
শেষ আপডেট: 3 January 2023 12:04
'যে পথে যেতে হবে, সে পথে তুমি একা--
নয়নে আঁধার রবে, ধেয়ানে আলোকরেখা…'
প্রয়াত লেজেন্ডারি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুমিত্রা সেন (Sumitra Sen)। তাঁর গাওয়া গানে লিপ দিয়েছিলেন আর এক লেজেন্ডারি নায়িকা মাধবী মুখোপাধ্যায় (Madhabi Mukherjee)। 'দ্য ওয়াল' এর থেকেই আজ সকালে প্রথম সুমিত্রা বিদায়ের খবর জানলেন চারুলতা। তার পরেই ডুবে গেলেন স্মৃতিচারণে। সাক্ষাৎকারে শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
সুমিত্রা সেনের রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে আপনার মতামত?
আমার ওঁর গান খুবই ভাল লাগত। সুমিত্রা সেনের কণ্ঠে খুব মিষ্টতা ছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়কীতে গাম্ভীর্য থাকত অন্য শিল্পীদের। কিন্তু ওঁর গানেই প্রথম মিষ্টত্ব পেলাম। তাই আমি ওঁনার গান খুব ভালবাসতাম। চলে যাবার খবরটা শুনে খুব খারাপ লাগছে। ফাংশনে সুমিত্রা সেন ও মেয়েদের সঙ্গে দেখা হত।
আপনার বহু সেরা ছবিতেই তো আপনার লিপে সুমিত্রা সেন রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছেন?
হ্যাঁ। অনেক ছবিতেই উনি আমার লিপে গেয়েছেন। পূর্ণেন্দু বাবুর (পত্রী)র 'স্ত্রীর পত্র' ছবিতে সুমিত্রা সেন গেয়েছিলেন 'আমার কী বেদনা সে কি জানো ওগো'।

আপনার লিপে সুমিত্রা সেনের গান 'ভরা থাক স্মৃতিসুধায়', গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। কীভাবে করেছিলেন ওই অভিনয়?
অভিনয় তো করিনি। ফিল করেছিলাম চরিত্রটা। 'দিবা রাত্রির কাব্য' সিনেমায় সুপ্রিয়া চরিত্রটাতে ঢুকে গেছিলাম। ছ'বছর বয়স থেকে অভিনয় করছি, চোখে জল ধরে অভিনয় কীভাবে করতে হয়, সেটা আত্মস্থ হয়ে গেছে। আমি যত অভিনয় করেছি, তার মধ্যে সবথেকে সাহসী চরিত্র 'দিবা রাত্রির কাব্য'র সুপ্রিয়া চরিত্র। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কাহিনি নিয়ে ছবি করবেন বলে পরিচালক বিমল ভৌমিক আর নারায়ণ চক্রবর্তী যখন আমার কাছে এসেছিলেন, তখন বলেছিলাম, কেন এই কঠিন কাহিনি নিয়ে ছবি করছেন! চলবে কী! সেই সাহস কিন্তু পরিচালক দেখিয়েছিলেন।
ছবিতে 'ভরা থাক্ স্মৃতিসুধায় বিদায়ের পাত্রখানি' গানটা নায়িকার মনের কথাটা গানের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিচ্ছে। এক নারী যে বিয়েতে সুখী নয়, কিন্তু তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক দেখা হওয়ারর পরেও তাঁকে সেই জায়গা থেকে উদ্ধার করছে না। এই টানাপড়েন যেন সুমিত্রার গলায় ফুটে উঠেছিল।
পাতকুয়োর ধারে বসে আপনি এই গান গাইছেন আর কুয়োর ভিতর দিয়ে সেই গান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কী দুরন্ত ভাবনা!
আসলে বিমল ভৌমিক পরিচালক হিসেবে অনেক আধুনিক ছিলেন। পুরো ভাবনাটাই ওঁর। উনি কথাও বলতেন খুব মজার এবং শিক্ষামূলক। এই ছবির আউটডোর রাঁচি আর পুরীতে হয়েছিল। রাঁচিতে পরিচালকের সঙ্গে আমি আর বসন্ত বাবু যাই। একটা ঘরে বসন্ত চৌধুরী আছেন, আরেকটায় আমি। মাঝের ঘরে বিমল বাবু। বিমল বাবু আর বসন্ত বাবু গল্প করছেন, সে গল্প আর থামছে না।

হঠাৎ একজন এসে বললেন, 'আমার থাকার ব্যবস্থাটা কোথায়, আমি কোথায় শোব?' বিমল বাবু বললেন, 'আমি তো জানি না সেটা!' বিমল বাবুকে আমি তখন বললাম, 'এবার কী হবে?' বিমল বাবু বললেন, 'ঘটনা তার নিজের গতিতেই চলবে!' ওঁর এই সংলাপটা আমার এখনও মনে আছে। উনি এইরকম রসিক মানুষ ছিলেন।
এই বিমল ভৌমিক আর নারায়ণ চক্রবর্তীর 'দিবা রাত্রির কাব্য' তো রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও পেয়েছিল। কিন্তু এই পরিচালক জুটির ছবি আর হল না কেন?
বিমল বাবু আর নারায়ণ বাবু সম্পর্কে শালা-ভগ্নীপতি ছিলেন। ওঁদের আইডিয়াগুলো ভাল ছিল। কিন্তু ওঁদের মধ্যে মতবিরোধ হওয়ায় আর ছবি হল না। নারায়ণ চক্রবর্তীর কয়েকটি ছবি আছে পরে, তবে চলেনি। বিমল ভৌমিক আর ছবি করলেন না।

'দিবা রাত্রির কাব্য' করেই তো আপনি উর্বশী পুরস্কার পান প্রথম বাঙালি অভিনেত্রী হিসেবে?
হ্যাঁ। এই খবরটা আমাকে প্রথম দিয়েছিলেন কানন দেবী। জাতীয় পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কারকে তখন উর্বশী পুরস্কার বলা হত। কেমন লেগেছিল বলতে গেলে, এই বোধগুলো আমার একটু কম। আমায় প্রথম যিনি এই খবরটা দেন, তিনি কানন দেবী। কাননদি আমাকে বললেন, 'মাধু তুই ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিস।' তখন কথাটা আমি বিশ্বাস করতে পারলাম না। ভাবলাম, কাননদি আমাকে ভালবাসেন তাই বলেছেন।

তারপর যখন একাধিক লোক বলতে আরম্ভ করল, তখন বুঝলাম হ্যাঁ আমি পেয়েছি। তখন আমার কোলে প্রথম সন্তান। তার তিন মাস বয়স। তাই পুরস্কারের প্রতি যে উন্মাদনা, তার থেকেও অনেক বেশি ছিল আমার বাচ্চার প্রতি উৎকণ্ঠা। এই জন্য আমি পুরস্কার পাওয়ার সময়টা ঠিক উপভোগ করতে পারিনি। আমি উর্বশী পুরস্কার পেলাম আর উৎপল দত্ত পেলেন ভরত পুরস্কার। আমার একসঙ্গেই রাষ্ট্রপতি করুণানিধির হাত থেকে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলাম।
তবে 'দিবা রাত্রির কাব্য' ছবিটা সেভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি পরে। বহুদিন পরে আমেরিকায় বিশ্ব বঙ্গ সম্মেলনে এই সিনেমা উদ্বোধনী ছবি হিসেবে দেখানো হয়েছিল। আমাকে অতিথি করে আমেরিকায় নিয়ে গেছিল।

সুমিত্রা সেন গান রাখতে সংসার ছাড়েননি। তাঁর দুই মেয়েই আজ সুযোগ্য ও প্রতিষ্ঠিত। একজন নারী হিসেবে কী বলবেন?
হ্যাঁ, সে তো বটেই। দু'দিকটাকেই উনি সুন্দর ভাবে সামলেছিলেন। সুমিত্রা সেন গানের সঙ্গেই মেয়েদের মানুষ করেছেন। ভাল লাগে। তবে সুমিত্রা সেন গান আর সংসার সর্বদিক বজায় রেখে চলেছিলেন বলেই হয়তো ওঁর মতো শিল্পীর যতটা পাওয়া উচিত ছিল, ততটা উনি পাননি। যতখানি এগনোর কথা, উনি ততখানি এগোতে পারেননি। ওঁর গানের মধ্যে মিষ্টত্বটাই আমার ভাল লাগত। ঠিক তেমনই মিষ্টি ছিল ওঁর ব্যবহারও।