
শেষ আপডেট: 23 July 2023 12:39
রবীন্দ্র, শরৎ, বঙ্কিম যুগের পর যে দু'জন সাহিত্যিকের কাহিনি নিয়ে সবথেকে বেশি বাংলা চলচ্চিত্র হয়েছে তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (Tarashankar Bandyopadhyay) ও আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। বাঙালির প্রিয় দুই সাহিত্যিক, যাঁদের কলমই ছিল ফিল্মের চিত্রনাট্যের মতো। তাই তাঁদের লেখা প্রায়ই সুপারহিট হত বক্সঅফিসে।
বাংলায় তাঁর জন্মদিন ৮ই শ্রাবণ। ১৮৯৮ সালের ২৩ জুলাই। বাড়ির পূজিত গৃহদেবতাকে নিবেদন করা পায়েস খেয়ে প্রতিবার জন্মদিন শুরু করতেন তারাশঙ্কর। তাঁর আদি বাড়ি লাভপুর। থাকতেন বেশিরভাগ সময় কলকাতাতেই। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১২৫ বর্ষে ফিরে দেখা যাক তাঁর কাহিনি নির্ভর বাংলা ছবিগুলি।
তারাশঙ্কর ছিলেন একাধারে কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ লেখক। বাংলা ছবিতে সংলাপ লেখক হিসেবেই প্রথম পাওয়া যাচ্ছে তারাশঙ্করের নাম। ১৯৪৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'আলেয়া' ছবির সংলাপ লিখেছিলেন তিনিই। কাহিনিকার ও পরিচালনা নব্যেন্দু সুন্দর। সঙ্গীত পরিচালনা সুবল দাশগুপ্ত। অভিনয়ে রমলা দেবী, ছবি বিশ্বাস ও প্রমোদ গাঙ্গুলি। ১৯৪৫ সালে এল তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে ছবি 'দুই পুরুষ'। অভিনয়ে ছবি বিশ্বাস, চন্দ্রাবতী, সুনন্দা, অহীন চৌধুরী, জহর গাঙ্গুলি। চন্দ্রাবতীর অভিনয় বিশেষ ভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। পরিচালক ছিলেন সুবোধ মিত্র। ১৯৭৮ সালে আবার তারাশঙ্করের 'দুই পুরুষ' করলেন সুশীল মুখোপাধ্যায়, এবার অভিনয়ে উত্তমকুমার, সুপ্রিয়া দেবী, লিলি চক্রবর্তী, দিলীপ রায়। 'দুই পুরুষ' মঞ্চেও থিয়েটারে ছিল হিট নাটক।

১৯৪৮ সালে তারাশংকরের 'ধাত্রীদেবতা' ছবি পরিচালনা করলেন কালীপ্রসাদ ঘোষ। অভিনয়ে ছায়া দেবী, অঞ্জলি রায়, ছন্দা দেবী, অনুপ কুমার, শম্ভু মিত্র। সঙ্গীতে দুর্গা সেন।
১৯৪৯ সালে এল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Tarashankar Bandyopadhyay) কাহিনি অবলম্বনে সবথেকে বড় হিট ছবি। দেবকী কুমার বসুর 'কবি'। আধ্যাত্মিকতা, বর্ণবৈষম্য বিপ্লব আর আধুনিক নবজাগরণের পথিকৃৎ ছিলেন আচার্য দেবকী বসু। 'কবি'র চিত্রনাট্য ঠিক করে দিতে দেবকী বসুর বাড়িতে আসতেন তারাশঙ্কর।
দেবকী কুমার বসুর নবতিপর পুত্র পরিচালক দেবকুমার বসু 'দ্য ওয়াল'-কে বললেন, "আমার বাবা দেবকী কুমার বসু, তারাশঙ্কর বাবুর 'কবি' বাংলা ও হিন্দি, দুই ভাষাতেই করেছিলেন। বাংলা রিলিজ করে ১৯৪৯ সালে আর হিন্দি ১৯৫৪ সালে। বাংলায় কবির ভূমিকায় রবীন মজুমদার, ঠাকুরঝি অনুভা গুপ্ত এবং বসন নীলিমা দাস। হিন্দি 'কবি'তে ছিলেন ভারতভূষণ, নলিনী জয়ন্ত ও গীতা বালি। দেবকী কুমার বসুর পরিচালনাকে শ্রদ্ধা করতেন তারাশঙ্কর বাবু।

একটা ঘটনা মনে পড়ছে আমার সঙ্গে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখোমুখি পরিচয়ের। কবির হিন্দি চিত্রনাট্য তারাশঙ্কর বাবু আমাদের বাড়িতে এসে ঠিক করছিলেন। সে সময় আমি ওঁর সামনে বসেছিলাম। তারাশংকর বাবু আমাকে বললেন, তুমি তো দেবকী কুমার বসুর ছেলে, তোমার নাম কী? আমি বললাম, আমার নাম দেবকুমার বসু। উনি বললেন, তোমার নামের 'কী'টা কোথায় গেল?" আমি ওঁকে উত্তর দিলাম, মানুষের জীবনে 'কী'টাই আসল! খুশি হয়েছিলেন উনি। আসলে আমার নাম দেব কুমারে দেবের পর কী যোগ করলেই আমার বাবার নাম দেবকী কুমার হয়। সেটাই উনি মজা করে বলেছিলেন। তারাশঙ্কর বাবুর 'কবি'র জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে, দেবকী বসু 'কবি' ছবি করাতেই।"

হিটের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলেছিল 'কবি'। তারাশংকর 'কবি' দেখে মুগ্ধ হয়ে চিঠি লিখেছিলেন দেবকী কুমার বসুকে।
এর পরে ১৯৪৯ সালেই রিলিজ করল তারাশঙ্কর (Tarashankar Bandyopadhyay) রচিত কাহিনি নিয়ে ছবি 'সন্দীপন পাঠশালা'। এই ছবির বিশেষত্ব, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীত পরিচালনায় সুচিত্রা মিত্রর প্রথম প্লে ব্যাক। 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে'। এই গানই পরে সুচিত্রার সিগনেচার গান হয়ে যায়।

১৯৫৪ সালে তারাশঙ্করের বিখ্যাত কাহিনি 'না' অবলম্বনে ছবি হল। সন্ধ্যারাণী, রবীন মজুমদার ও বিকাশ রায়। সাহিত্যে নায়িকার কণ্ঠে একটাই সংলাপ ছিল শেষে, 'না'। সে দোষীকে দোষী জেনেও না বলছে আদালতে। তাই 'না' নাম দেন তারাশঙ্কর। তবে ফিল্মে নায়িকার অনেক সংলাপ ছিল। কিন্তু ছবির শেষে সন্ধ্যারাণী বলবেন 'না'। থিয়েটারে লিলি চক্রবর্তী অনবদ্য অভিনয়ে মঞ্চ কাঁপিয়েছিলেন 'না' করতে গিয়ে।

১৯৫৫ সালে এল 'রাইকমল'। উত্তমকুমারের বিপরীতে নবাগতা কাবেরী বসু। কাবেরীর লিপে অসম্ভব হিট করল গীতশ্রী ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া কীর্তনগুলি। তুলসী চক্রবর্তী এই ছবিতে অভিনয় ও প্লেব্যাক দুইই করেছিলেন। সঙ্গীত পরিচালনা পঙ্কজ কুমার মল্লিকের।
সেই বছরেই এল নরেশ মিত্রর পরিচালনায় তারাশঙ্করের 'কালিন্দী'। চরিত্র চিত্রণে অনুভা, নরেশ, বিকাশ, দীপ্তি, সরযূবালা, নীভাননী। ১৯৫৮ সালে নির্মল দে করলেন 'চাঁপাডাঙার বউ'। অভিনয়ে কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুভা, উত্তম ও সাবিত্রী। এই বছরই এল 'ডাক হরকরা'। অনেকটা সেই 'রানার'-এর গল্প যেন উঠে এল ছবিতে। কালী বন্দ্যোপাধ্যায় অসাধারণ অভিনয় করেন। 'ডাক হরকরা' ছবি আর পাওয়া না গেলেও গীতা দত্তের কণ্ঠে 'কাচের চুড়ির ছটা' গানের জন্য ছবিকে কেউ ভুলতে পারবে না।
৫৮ সালেই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Tarashankar Bandyopadhyay) 'জলসাঘর' নিয়ে কালজয়ী ছবি করলেন সত্যজিৎ রায়। তারাশঙ্করের ‘জলসাঘর’ গল্পটি বঙ্গশ্রীতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৪ সালের বৈশাখ মাসে। সত্যজিতের অনুরোধে চিত্রনাট্যও লিখে দিলেন তারাশঙ্কর। সত্যজিৎ রায় দেখলেন চিত্রনাট্য মূল গল্প থেকে অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে। সে কথা জানাতেই লেখক সত্যজিৎকে নিজেই চিত্রনাট্য লিখে নিতে বললেন।
'জলসাঘর'-এ বেগম আখতার একইসঙ্গে পর্দায় অভিনয় ও গান করেছিলেন। এ ছবিতে বিখ্যাত গায়িকা জোহরা বাঈয়ের মেয়ে রোশন কুমারীর নাচ আজও ঐতিহাসিক। যে নাচ দেখে ছবি বিশ্বাস আর গঙ্গাপদ বসু মুগ্ধ হবেন এবং ছবি বিশ্বাস বলবেন সেই আইকনিক সংলাপ "প্রথম ইনাম দেবার অধিকার হল গৃহস্বামীর।" ১৯৫৮ সালে এসেছিল তারাশঙ্করের 'নাগিন কন্যার কাহিনি'। এ ছবি ছিল সন্ধ্যা রায়ের প্রথম নবাগতা হিসেবে একেবারেই ছোট রোলে অভিনয়।
১৯৫৯ সালে তারাশংকরের কাহিনি নিয়ে ছবি হল 'হেডমাস্টার'। সেখানেও নামভূমিকায় ছবি বিশ্বাস।
উত্তম-সুচিত্রা জুটি তখন ভাঙতে বসেছিল। সুচিত্রা সেন বম্বে চলে গেছিলেন ছবি করতে। দু'জনের ভিতর চূড়ান্ত মান-অভিমানের পালা চলছে। সেসময় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'সপ্তপদী' ছবি করার কথা ভাবলেন পরিচালক অজয় কর। উত্তমও রাজি। কিন্তু সুচিত্রা সেন? অনেক বার ডেট চেঞ্জ করে শেষ অবধি উত্তমকুমারের সঙ্গে ফের জুটি বাঁধতে রাজি হলেন মিসেস সেন।
অজয় কর কন্যা কৃষ্ণা মুখোপাধ্যায় বললেন, "তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনিতে ছিল নায়ক কৃষেন্দু কুষ্ঠরোগীদের সেবা করতে গিয়ে কুষ্ঠতে মারা যাচ্ছে। কিন্তু আমার বাবা ছবির বিয়োগান্তক শেষ কখনও চাইতেন না। তার ওপর উত্তম-সুচিত্রার ম্যাজিক তো মিলনেই। সে কারণে তারাশঙ্কর বাবুর সাহিত্যের থেকে সপ্তপদী ছবির শেষ আলাদা। কৃষ্ণেন্দু আর রিনা ব্রাউনের মিল দেখালেন বাবা। ছবি দেখে খুবই খুশি হয়েছিলেন তারাশঙ্কর বাবু। সপ্তপদীর প্রযোজক শুধু উত্তমকুমার নন। প্রযোজনা সংস্থা 'আলোছায়া প্রোডাকশান' তৈরি করেন উত্তমকুমার, অজয় কর ও আলো সরকার মিলে। বাবার কালজয়ী ছবি গুলি তারাশঙ্কর বাবু বা আশুতোষ বাবুর কলমের।"
১৯৬২ সালে রিলিজ করল উত্তম-সুচিত্রার 'বিপাশা'। তারাশঙ্কর (Tarashankar Bandyopadhyay) কাহিনি। এই ছবিটি ছিল উত্তম-সুচিত্রার পরিণত ছবির একটি। এরপর সাত বছর উত্তম-সুচিত্রার কোনও ছবি আসেনি। ১৯৬৯ সালে আবার 'গৃহদাহ' দিয়ে ফিরল এই জুটি এবং চেহারায় চূড়ান্ত বদল আসা শুষ্ক সুচিত্রা সেন।
১৯৬২ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্য বছর। তাঁর কাহিনি নিয়ে সত্যজিৎ রায় করলেন 'অভিযান'। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বম্বে থেকে বাংলা ছবি করতে এলেন ওয়াহিদা রহমান। আবার একই বছর তপন সিনহা বানালেন 'হাঁসুলি বাঁকের উপকথা'। শ্যুটিং হল তারাশঙ্করের জন্মভূমি লাভপুরে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নসুবালাকে রচনা করেছিলেন একদম বাস্তবের আদলে, যে কিনা তৃতীয় লিঙ্গের চরিত্র। ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ তারাশঙ্করের শ্রেষ্ঠতম উপন্যাসের বিখ্যাত চরিত্র নসুবালা। তাঁকে বাস্তবের লালমাটি থেকেই তুলে এনেছিলেন লেখক। শাড়ি পরা নারীসুলভ চেহারা, মাথায় খোঁপা বাঁধা, হাতে নোয়া শাঁখা পরা পুরুষটির নাম নসুবালা। উপন্যাসে সে করালীর তুতো ভাই। করালীর সঙ্গে নসুর একটা প্রচ্ছন্ন মিলনের গল্পও সাহিত্যে ছিল।

সেটা ১৯৪৭ সাল। এমন একটি তৃতীয় লিঙ্গের চরিত্রকে বাস্তবেও দিনের পর দিন দেখেছিলেন তারাশঙ্কর। তাঁকে বিন্দুমাত্র বিকৃত না করে তুলে ধরেন তাঁর উপন্যাসে। কিন্তু ১৯৬২ সালে যখন তপন সিনহা ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ ছবি করলেন, তখন তাঁর নসুবালা হল একজন পূর্ণ নারী চরিত্র। চরিত্র চিত্রণে লিলি চক্রবর্তী। লিলি চক্রবর্তীর কেরিয়ারে আইকনিক চরিত্র নসুবালা। কিন্তু তপন সিনহার ছবি দেখে চটে গেলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। বললেন, “তপনবাবু, আপনার ছবিতে নসুবালা মেয়ে চরিত্র কেন?”
তিনি তো নসুকে মেয়েলি পুরুষ করে লিখেছেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তপন সিনহা গেলেন সেই গ্রামে, আসল নসুকে দেখতে। নসু এসে প্রণাম করলেন তারাশঙ্করকে। কিন্তু নসুবালাকে পুরুষ চরিত্রে দেখাতে পারলেন না তপন সিনহা, যাঁর আবার আর একটি পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল! এই দৃশ্য দেখানোর মতো সাহসিকতা ছয়ের দশকের বাংলা ছবিতে ছিল না। তপনবাবু বিদেশ ঘুরে পুরস্কার জিতে এলেও তিনি এই সাহস তাঁর ছবিতে দেখাতে পারেননি। দর্শক জানল নসুবালা নারীই। কিন্তু আদতে সে ছিল তৃতীয় লিঙ্গের চরিত্র।
১৯৬৩ সালে এল উত্তম-সুপ্রিয়া-সাবিত্রীর 'উত্তরায়ণ'। সব কিছু ছাপিয়ে গেল সাবিত্রীর সতী চরিত্রটি। সে বিধবা হয়েও সধবার অভিনয় করে যায় আমৃত্যু। সত্যি সে সতী। যার সঙ্গে পুরষোত্তম নারায়ণ শিলার বিয়ে হয়েছে, তার শাঁখা ভাঙে কার সাধ্যি। ছবির শেষে সতী গঙ্গার জলে বিলীন হয়ে যায়।
১৯৬৫ সালে এল 'জয়া'। 'জয়া' ছিল বারোয়াড়ি উপন্যাস। প্রতিটি পরিচ্ছেদ লিখতেন ১২ জন সাহিত্যিক। প্রথম পরিচ্ছেদ শুরু করেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাতে শেষে তারাশঙ্করও (Tarashankar Bandyopadhyay) লেখেন। 'জয়া' ছিল সে বছরের ১৭ সপ্তাহ চলা সবথেকে বড় হিট ছবি। দুর্গাপুজো কেন্দ্রিক একান্নবর্তী পরিবারের গল্প। হিট করেছিল গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া 'হরে কৃষ্ণ নাম দিল প্রিয় বলরাম, রাখাল রাজা নাম রাখে ভক্ত শ্রীদাম।"

১৯৬৯ সালে 'শুক-সারী' আর 'আরোগ্য নিকেতন'। 'আরোগ্য নিকেতন' উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৫৫ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার ও ১৯৫৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। বিজয় বসুর এই ছবিতে বিকাশ রায় অসাধারণ অভিনয়ের সাক্ষর রেখেছিলেন।
১৯৭০ সালে যাত্রাশিল্পীদের নিয়ে 'মঞ্জরী অপেরা'তে কলম ধরেছিলেন তারাশঙ্কর, যা নিয়ে ছবি করেন অগ্রদূত গোষ্ঠী। উত্তম-সাবিত্রীর উল্লেখযোগ্য ছবি। সাবিত্রীর লিপে সন্ধ্যার গান 'আজ হোলি খেলব শ্যাম' যেমন হিট করল, তেমন চর্চিত হল জ্যোৎস্না বিশ্বাসের স্বল্পবেশ নাচ।
১৯৭১ সাল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত হন। তখন তাঁর কাহিনি নিয়ে 'ফরিয়াদ' ছবি করছিলেন বিজয় বসু। কাহিনিকার তারাশঙ্কর প্রয়াত হওয়ায় সংলাপ লেখেন সমরেশ বসু। সুচিত্রা সেন ক্যাবারে গার্লের রোলে ব্লকব্লাস্টার হিট দেন এ ছবিতে। উৎপল দত্তের বরেণ মল্লিক ভিলেন চরিত্র দেখে সবাই শিউরে উঠেছিল। তবে 'ফরিয়াদ'-এর চিত্রনাট্য তারাশঙ্করের লেখা কাহিনির থেকে কিছুটা বদল হয়েছিল। ছবিতে দেখানো হয়েছিল ছবির নায়িকা চাঁপাকে তাঁর বাবা আর স্বামী বরেণ মল্লিকের হাতে বেচে দিচ্ছে। সমালোচকরা বলেছিলেন ১৯৭১ সালে একটি শহুরে শিক্ষিতা মেয়েকে কী এভাবে কারও হাতে বিক্রি করা যায় টাকার বিনিময়ে? তারাশংকর দেখে যেতে পারেননি এ বিতর্ক। তবে বিতর্ক ছবির বক্সঅফিস কমাতে পারেনি বরং সুচিত্রার কেরিয়ারে বড় হিট 'ফরিয়াদ'।
১৯৭২ সালে উত্তম-সুচিত্রার ছবি 'হার মানা হার' ছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Tarashankar Bandyopadhyay) 'মহাশ্বেতা' উপন্যাস নিয়েই। 'মহাশ্বেতা' রূপে পর্দায় ধরা দিলেন সুচিত্রা সেন। উত্তম ক্যানভাসে আঁকবেন মহাশ্বেতা সুচিত্রার ছবি। এই ছবি দিয়েই হল শেষ উত্তম-সুচিত্রা-তারাশঙ্কর ট্রায়ো যুগ।

তারাশঙ্কর প্রয়াত হওয়ার পরে ১৯৭৭ সালে তাঁর ভাইপো পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায় করেছিলেন 'প্রতিমা'। অনেক বড় বড় নায়িকার দোরেই ঘুরেছিলেন পলাশ বাবু, কিন্তু কলকাতার নায়িকারা ফিরিয়ে দেন এই রোল। বম্বের মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ও ডেট দিতে পারেন না। শেষে সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় করতে রাজি হন। ভোগী প্রতাপশালী জমিদারের ছোট বউয়ের মুখের আদলে প্রতিমার মুখ গড়ে ফেলবে নতুন পটো।

একই গল্প নিয়ে ২০০৫ সালে সাহসী ছবি করলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। 'অন্তরমহল'। সুমিত্রার রোলটি করলেন শর্মিলা-তনয়া সোহা আলি খান। সোহার গলা ডাবড করলেন রিমঝিম মিত্র।

১৯৭৯ সালে তারাশঙ্করের 'গণদেবতা' নিয়ে ছবি করেছিলেন তরুণ মজুমদার। যে মাল্টিস্টারার ছবি বড় হিট। ১৯৮২ সালে সারিকাকে নিয়ে বিমল ভৌমিক বানালেন 'বন্দিনী কমলা', পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'অগ্রদানী' রিলিজ করে ১৯৮৩ সালে। অগ্রদানী বামুন নিজের ছেলের পিন্ডি নিজেই খাচ্ছেন দেখিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় সাড়া ফেলেছিল। তবে অনেকেই বলেছিলেন, সৌমিত্রকে অগ্রদানী বামুনের রোলে বা যাত্রার অদ্ভুত নাটুকেপনায় মানাইনি। মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মতে অগ্রদানী করা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ভুল সিদ্ধান্ত।
১৯৮৩ সালে মুনমুন সেন আর তাপস পালকে নিয়ে তারাশঙ্করের 'দীপার প্রেম' পরিচালনা করলেন অরুন্ধতী দেবী। এই ছবি থেকে একসময় সরে দাঁড়ান অরুন্ধতী। তাই ছবির মেকিং, সংলাপ সবকিছুই দুর্বল। মুনমুন সেনও তাঁর আড়ষ্ট অভিনয়ে জমাতে পারেননি। তবে সুচিত্রা সেন খুশি হয়েছিলেন মেয়ে মুনমুন অরুন্ধতী দেবীর ছবির নায়িকা হওয়াতে। তনুজাকে নিয়ে পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'শিলালিপি' রিলিজ করে ১৯৮৪ সালে।

তারাশঙ্করের (Tarashankar Bandyopadhyay) 'না' বেশিবার চলচ্চিত্র, মঞ্চ ও টেলিভিশনে হয়েছে। 'না' ইটিভি বাংলার টেলিফিল্মে নায়িকা হন শ্রীলেখা মিত্র। সাহিত্যের সেরা সময়েও 'না' সিরিয়াল হয়েছে।
বাংলা ছবির ঘরানা এরপর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে। শুরু হয় হিন্দির নকল মারদাঙ্গার ছবি। শেষ হয়ে যায় সাহিত্যধর্মী ছবির যুগ। রবীন্দ্রনাথের গল্পের ছবিগুলি বেঁচে থাকলেও শেষ হয় শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর, আশুতোষদের যুগ। ২০১১ সালে তারাশঙ্করের 'বেদেনি' করেন অঞ্জন দাস, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে নিয়ে। একেবারেই চলেনি সে ছবি।
তবে সাহিত্যিক তারাশঙ্করের থেকেও চলচ্চিত্রে তারাশঙ্করের সৃষ্টি কদর ও প্রচার বেশি পেয়েছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু গীতিকার হিসেবেও স্বাক্ষর রেখেছিলেন 'কবি', 'হাঁসুলি বাঁকের উপকথা', 'মঞ্জরী অপেরা' ছবিতে। আকাশবাণীর রম্যগীতিও লেখেন তিনি। তাঁর রচিত গান গেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় থেকে জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়।
রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী অধ্যায়ে তারাশঙ্কর (Tarashankar Bandyopadhyay) ছিলেন বাংলা সাহিত্য জগতে লুব্ধক নক্ষত্রের মতন। ১৯৭১ সালে তাঁর মৃত্যুর বছরেই সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁকে মনোনীত করা হয়েছিল। যদিও সেই বছর সাহিত্যে নোবেল পান চিলির বিখ্যাত কবি পাবলো নেরুদা।
কৃতজ্ঞতা: ডঃ জ্যোতিপ্রকাশ গুহ, দেবাশিস বসু
চরম অর্থসঙ্কটে উত্তমকুমারের নায়িকা, কাটাচ্ছেন অথর্ব জীবন! সঞ্জীবকুমারকে ভালবেসে ব্যর্থ যৌবনে