
শেষ আপডেট: 3 January 2023 14:46
সুমিত্রা সেনের (Sumitra Sen) স্বামীর কাছের বন্ধু ছিলেন গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। একসঙ্গেই কলেজে পড়তেন তাঁরা। শোনা যায়, একবার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে করে উত্তমকুমার (Uttam Kumar) শ্যুটিং করতে যাচ্ছিলেন আইটডোরে। উত্তমকুমারের হাতে ছিল ট্রানজিস্টর। তখন লাইভ সম্প্রচারিত হচ্ছিল সুমিত্রা সেনের কণ্ঠে, 'আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে।' মুগ্ধ হলেন উত্তমকুমার। গৌরীপ্রসন্নই তখন বলেন উত্তমকে, 'আমার বন্ধুর স্ত্রী সুমিত্রা গাইছেন!'
১৯৬০ সাল। সুমিত্রার কাছে এল একটা ফোন। হ্যালো বলতেই ফোনের ওপ্রান্ত থেকে একজন বললেন, 'অরুণ কুমার চ্যাটার্জী কথা বলছি।' সুমিত্রা প্রথমে বুঝতেই পারেননি কে ইনি। তাই আরেকবার মিষ্টি হাসি হেসে সুমিত্রাকে বললেন, 'দিদিভাই, আমি তো তোমাদের উত্তমকুমার গো!'
প্রথম প্লে ব্যাক অফার এভাবেই এল সুমিত্রা সেনের কাছে। উত্তমকুমার সে ছবির নায়ক। 'শুনো বরনারী' ছবিতে সুপ্রিয়া দেবীর লিপে সুমিত্রা গাইলেন 'ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে'। এভাবেই চলচ্চিত্র প্লেব্যাকে তাঁর পথ চলা শুরু।
সুমিত্রা সেন একমাত্র ব্যতিক্রমী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, যিনি সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন-- সমস্ত তাবড় অভিনেত্রীর লিপে প্লে ব্যাক করেছেন। সমস্ত প্লে ব্যাকে সিচুয়েশন অনুযায়ী রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া বেশ কঠিন ছিল। প্রতিটি নায়িকার লিপে সুমিত্রার মিষ্টি কণ্ঠ ছিল শ্রোতাদের কানের আরাম।
এর পরে উত্তমকুমার প্রোডিউস করলেন 'গৃহদাহ' ছবি। অচলার ভূমিকায় সুচিত্রা সেনের লিপে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবে কে? উত্তমকুমারের মাথায় এল সে দিদিভাইয়ের নাম। সুমিত্রার থেকে কিন্তু বয়সে অনেক বড় ছিলেন উত্তমকুমার। কিন্তু সম্মান দিয়ে সুমিত্রা সেনকে দিদিভাই বলেই ডাকতেন তিনি।

জন্ডিস থেকে সেরে উঠে সুচিত্রা সেন ফিল্মে কামব্যাক করেছেন। ভীষণ রোগা হয়ে গেছেন তখন। সুচিত্রার সেই স্লিম চেহারায় লাবণ্যর থেকেও ধারালো যৌনতা যেন অনেক বেশি। ব্রাহ্ম মহিলার বেশে অচলার ভূমিকায় এক নতুন সুচিত্রা হাজির হলেন। উত্তমের কথাতেই সুচিত্রা সম্মতি দিলেন, তাঁর লিপে সুমিত্রা সেনকে গাইতে। সুচিত্রা সেন নিজেও পছন্দ করতেন সুমিত্রা সেনের কণ্ঠ।

'এ দিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার? আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হল কার?' সুচিত্রা সেনের বুকে মাথা গুঁজে উত্তমকুমার। রবীন্দ্রসঙ্গীতে এমন রোম্যান্সের মাখামাখি আর অচলা সুচিত্রা সেনের উগ্র সাজ রবীন্দ্রবোদ্ধাদের চোখে লেগেছিল। কিন্তু দর্শক উন্মাদনায় অচলা-মহিমের এই গান সবার মনে জায়গা করে নিল। সুচিত্রা সেনের লিপে প্রথম গাইলেন সুমিত্রা সেন, যা চূড়ান্ত হিট হল।
এই ছবিতেই সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের লিপে সুমিত্রা সেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাইরে গিয়ে গেয়েছিলেন একখানি ব্রত গান, প্রণব রায়ের কথা আর রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গীত পরিচালনায়। মৃণাল সাবিত্রীর লিপে সুমিত্রা গাইলেন, 'তুলসী তুলসী নারায়ণ, তুমি তুলসী বৃন্দাবন।' এই গানটি যে তথাকথিত এক রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর গাওয়া, তা অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেন না।
১৯৭১ সালেও সুচিত্রার সঙ্গে আবার সুমিত্রা। তবে এবার আর লিপে নয়। 'নবরাগ' ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সুমিত্রাকে গাওয়ালেন কণিকা মজুমদারের লিপে, 'তুই ফেলে এসেছিস কারে।' তবে গান জুড়ে আছেন তিনিই, সুচিত্রা সেন। জমকালো সাজে সুচিত্রার গ্ল্যামারাস উপস্থিতি এবং মর্মস্পর্শী অভিব্যক্তি, সঙ্গে মহানায়কও। পার্টি দৃশ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীত। গ্রামের মেয়ে নারায়ণী শহরের বিত্তশালী লোকের স্ত্রী হয়ে আজ তাঁর নাম রিনা। সেই রিনাই গানে গানে ভাবছে তাঁর ফেলে আসা গ্রামের জীবনের কথা। 'যে পথ দিয়ে চলে এলি সে পথ এখন ভুলে গেলি -
কেমন করে ফিরবি তাহার দ্বারে মন, মন রে আমার।'
এর পরে 'আলো আমার আলো' ছবিতে অতসী রূপে সুচিত্রা সেনের লিপে সুমিত্রা সেন গাইলেন, 'বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়।' এই সন্ধ্যারতির গান তো প্রতিটি বাঙালির মনের জোর বাড়ায় আজও।
উত্তমকুমারের সঙ্গে সুমিত্রা সেনের শেষ দিন অবধি সুন্দর সম্পর্ক ছিল। সে সময়ে যে নায়ককে দেখলে প্রায় সব মহিলাই অস্থির হয়ে উঠতেন, তাঁর সঙ্গে সুমিত্রা সেন সবসময়ই একটি সম্ভ্রমের সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তাই ওঁদের সম্পর্কটা এত সুন্দর থেকে যায়।
সুমিত্রা সেন তাঁর মেয়ে ইন্দ্রাণী সেনের বিয়েতে উত্তমকুমারকে নিমন্ত্রণও করেছিলেন। সবাই ভেবেছিলেন, উত্তমকুমার অত বড় মানুষ! তাই কখনও আসেন নাকি?

সবাইকে অবাক করে, ঘর আলো করে, লাল শাল গায়ে দিয়ে, ধুতি-পাঞ্জাবি পরে উপস্থিত হন উত্তমকুমার। দিদিভাইয়ের মেয়ে ইন্দ্রাণীকে উত্তমকুমার দিয়েছিলেন সুন্দর একটা বেনারসি, যা সেন পরিবারের ইতিহাসে বড় ঘটনা। সেই বেনারসি আজও তাঁরা মাথায় করে রেখেছেন।

সুমিত্রা সেন এক বিখ্যাত শিল্পী হয়েও খুব সহজ মানুষ ছিলেন। মধ্যবিত্ত সারল্য ওঁর থেকে হারিয়ে যায়নি কখনও। ইন্দ্রাণী বিয়ের পরে কোথাও নেমতন্ন বাড়ি গেলেই সুমিত্রা সেন বলতেন, উত্তমকুমারের দেওয়া সেই শাড়িটা পরে যেতে। সুমিত্রা সবাইকে বলতেনও, মেয়ের এই শাড়ি উত্তমকুমারের উপহার। যেন আমাদের গেরস্ত বাড়ির মা তিনি! অথচ তিনিই একমাত্র সেই শিল্পী, যাঁর কণ্ঠের গান সব নায়িকার লিপেই হিট।
সুমিত্রা গাইছেন ‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’, পর্দায় বিষণ্ণ মাধবী, স্মৃতিসুধা উপুড় করলেন চারুলতা