
সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ও শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 6 May 2024 19:40
ছেলেরা ছেলেদের মতো হবে এটা আমাদের বদ্ধমূল ধারণা। কিন্তু কেউ যদি একটু অন্যখাতে জীবন বইয়ে দিতে চায় তাহলেই সে চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। তেমনই একটি নাম সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
যখন সমবয়সী ছেলেরা মাঠে ছুটত ব্যাট হাতে ক্রিকেট খেলতে, তখন সুজয়ের আনন্দ-আসর ছিল প্রমিত সেনের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখা। বই আর মাকে ঘিরে ছিল সুজয়ের জগত। মা-কেন্দ্রিক জীবন, বাইরের লোকে 'বদ্ধ কুয়ো' বললেও তাতেই হয়ে গেছে সুজয়ের অগাধ পাঠ। ম্যানেজমেন্ট পাশ করেও সুজয়প্রসাদ বেছে নিয়েছেন সংস্কৃতির অঙ্গন। অন্য পথে হেঁটে আজ তিনি সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। এই যে জীবনের পথচলাটাকেই কথায় কথায় সুরেসুরে বুনলেন সুজয়প্রসাদ তাঁর প্রথম নিবেদন 'জার্নিস'-এ। তাঁর সঙ্গে সঙ্গতে শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। হইচই প্ল্যাটফর্মে "ডাকঘর"এ সঙ্গীতায়োজনের সুবাদে শিবাশিস এই মুহূর্তে জনপ্রিয় নাম । সুজয়-শিবাশিস একসঙ্গে কবিতা-গান-আবহের ডালি সাজালেন বৈশাখের সন্ধ্যায়। শিশির মঞ্চে ৪ঠা মে শনিবার ছিল এই অনুষ্ঠান।
'জার্নিস'সুজয়প্রসাদের প্রথম নিবেদন। অনুষ্ঠানের সূত্রধর শর্মিষ্ঠা গোস্বামী চট্টোপাধ্যায় শুরুতেই সুজয়ের জীবনের লেখচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করলেন। সুজয়ের জীবনে চলার পথে এক একটি স্টেশনে এক একজন নেমে গেছেন, আবার নতুন জন এসেছেন জীবনে। এভাবেই বহমান জীবন। সত্যি শর্মিষ্ঠার সঞ্চালনা আমাদের শেখার ক্লাসরুম। সুজয়প্রসাদ বলেন তিনি আবৃত্তি করেন না, পাঠ করেন। কারণ তিনি দেখে পড়েন। তাতে বরং আরো আত্মিক হয় তাঁর নিবেদন। দর্শকদের কাছে পৌঁছতে পারেন ঘরোয়া আড্ডার ছলে।
'জার্নিস' বাচিক অভিযাত্রার শুরু করলেন সুজয়প্রসাদ রাকা দাশগুপ্তর 'হে নূতন' কবিতা দিয়ে। যাতে রবীন্দ্রনাথের সমস্ত চরিত্রগুলি একসঙ্গে হাজির হল মঞ্চে। কবিতার শেষ হতেই সুজয় ধরলেন 'হে নূতন দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ'।
পরবর্তী নিবেদনে সুজয় কবিতায় শ্রদ্ধা জানালেন সত্যজিৎ রায়কে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা। আর ঠিক তারপর শিবাশিস মিউজিকের সঙ্গে তাঁর নরম কন্ঠে ধরলেন 'এক যে ছিল রাজা, তার ভারি দুখ্ '। এতদিনের চেনা অনুপ ঘোষালের দরাজ কন্ঠের গান অদ্ভুত ভাবেই শিবাশিসের কোমল কন্ঠের নিবেদনে মায়াময় আবেশ রেখে গেল এই দাবদাহের বাতাবরণে। সুজয়ের ডিজাইনার সাদা পোশাক আর শিবাশিসের লাল পাঞ্জাবি মিলেমিশে দর্শককে আরও বেশি আকৃষ্ট করেছে। দুজনের নিবেদন সেদিন যেন শিশির ধোয়া হাস্নুহানা ফুটিয়েছে মঞ্চে।
এরপর সুজয় হাঁটলেন আমেরিকান কবি ম্যারি ওলিভারের 'The Journey' কবিতার হাত ধরে। এই কবিতা যেন সমগ্র অনুষ্ঠানের সার সত্য। তবে এই সন্ধ্যার শ্রেষ্ঠ নিবেদন ছিল 'ওথেলো'। উৎপল দত্তর কন্ঠের 'ওথেলো'শোনার পর অনেক শিল্পীই 'ওথেলো' পাঠ করতেই ইতস্তত বোধ করেন । উত্তম-সুচিত্রার 'সপ্তপদী' র সেই আইকনিক দৃশ্যটি যেন আত্মস্থ করেছেন সুজয়। শুধু তাই নয়, ওথেলো-ডেসডেমোনার যৌথ সংলাপ একাই পাঠ করলেন তিনি।যেন উৎপল দত্ত-জেনিফার কাপুরের আশীর্বাদ বর্ষিত হল সুজয়ের এই নিবেদনে । সুজয়ের কন্ঠে ওথেলো শুনে গায়ে কাঁটা দিল মন্ত্রমুগ্ধ দর্শকদের। ওথেলোর নৃশংসতা থেকে ডেসডেমোনার প্রেমের আকুতি মিলেমিশে গেল সুজয়ের কণ্ঠের জাদুতে। অমৃতা প্রীতমের পাঠটিও চমৎকার। শিশির মঞ্চ ভেসে গেল করতালিতে।
একেএকে নবনীতা দেবসেনের 'দীপান্তরী', দেবারতি মিত্রের 'লাইফ ম্যাগাজিনের সামনে দেবাশিস', সুবোধ সরকারের 'কাকে বলে লং জার্নি', দিব্যেন্দু পালিতের 'আজ আবার আমরা বেরিয়েছি একসঙ্গে', সুজয় দাসের 'ফাল্গুনের প্রথম দিন'- প্রতিটি কবিতা প্রাণ পেল সুজয়ের কন্ঠে। প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা কেউ আর পড়েন না। তাঁকেও 'এক আকাশ অন্ধকার' পাঠে সম্মান দিলেন সুজয়। সঙ্গে অবশ্যই শিবাশিসের যোগ্য সুর মন্তাজ।
শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্ঠে ও অ্যারেঞ্জমেন্টে আমরা পেলাম একই সঙ্গে বব ডিলান ও রবীন্দ্রনাথের সুরমুচ্ছর্না। সুজয়প্রসাদের প্রতিটি নিবেদন যেন তাঁর জীবনের এক একটি জার্নির কথা বলে। তেমনই সুজয়ের জীবনে এসেছেন বহু মানুষ, কেউ পথপ্রদর্শক হয়ে, কেউ বা বন্ধু হয়ে, কেউ বা সহযোদ্ধা হয়ে। সুজয়প্রসাদের অনুষ্ঠান দর্শকাসনে বসে দেখলেন নাট্যকার বিভাস চক্রবর্তী। ২০০৫ সাল যখন থেকে হাঁটি হাঁটি পায়ে একক বাচিকশিল্পে সুজয়ের পথ চলা শুরু। তখন থেকেই বিভাসদার আশীর্বাদ পেয়েছেন সুজয়। বিভাস চক্রবর্তীকে সুজয় উৎসর্গ করলেন কবিতা সিংহের কবিতা 'আন্তিগোনে'। যে কবিতা অকাল প্রয়াত নাট্যদেবী কেয়া চক্রবর্তীকে নিয়ে লিখেছিলেন কবিতা সিংহ। বিভাস চক্রবর্তী সুজয়ের পাঠ শুনে মুগ্ধ হয়ে ফিরে গেলেন কেয়ার সঙ্গে অভিনয়ের দিনগুলিতে।
'জার্নিস' অনুষ্ঠানে এ যুগের জনপ্রিয় নায়িকা সোলাঙ্কি রায়ের উপস্থিতি ছিল গ্রীষ্মের দাবদাহে স্নিগ্ধ বেলফুলের মতো। সোলাঙ্কি ভাল অভিনয় করেও ফিল্মফেয়ার ইস্ট পুরস্কার থেকে যোগ্য সম্মান পাননি। সেটা মনে করিয়ে দিয়ে সুজয় পড়লেন 'হলে হবে'। পুরস্কারই শিল্পীর শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের মাপকাঠি নয় বুঝিয়ে দিলেন সুজয়।
সুজয়ের ইংরেজি কবিতার উচ্চারণ অত্যন্ত পরিশীলিত। আবার একটি পাঞ্জাবি কবিতা পাঠের তিনি কী স্বছন্দ কী তাঁর আবেদন। দর্শকরা দুলে ওঠেন সুজয়ের কন্ঠে'কভি কভি মেরে দিল মে' গানে। আর বলতেই হয় উগ্র মিউজিকের যুগে শিবাশিসের পেলব মিউজিক যেন এক নীরব বিপ্লব।
মে মাসে যখন অনুষ্ঠান তখন ৩০ শে মে তো আসবেই। সত্যজিৎ রায় দিয়ে শুরু হয়ে শেষের লগ্নে এলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা '৩০শে মে' কবিতাটি পাঠ করলেন সুজয়, বললেন, ' অনেকেই সুজয়প্রসাদকে ঋতুপর্ণর উত্তরসূরি ভাবেন। দুটো মানুষ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, ঋতুদার উত্তরসূরি আমি কীভাবে হতে পারি?'
বললেন বটে সুজয়। তবু এই 'জার্নিস' অনুষ্ঠান দেখলে সাধারণ দর্শকও নিজেদের উন্নত করতে পারবে। তাঁর প্রতিটি কাজে এই শিক্ষাই দিয়ে গেছিলেন ঋতুপর্ণ। সেই ধারাটি বহমান রেখেছেন সুজয়।
সুজয় শেষ নিবেদনে পড়লেন বুক ভরা হাহাকার নিয়ে 'রাজকুমারের চিঠি'। তবে সুজয়-শিবাশিসের যৌথ প্রয়াস 'জার্নিস' বিষাদে নয় শেষ হল অদ্ভুত একটা আবেগ উচ্ছ্বাসে। দর্শকরা তাঁদের সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে 'গাইলেন পুরানো সেই দিনের কথা'। তখন শিশির মঞ্চে যেন এক অদ্ভুত মাহেন্দ্রক্ষণ। এমনকী শিশির মঞ্চ কর্তৃপক্ষ স্বীকার করলেন এমন অভিনব অনুষ্ঠান এই মঞ্চে এই প্রথম। মঞ্চসজ্জা ছাড়া এই জার্নি পূর্ণতা পেত না। অনবদ্য মঞ্চসজ্জায় ত্রিগুণা শংকর ও অরুণ মণ্ডল। শব্দ প্রক্ষেপন ও আলোকসম্পাত ছিল চমৎকার। সুজয়ের পাঠ শুনে মঞ্চে উঠে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন জয়ন্ত কৃপালিনি ও তাঁর স্ত্রী গুলান। দর্শকাসনে উচ্ছ্বসিত সুবোধ সরকার, ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়, ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়,প্রবুদ্ধ রাহা,নীপবীথি ঘোষ, সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রণতি ঠাকুর, নৃত্যাঙ্গনা পারমিতা সাহা সহ সুজয়ের কাছের বন্ধুরা।
মঞ্চে রাখা ছিল সুজয়প্রসাদের মা একসময়ের অভিনেত্রী সুচেতা চট্টোপাধ্যায়ের বড় ছবি। সুজয়ের কথা ধরেই বলি, ছেলে ম্যানেজমেন্ট পাশ করে কর্পোরেটে চাকরি না করলেও যেভাবে দু'ঘন্টার অনুষ্ঠানে কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকল, তাতে মা ছবি থেকেই প্রসন্ন হাসি ছড়িয়ে দিলেন মঞ্চে।
সুজয়-শিবাশিসের 'জার্নিস' এর দ্বিতীয় নিবেদন দিল্লির ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে। শুভেচ্ছা দুই বন্ধুকে। কলকাতাতেও আবার 'জার্নিস' -এর দ্বৈত উপস্থাপনা হোক-দর্শক অপেক্ষায় থাকবেন।