
শেষ আপডেট: 26 January 2024 15:50

‘বিষকন্যা’ সুপ্রিয়া, বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনায় আজীবন অশ্লীলতার দায় বয়ে গেছেন সুপ্রিয়া দেবী।
সুপ্রিয়াও বুঝতেন সমাজের এই বিদ্রুপ। তাই তিনি ভদ্র মুখোশধারী সমাজের মুখের উপর এমন স্টাইল, পোশাক, মেকআপ করতেন যে তাকে নিয়ে গসিপ করা সমাজও চমকে যেত। খোলা চওড়া পিঠ, পুরু ঠোঁট আঁকা গাঢ় লিপস্টিক, নগ্নহাতা ব্লাউজ, সরু কোমরে কোমরবন্ধনী, সঙ্গে তুলে নিতেন জমকালো বেনারসী বা শিফন।

চলচ্চিত্রেও তাঁকে দেখি আমরা নতুন নতুন আঙ্গিকে। কখনও 'সবরমতী', চিরদিনের' লাউড লুক মোটা ঠোঁট একে গাঢ় লিপস্টিক, নিত্য নতুন হেয়ারকাট। বাংলা ছবির দর্শক আগে দেখেনি এত কিছু। 'কাল তুমি আলেয়া'র ডঃ লাবণ্য সরকার, 'ছিন্নপত্র'র ভ্যাম্পিস চরিত্র, 'মন নিয়ে'তে দুই বোনের চরিত্রে সাইকোলোজিকাল রোল, বনপলাশিতে শ্রাবণধারার মতো রূপলাবণি যাঁর অঙ্গ থেকে পড়ে ঝরি। আবার 'চৌরঙ্গী'র করবী গুহর উঁচু করে বুফো খোঁপা, বড় করে চোখ আঁকা। মঙ্গল চক্রবর্তীর 'তিন অধ্যায়'-এ ময়ূরের পালক লাগিয়ে সুপ্রিয়ার ক্যাবারে নাচ অনুকরণ করেন বম্বের মুমতাজ থেকে হালের দীপিকা পাড়ুকোন।

বারবার ট্র্যাডিশন ব্রেক করেছেন সুপ্রিয়া দেবী। ড্রেস ক্যারি করায় আজও তিনি প্রথমা। বাঙালিকে আধুনিক কালচার শিখিয়েছেন সুপ্রিয়াই।
উত্তম কুমারের দ্বিতীয় নারী, উত্তমের সংসার ভেঙেছে ইত্যাদি সব দোষের কলঙ্কভাগী সুপ্রিয়াকে করেছে সমাজ। কিন্তু একটা সময়ের পর সমাজের শত আঘাত আর গায়ে লাগত না বার্মা থেকে কলকাতা হেঁটে আসা লড়াকু মেয়ে বেণুর। একা সিঙ্গেল মাদার সুপ্রিয়া নিজের সাহসে সারা জীবন পথ চলেছেন। একটা সময় সমাজ তাঁকে ভয় পেত। সুপ্রিয়ার উগ্র সাজ যেন সেই সমাজের প্রতি এক একটা চাবুক।

সুচিত্রা সেন ষাট বছরের অনেক আগেই রুপোলি পর্দা থেকে সরে যান অন্তরাল জীবনে। কতকটা রূপে জরা থাবা বসানোর ভয়েই। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায় আশির দশকের আগে থেকেই নেমে পড়েছেন মা মাসিমার ভূমিকায়।
অথচ সুপ্রিয়া দেবী প্রবীণত্বের শুরুতেই ভাঙলেন মিথ।
তখন নব্বই দশক। বাংলা ছবির ট্রেন্ড অনেকটাই বদলে গেছে। এসেছে নতুন নায়ক নায়িকারা। সেই সময় সুপ্রিয়া দেবীর বয়স ষাট। সেই ষাট বছরের সুপ্রিয়া যেন যৌবন তরঙ্গে আরো একবার জ্বলে উঠলেন। সব পুরুষরা বহ্নিপতঙ্গের মতো ছুটে এল সুপ্রিয়ার লাস্যের স্বাদ নিতে। নগ্নিকা সুপ্রিয়া দুধসাদা ফ্যানা ওঠা বাথ টাবে নামলেন, দুটি নগ্ন পায়ে শিহরন, স্তন বিভাজিকার উপর 'ফেমিনা' ম্যাগাজিন রেখে পড়ছেন আর একটু করে ওয়াইনে চুমুক দিচ্ছেন সুপ্রিয়া। সুপ্রিয়ার লাস্য দেখে মাথা ঘুরে গেল বাঙালি দর্শকদের। সে সময় সমস্ত সিনে পত্রিকার কভার স্টোরিতে একটাই ছবি, বাথটাবে শোয়া নিশিবাসরের রাতপরী সুপ্রিয়া দেবী।
কোথায় ঘটেছিল এমন ঘটনা?

১৯৯৩ এর ছায়াছবি 'রক্তের স্বাদ'। পরিচালক ধ্রুব দত্ত। খুব বেশি ছবি করেননি ইনি। পরের দিকে সহযোগী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু নাইন্টিজে যে ধরনের মেনস্ট্রিম ছবি হত সেখানে 'রক্তের স্বাদ' ছিল একদম রহস্য রোমাঞ্চ গল্প। কিছুটা ভৌতিকও বটে। ডাইনি ড্রাকুলা মিথ নিয়ে গল্প। কিন্তু আড়াল থেকে শেষে বেরোবে রক্ত বেচার চোরা ব্যবসার গল্প। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন দেবশ্রী রায়, প্রসেনজিৎ, দীপঙ্কর দে, শকুন্তলা বড়ুয়া। কিন্তু 'স্টার অ্যাট্রাকশান' সুপ্রিয়া দেবী।

সুপ্রিয়া একজন হসপিটালের উচ্চপদস্থ লেডি ডাক্তারের অভিনয় করেছিলেন। তখন সুপ্রিয়া দেবীর বয়স ষাট পেরিয়েছে, তবু তিনি কী ভীষণ লাস্যময়ী। কখনও স্লিভলেস ব্লাউজ কখনও বা সাহসী রাত্রিবাস সবেতেই বিপ্লব ঘটান সুপ্রিয়া। সুপ্রিয়ার স্বামীর ভূমিকায় অভিনয় করেন দিলীপ রায়। ছবিতে গ্ল্যামারে লাস্যে মাদকতায় ষাটের সুপ্রিয়া দশ গোল দিয়েছিলেন যৌবন সরসী দেবশ্রী রায়কেও।

'রক্তের স্বাদ' ছবি বেশ হিট করেছিল সেসময়। ভৌতিক ছায়ার গল্প দর্শকের কাছে অন্যরকম ছিল। তবে সবচেয়ে আলোচিত সমালোচিত হয়েছিল সুপ্রিয়ার সাহসী সাজপোশাক ও বাথটাব দৃশ্য।
ঐ বয়সে এমন সাহসী দৃশ্য কোনও অভিনেত্রী করেননি। সেসময় টলিউড বলিউডে স্নানদৃশ্যে প্রথমা ছিলেন সুচিত্রা সেন-কন্যা মুনমুন সেন। কিন্তু মুনমুনের স্নানদৃশ্য যেন কোমল মাখনের মতো আর সুপ্রিয়ার স্নানদৃশ্য ছিল পুরনো সুরার মতো মাদকতাময়।
মহানায়কের প্রয়াণের দশ বারো বছর পরও রূপ যৌবনে ভরপুর সুপ্রিয়া দেবী। শরীর জোড়া অপরিমেয় খাজুরাহো। সাহসী দৃশ্যে বিগতযৌবনা হয়েও আকর্ষণীয়া। দুধফ্যানা সাবান বাথটাবে নগ্নিকা ষাট ছোঁয়া সুপ্রিয়ার একহাতে ম্যাগাজিন, অন্য হাতে সুরাপাত্র। বাণপ্রস্থ আসেনা যে প্রেয়সীর।
পরিচালক ধ্রুব দত্ত এমন একটি সাহসী প্লট রাখলেন ছবিতে যে বাথটাবে সুপ্রিয়াই ছবি হিট করিয়ে দিলেন। সমাজে চিরকালই সুপ্রিয়ার ইমেজ নিন্দনীয় আর এমন দৃশ্যে অভিনয় করে তাতে যেন আগুনে ঘি পরল। এর আগেও আশির দশকে পাবলিক থিয়েটারে মঞ্চে সিগারেট খেয়ে সুপ্রিয়া দেবী বিতর্কের শিকার হন। চিত্রনাট্যের স্বার্থেই ঠোঁটে সিগারেট নেন ঋত্বিক ঘটকের নীতা।

'রক্তের স্বাদ' ছবির চিত্রনাট্যেও সুপ্রিয়ার সাহসী সাজপোশাক নিয়ে কূটকচাল করতেন অনামিকা সাহা, শকুন্তলা বড়ুয়া অভিনীত চরিত্রগুলি। 'পুরুষখেকো মহিলা' তকমাও জুটেছিল সুপ্রিয়ার। কিন্তু ষাট বছরে অমন স্নানদৃশ্য কোনও হলিউড অভিনেত্রী করতে পেরেছিলেন কিনা সন্দেহ। স্নাত সুপ্রিয়া সন্ধেবেলা আয়াশ করে বাথটাবে শুয়ে অবসর উপভোগ করছেন। ঠিক সেইসময় বাথরুমের ছাদ থেকে চুঁইয়ে তাঁর নগ্ন পায়ে পড়ছে রক্ত। আতঙ্কে বাথটাব ছেড়ে উঠে পড়ছেন সুপ্রিয়া। রক্ত কোথা থেকে এল? কোন প্রতিশোধের রক্ত? এই রক্ত ঘিরেই 'রক্তের স্বাদ' ছবির গল্প। তিরিশ বছর আগের ছবিটা একবার দেখে নিতেই পারেন এ যুগে নিরাশ হবেননা।
সেসময় সুপ্রিয়ার বাথটাবে শোয়া লুক থেকে মাথায় ভিজে তোয়ালে জড়ানো লুক এতই আকর্ষণীয় ছিল যে তৎকালীন বিখ্যাত ফটোগ্রাফাররা সুপ্রিয়া দেবীর শ্যুটিং স্টিলও তুলেছিলেন, যা বাজারে আসতেই মেগা হিট।
আবার এই সুপ্রিয়া দেবীই দজবছর পর 'জননী'র অনুপমা দেবী হয়ে পরলেন ঘিয়ে গরদ। সেই প্রথম মেগা সিরিয়ালের ইতিহাস শুরু। সিরিয়ালেও প্রথম 'স্টার অ্যাট্রাকশান' ছিলেন সুপ্রিয়া দেবী। সুপ্রিয়া যখন 'জননী' রূপে প্রথম মেগা সিরিয়াল করলেন তখন কে বলবে তিনি এত সব বোল্ড চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কিন্তু 'জননী'র অনুপমা দেবী সুপ্রিয়া ছিল অসম্ভব ব্যক্তিত্বপূর্ণ। শাশুড়ি থেকে ঠাকুমার রোলে টেলিভিশনে সুপ্রিয়ার মতো এমন স্টার ইমেজ কেউ ক্যারি করতে পারেনি। 'জননী' সুপ্রিয়ার ঘিয়ে গরদের দাপট অনেক বেশি সাহসী ছিল যাতে উড়ে গেছিল সন্ধ্যারাণী, মলিনা দেবী আইকনিক মায়েদের সাদা থানে বিধবার দুঃখবিলাস।

সুপ্রিয়া কোনদিনও স্কুলে যাননি। কিন্তু সাহেবিকেতা থেকে বাথটাবে স্নাত হওয়া কিংবা তোয়ালে জড়িয়ে জল থেকে উঠে আসা কি ভালো জানতেন। আমরা কি কোনারক খাজুরাহো-মন্দিরের নারীমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করি কোন বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুমি পাঠ নিয়েছ? আমরা তো তাঁকেই পাঠ করি শরীর মন দৃষ্টি দিয়ে। সুপ্রিয়া যেন রতির মধুকোষ। অথচ কি নিপাট ঘরোয়া। কি অমলিন হাসি। সুচিত্রা সেনও ষাটে এসে এই যৌন আবেদন রাখতে পারেননি।
সুপ্রিয়া দেবীর থেকে মুক্তি নেই আমাদের।