তাই সবার ভীষণ স্নেহ, ভালবাসা, আদর পেয়েছি। কত বড় বড় লেজেন্ড অভিনেতা-অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ করেছি। কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, রুমা গুহঠাকুরতা, যাঁরা আজ আর নেই। খুব মনে পড়ছে বুবুদা অর্থাৎ শমিত ভঞ্জর কথা। আমাদের পরিবারের সঙ্গেও বুবুদাদের পরিবারের ভাল সম্পর্ক। সুলতাদি (চৌধুরী) ফুলমতিয়ার সেই মাছভাজা খাওয়ানোর দৃশ্য। সুলতাদিও নেই। আমার মাকে খুব ভালবাসতেন সুলতাদি। তাপস নেই আমার নায়ক। পার্থ অর্থাৎ অয়ন ব্যানার্জীর সঙ্গে আজও আমার, আমার দিদি তনুশ্রীর (ঝুমকি) বন্ধুত্বটা রয়ে গেছে।

যেহেতু আমি সবার ছোট ছিলাম, তাই আউটডোরে অনুপ কুমার, কালী কাকু আরও সবাই আমাকে খুব ভূতের ভয় দেখাত। ভূত আসছে, পেত্নী আসছে। তখনও ইলেকট্রিক সেভাবে যায়নি ওই সব অঞ্চলে। লন্ঠনের আলোয় আমরা থাকতাম। তাই আরও ভয় পেতাম।

আমরা একসঙ্গে খেতে বসতাম সবাই, একদম একটা পরিবারের মতো। সেটা কিন্তু এখন আর হয় না। এখন সেই আন্তরিক পরিবেশ আর নেই। এখন কেউ ভাবতেই পারবে না।

অয়ন-দেবশ্রী জুটি কেন পরে হল না, সেটা পরিচালকরা বলতে পারবেন। আমাদের জুটি নিয়ে তনুদা পরে 'মেঘমুক্তি' করলেন। অনেক পরে অয়ন-দেবশ্রী জুটি আমরা একটা তেরো পর্বের ধারাবাহিক 'ফিরে এলাম'-এ কাজ করেছিলাম জি বাংলায়। পরিচালক হলেন আমার জামাইবাবু সঞ্জয় ভট্টাচার্য, ঝুমকির স্বামী। ডবল রোল ছিল আমার।'

আমি আজীবন ভুলব না মহুয়ার সেই কান্না: কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়

'আমার প্রথম ছবি উৎপল দত্তর 'ঝড়' দেখে তরুণ মজুমদার আমায় 'দাদার কীর্তি'তে নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করেন এবং ডেকে পাঠান ওঁদের বাড়িতে। সেই সন্ধ্যাদির (রায়) বাড়িতে প্রথম আলাপ ওঁদের সঙ্গে আমার। আমার জীবনে প্রথম সর্বকালীন সাকসেসফুল ছবি 'দাদার কীর্তি'। তার জন্য অজস্র কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, প্রণাম তরুণ মজুমদারকে। আমি যেটা যোগ করতে চাই. 'দাদার কীর্তি'র চল্লিশ বছর পূর্তি উৎসবে, সেটা হল তাপস পালকে কীভাবে গড়ে তুলেছিলেন তরুণ মজুমদার।

চন্দননগরের ছেলে তাপসের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় এ ছবিতেই। টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে তরুণ মজুমদারের অফিসে আমাদের প্রায়ই যেতে হত। ছবির গল্প যে সময়ের সেই সময়কার হেয়ার স্টাইলে আমাদের সবার চুল কাটা হয়েছিল তনুদার নির্দেশে। তাপসকে একদিন সারাদিন সকাল থেকে সন্ধ্যে তনুদা ওঁর অফিসে শুধু বসিয়ে রেখেছিলেন। তাপসের চোখ, অভিব্যক্তিগুলো দেখে তরুণ মজুমদারের জহুরীর চোখ বুঝতে পারেন কেদারের চরিত্রটা ওঁর থেকে ভাল আর কেউ পারবে না। মৃৎশিল্পী মাটির তালকে যেমন প্রতিমায় রূপান্তরিত করেন ঠিক তেমন ধীরেধীরে নবাগত তাপসকে কেদার চরিত্রে রূপদান করেন তরুণ মজুমদার। এ যত্ন আমি আর কোনও পরিচালকের মধ্যে দেখিনি। আমি সত্যজিৎ রায় এবং তপন সিংহকে বাদ দিয়ে কথাটা বলছি। তাঁরাও যত্নশীল ছিলেন। কিন্তু সেটা তো আমি চোখে দেখিনি। তরুণ মজুমদারের তাপসের উপর যত্ন আমার চোখে দেখা। তাপসের গোঁফের চুলটা অবধি উনি চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে দিতেন।

আজকে লোকে স্বীকার করুক বা না করুক 'চরণ ধরিতে দিও গো আমারে' গানটা পপুলার রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিচিত ছিল বলে আমার মনে হয়নি।'দাদার কীর্তি' দেখে অন্তত নব্বইভাগ লোক এই গানটা জেনেছে। এটা বলে আমি রবীন্দ্রনাথকে ছোট করছি না। কিন্তু এই গান আমজনতার গান হয়েছে 'দাদার কীর্তি' দেখেই। তখন আমি, তাপস, দেবশ্রী রায় সবাই নতুন অত তাবড় তাবড় বাঘের মতো শিল্পীর মাঝে।

তাঁদের মধ্যেও মহুয়া রায়চৌধুরীর মতো প্রতিভাময়ী নায়িকা যখন 'চরণ ধরিতে দিও গো আমারে' গানের শেষে পিয়ানোর উপর কান্নায় ভেঙে পড়ল, সেসময় আমি সেই শটে উপস্থিত। বিশ্বাস করবেন না, মহুয়া এত চরিত্রটার মধ্যে এমন ঢুকে গিয়েছিল যে শটের পরেও মহুয়া কেঁদেই চলেছে পিয়ানোর উপর। শেষ অবধি তনুদা গিয়ে মহুয়াকে যখন তুললেন, তখনও মহুয়া হাউহাউ করে কাঁদছে। তনুদা বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। সে যে কী দৃশ্য! কত বড় অভিনেত্রী। আমি তার পর এত অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ করলাম আজ অবধি আর কোনও অভিনেত্রীর মধ্যে ওই আবেগ দেখার সৌভাগ্য হল না। নিয়তির খেলায় মহুয়াও বড্ড তাড়াতাড়ি চলে গেল। আমি আজীবন ভুলব না মহুয়ার সেই কান্না।

আরেকটা ঘটনা বলতে পারি, 'দাদার কীর্তি' যে দিন রিলিজ করল 'ভারতী' সিনেমায় প্রিমিয়ার ছিল। সেখানে উৎপল দত্ত সিনেমাটা দেখতে এসছিলেন। আমার মনে আছে যখন সিনেমাটা শেষ হল উৎপল দত্ত বেরিয়ে এসে কালী ব্যানার্জীর দিকে তাকিয়ে বললেন 'উফঃ এই মানুষটা কি কোনওদিন খারাপ অভিনয় করবে না!' একজন পাহাড় প্রমাণ অভিনেতা আরেকজন লেজেন্ড অভিনেতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন, এই ঘটনা আজকের দিনে বিরল। সোনার মুহূর্ত!

দাদার কীর্তি'র প্রথম দৃশ্যে আমার বাবা হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন। ওটা কিন্তু 'দাদার কীর্তি'র প্রথম দিনের শ্যুটিং। আমার বাবার সঙ্গে তাপসের দৃশ্য শ্যুট হয়। আরেকটা অদ্ভুত সমাপতন আমি বলব, দাদার কীর্তি'র শুরু হচ্ছে আমার বাবাকে দিয়ে আর শেষ হচ্ছে আমাকে দিয়ে। ছবির শেষ দৃশ্য ছিল আমি চলে যাচ্ছি। একটা বৃত্ত যেন সম্পূর্ণ হল।

হেমন্তদার মুখটা হয়তো রাখতে পেরেছি: অরুন্ধতী হোমচৌধুরী

দাদার কীর্তি ছবিতেই আমার প্রথম তরুণ মজুমদারের সিনেমায় প্লেব্যাক। হেমন্তদা (মুখোপাধ্যায়) তনুদাকে আমার কথা খুব বড় মুখ করে বলেছিলেন, হেমন্তদার সেই মুখটা হয়তো রাখতে পেরেছি। আমার জীবনে বিরাট বড় পাওনা। সেই 'বধূ কোন আলো লাগল চোখে' তো আমার কণ্ঠে মহুয়া রায়চৌধুরীর লিপে সাড়া পড়ে গেল। এই শুরু। তারপর তো ওঁর ছবিতে পরপর গেয়েছি।

আর ওই সময়টা আমি আর মহুয়া জুটি হয়ে গেছিলাম। 'বেহুলা লক্ষীন্দর' থেকে আরম্ভ করে অনেক ছবিতে জনপ্রিয় হয়েছে আমাদের গায়িকা-নায়িকা জুটি। দেবশ্রী, মুনমুনের লিপেও গেয়েছি। আমি যখন স্টুডিওতে গান করতাম মহুয়া তো এসে বসত। কারণ ও দেখত কী করে আমি গান গাইছি, ওকে লিপসিঙ্ক তো করতে হবে। মহুয়া বলত, 'তোমার গানে ইমোশান দেখতে আমি এসছি দিদি।' খুব ভাল লাগত ওর ওই সরলতা। এখন আর এসব নেই প্লেব্যাকে।

অনেক জায়গাতেই আজকাল দেখি 'এসো প্রাণ ভরণ' রবীন্দ্রসঙ্গীত বলে বাজানো হচ্ছে। এ গান কিন্তু হেমন্তদার সুর আর পুলকদার কথা। তবে 'আলো' ছবির গান সুন্দর ভাবে সিকোয়েন্স বার করে আজকাল সিরিয়ালে করে ভাল লাগে। তনুদার 'আলো', চাঁদের বাড়ি' পরপর ছবিতে আমি আর শিবাজী (চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গীত পরিচালনাও করেছি।
চল্লিশ বছর পর আজও যদি কেউ 'দাদার কীর্তি' দেখে, ছবিটা নতুন মনে হবে। এটাই ছবিটার ম্যাজিক। গানগুলোর ম্যাজিক। এই মাপের ছবি তো আর হচ্ছে না। সেসব অভিনেতা কোথায়, কেউই তো প্রায় নেই। সব মিলিয়ে ছবিটা আজও সবার মনে নতুন।'

অনুপ কুমার আর আমাদের ছন্দবাণী ক্লাব আজও লোকে মনে রেখেছে: চন্দন দাস

ভোম্বলদাকে বাদ দেওয়া যায় না। অনুপ কুমার দাসকে নিয়ে গল্প শোনালেন ছন্দবাণী ক্লাবের সদস্য অভিনেতা চন্দন দাস। বললেন, 'ছন্দবানীর সদস্যদের সংলাপের ছন্দকার ছিলেন তরুণবাবু স্বয়ং। তিনি ছন্দ করে রির্হাসালের সময় বলে দেখিয়ে দিতেন সবাইকে। শক্তি ঠাকুর কয়েক বছর আগেই প্রয়াত হলেন, উনিও এই ক্লাবের সদস্য ছিলেন। আর সেই হোলির গান।

অনুপকুমার সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে কালী ব্যানার্জীর সঙ্গে খুব মজা করতেন। শিমুলতলায় ওঁদের তিনজনকে লোকেশনে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে অ্যাম্বাসাডর গাড়িটা ছিল, তাতে পেছনের সিটে সত্যদা বসতেন। কালীদা বসতেন ড্রাইভারের পাশের সিটে, সবার আগে উঠে। পেছনের সিটে জায়গা থাকা সত্ত্বেও অনুপদা আর সত্যদা ইশারায় নিজেদের মধ্যে ইঙ্গিতপূর্ণ কিছু কথা বলে নেন। আর তার পরেই দেখলাম অনুপদা সামনের সিটেই কালীদাকে ঠেলেঠুলে বসলেন। কালীদা আপত্তি করলে এবং পেছনের সিটে অনুপদাকে বসার জন্য বললে অনুপদা বললেন, 'টিলা আর পাহাড়ের এই রাস্তায় গাড়িতে সামনের দিকে বেশি ভার না দিলে গাড়ি এগোবে না, ড্রাইভার বলল।'

বিস্মিত কালীদা আর কী করেন।একবার ড্রাইভারের দিকে তাকান,একবার অনুপদা আর সত্যদার দিকে। গাড়ি ওই অবস্থায় চলল। ওই বয়সেও ওঁরা প্রাণখোলা আনন্দ আর মজায় নিজেদের মাতিয়ে রাখতেন। আর সবশেষে বলি, শিমুলতলায় থাকাকালীন ডাকাতের উপস্থিতির কথাও ভুলব না। তবে শেষমেষ ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একজনকে ধরা হয়েছিল জানি।'


```