
সুচিত্রা সেন
শেষ আপডেট: 6 April 2025 18:00
অজয় কর আর সুচিত্রা সেন নামটা একে অপরের পরিপূরক। মিসেস সেনের সেরা ছবি গুলি তাঁরই পরিচালনায় বেশিরভাগ। 'হারানো সুর','সপ্তপদী','সাত পাকে বাঁধা' র পর অজয় করের সঙ্গে সুচিত্রার শেষ ছবি ছিল 'দত্তা'। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিজয়ার চরিত্রে মিসেস সেনের দাপটে 'দত্তা' ব্লকবাস্টার হিট হয়। যদিও সুচিত্রার প্রান্তবেলার ছবি, বিজয়া'র চরিত্র অনুযায়ী সুচিত্রার বয়স তখন অনেক বেশি তবু সুচিত্রার শেষ বাণিজ্যসফল ছিল 'দত্তা'।
'দত্তা' প্রথম মঞ্চে বহুবার সফল নাটক হয়েছিল। এরপর সুনন্দা দেবীর 'দত্তা' হিট ছবি ছিল। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায় অজয় করের 'দত্তা'। অভিনয়ে, বিজয়ার ভূমিকায় সুচিত্রা সেন, নরেন- সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বিলাস- শমিত ভঞ্জ আর রাসবিহারীর চরিত্রে উৎপল দত্ত। 'সাত পাকে বাঁধা'র বহু বছর পর সৌমিত্র কাজ করেছিলেন সুচিত্রার সাথে। 'দত্তা' র শ্যুটিংয়ে দারুণ মজার ঘটনা ঘটেছিল। এ গল্প শুনেছিলাম বর্ষীয়ান সাংবাদিক সুমন গুপ্তর মুখ থেকে। মহিষাদল রাজবাড়িতে 'দত্তা'র শ্যুটিং হয়েছিল। গাড়িতে একসঙ্গে যেতেন সৌমিত্র,উৎপল আর শমিত। অন্য গাড়িতে একা যেতেন সুচিত্রা।
সকালবেলা একদিন ব্রেকফাস্ট করতে দেওয়া হয়েছে মাখন-পাউরুটি, সেদ্ধ ডিম আর চা। যে যার মতো ডিম ছাড়িয়ে খাচ্ছিলেন। হঠাৎ উৎপল দত্ত শমিত ভঞ্জকে বললেন 'বুবু (শমিতের ডাক নাম) তোমার ডিম এত লাল কেন হে?' শমিতও দেখলেন তাই তো! সবার ডিম সাদা তার কেন এত লাল ডিম? উৎপল দত্ত বললেন 'আমার আর পুলুর ডিম দুটো তো সাদা ফ্যাটফ্যাটে তোমারটা নিশ্চয়ই দেশি মুরগির ডিম'। পুলু হল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ডাক নাম। শমিত তো খুব উত্তেজিত তাকে স্পেশাল ডিম খেতে দেওয়া হয়েছে। ডিমটা যেই ছাড়াতে যাবেন ডিমের গায়ে দেখলেন লেখা 'সুচিত্রা সেন'। শমিতের অবাক হবার পালা আরও বাড়ল। ডিমের ওপর কে লিখে রাখল 'সুচিত্রা সেন'?
হঠাৎ 'দত্তা'র প্রোডাকশন ম্যানেজার হন্তদন্ত হয়ে এসে বললেন 'দাদা, এক মিনিট, এক মিনিট!' ডিমটা কী আপনি ছাড়িয়ে ফেলেছেন? ওটা ম্যাডামের ডিম আপনাকে ভুল করে দিয়ে দিয়েছে'। শমিত ভঞ্জ একটু বিরক্ত হয়ে বললেন 'ম্যাডামের জন্য বিশেষ ডিম নাকি?' আমাদের জন্য আলাদা ডিম?' প্রোডাকশন ম্যানেজার তখন সবিস্তারে শমিত ভঞ্জকে বললেন। সুচিত্রা সেন পোল্ট্রির ডিম খান না। তাই তাঁর জন্য দেশি ডিমের ব্যবস্থা। 'দত্তা' ছবির প্রযোজক ছিলেন বিমল দে। তিনি ছিলেন কাঠ বাঙাল। বাঙাল ভাষা ছাড়া কথা বলতেন না। বিমল বাবুই ডিমটার ওপর 'মিসেস সেন' কথাটা যত্ন করে লিখে রেখেছেন। প্রোডাকশন ম্যানেজারের কথা শুনে শমিত ভঞ্জ হতবাক। ডিমের ওপর কারও নাম লিখে রাখা হয় এ জিনিস তিনি আগে কখনও দেখেননি। সৌমিত্র একটু দূরে বসে ছিলেন। শমিত ভঞ্জ তাঁকে হাসতে হাসতে বললেন, "পুলুদা, ডিমের ওপর মিসেস সেন লেখা!"
একথা শুনে সৌমিত্রবাবু অবাক। —সে কী? শমিত বললেন, "মাইরি বলছি এই দেখো!" সেসময় শমিত ভঞ্জ তখন উঠতি নায়ক। তার সঙ্গে ক'দিনে মিসেস সেনের হৃদ্যতা বেড়েছিল।
সুচিত্রার কাছে মেক আপ রুমে গিয়ে শমিত বললেন
'—'তোমার ডিমে নাম লেখা থাকে রমাদি?'
—'ধ্যাৎ, এ হতেই পারে না। কী বলছিস তুই আমার ডিমে নাম লেখা?'
শমিত ভঞ্জ বললেন— 'হ্যাঁ রমাদি। একটা সেদ্ধ ডিম দিয়েছিল আমাকে। খোলা শুদ্ধু সেই ডিমের গায়ে লেখা রয়েছে মিসেস সেন।'
—'বলিস কী রে!' প্রায় আঁতকে উঠলেন মহানায়িকা!
প্রোডাকশন ম্যানেজার বিমল বাবুকে ডেকে পাঠালেন সুচিত্রা। বাঙাল ভাষায় বিমল দে বললেন, ' না ম্যাডাম আসল কথা হইল গিয়া, আপনি যে সে ডিম খান না! তো তাই দিশি ডিম জোগার কইরা তাতে আপনার নাম লিইখ্যা রাখসি। গন্ডগোল হইয়া যায় তো।' এবার সুচিত্রা সেন আর হাসি চাপতে পারলেন না। ফেটে পড়লেন অট্টহাসিতে। কে বলবে এই সেই কড়া ব্যক্তিত্বের সুচিত্রা সেন!
ডিম পর্ব মিটেছিল এভাবেই। সুচিত্রা যেমন শমিতকে আপন করে নিয়েছিলেন, পর্দায় ততটাই কঠিন রসায়ন ছিল বিলাস আর বিজয়ার মধ্যে। 'দত্তা' ছবিতে একটা দৃশ্য ছিল বিজয়া প্রচন্ড ধমকাচ্ছেন বিলাসকে। বিজয়া বিলাসকে বলছেন, আপনি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করেন কী ভাবে! আপনি আমার একজন মাইনে দেওয়া কর্মচারী! আর বাড়ির পরিচারকরা জানলার ফাঁক দিয়ে দেখছে। সুচিত্রার ঐ দাপটের সামনে বিলাস শমিত ভঞ্জ কিন্তু এতটুকু নার্ভাস হননি। বরং সমানে সমানে টক্কর দিয়েছিলেন সুচিত্রার সঙ্গে। এই ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যে 'ইন্দিরা' সিনেমা হলে দর্শকরা প্রতি শোতে সমবেত করতালি দিয়ে উঠত। এটাই সুচিত্রা জাদু। আজ সুচিত্রা সেনের ৯৫ তম জন্মদিনেও যে জাদু থেকে বাঙালি মুক্তি পায়নি।