
শেষ আপডেট: 18 March 2024 15:15
ভারতে আধুনিক নাট্যকার হিসেবে হাবিব তনভীর, বিজয় তেন্ডুলকর এবং গিরিশ কারনাডের পাশাপাশি বাংলায় বাদল সরকারের নামটি উচ্চারিত হয়। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে অন্যধারার থার্ড থিয়েটারের প্রবক্তা হিসেবে বাদল সরকার আজও স্মরণীয়। বাদল সরকারের 'যদি আর একবার' নাটকটি মঞ্চস্থ করল 'দশ ইয়ারি' নাট্যদল, পরিচালনায় শুচিতা রায়চৌধুরী। 'যদি আর একবার' নাটক নিয়ে তাঁদের প্রথম নিবেদন।
শুচিতা রায়চৌধুরী ঋতুপর্ণ ঘোষের 'চোখের বালি' ছায়াছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে সকলের কাছেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। লিলি চক্রবর্তীর অর্থাৎ রাজলক্ষ্মীর বিধবা জা অন্নপূর্ণার চরিত্রে অভিনয় করেন শুচিতা। ঐশ্বর্য রাই থেকে রাইমা সেনের সঙ্গে তাঁকে আমরা দেখতে পাই। ঋতুপর্ণর দোসর ছবিতেও দেখা মেলে শুচিতার। বিশেষত শুচিতার উচ্চারণ দর্শকদের আকর্ষণ করে বেশি।
তবে শুচিতার অভিনয়ে আসা অনেক আগেই। শুচিতার মা স্বর্ণযুগের বিখ্যাত অভিনেত্রী বিনতা রায়। সেজমাসি অভিনেত্রী সাধনা চট্টোপাধ্যায়, সেজ মেসোমশাই অভিনেতা শেখর চট্টোপাধ্যায়। নাটক আর অভিনয়ের পরিমণ্ডলেই শুচিতার বেড়ে ওঠা।
১৯৬৮ তে 'হীরের প্রজাপতি' ছবিতে প্রথম মুখ্য চরিত্রে শুচিতা রায়চৌধুরীর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো। এরপর মৃণাল সেনের 'কলকাতা ৭১' ও সত্যজিৎ রায়ের 'অশনি সংকেত' এ ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করেন শুচিতা। পাশাপাশি নাটকের অভিনয়ে তাঁর গুরু সোহাগ সেন। সোহাগ সেনের 'অনসম্বল' দলে চারটি নাটকের নায়িকা ছিলেন শুচিতা। 'শেষের কবিতা' শ্রুতিনাটকে লাবণ্য হয়েছেন অনেকবার।
ফিল্ম, মঞ্চ, শ্রুতিনাটক, সিরিয়াল সব মাধ্যমে অভিনয় করার পর এবার তিনি পরিচালনায়। যদিও নির্দেশনার কাজ 'দশ ইয়ারি' নাট্যদলের সঙ্গে শুচিতা করছেন বেশ কিছু বছর।
'দশ ইয়ারি' নাট্যদলের নাম থেকে তাঁদের পথ চলার কাহিনি একটু বলা প্রয়োজন। শুচিতা রায়চৌধুরী ও তাঁর বন্ধুরা মিলে তৈরি করেছেন 'দশ ইয়ারি' নাট্যদল। মূল দশজন মিলেই তৈরি হয়েছে নাট্যদলটি। যা বেশ অভিনব। তাঁদের প্রথম নাটক 'বাবা আসবেন'। ২০২০ সালের শুরুতে 'ভূতের স্বর্গযাত্রা' নাটকটি মঞ্চস্থ করেন তাঁরা। কিন্তু এরপরই এল করোনার দাপট। করোনায় বলি হন 'দশ ইয়ারি' র সঞ্জয় ঘোষ। যিনি ছিলেন প্রাণ এই দলের। সবাই শোকাহত। বেশ কয়েক বছর পর না থামার অঙ্গীকার নিয়ে শুচিতা রায়চৌধুরীর হাত ধরে 'দশ ইয়ারি' ফিরল বাদল সরকারের 'যদি আর একবার' নাটক নিয়ে। গত ৯ই মার্চ,২০২৪ শনিবার যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমিতে প্রথম মঞ্চস্থ হল নাটকটি।
বাদল সরকার রচিত অ্যাবসার্ডধর্মী নাটক ‘যদি আর একবার’ বহুরূপীর প্রযোজনায় অ্যাকাডেমিতে ১৯৬৭ সালের ২৭ফেব্রুয়ারি প্রথম অভিনীত হয়েছিল। 'যদি আর একবার' হল একটি কমেডি নাটক। কিন্তু তারমধ্যেই আছে জীবন দর্শনের গল্প।, যা এই নাটকটির ম্যাজিক। সংলাপও ছন্দে বাঁধা। নাটকটি দুই দম্পতি ও এক অবিবাহিতা মহিলার গল্প। বর্তমান জীবনের ক্লান্তি ও অবসাদ এই নাটকে চিত্রিত হয়েছে। যে বিবাহিতা মহিলা সংসার করছে সে চায় মুক্তি, সে চায় আর্থিক স্বাধীনতা। আর যে অবিবাহিতা মহিলা চাকুরিরতা সে চায় সংসারের বন্ধন, স্বামীর সোহাগ। এমনই এক জীবনে থেকে অন্য জীবনটা হলে কেমন হত আমরা সবাই চায়। অথচ অন্য জীবনে ঢুকলে আমরা বুঝতে পারি সেই জীবনের অন্ধকার। 'নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস'। যে দর্শন নির্দেশক শুচিতা রায়চৌধুরীকে এই নাটকটি করতে আগ্রহ জাগিয়েছে।
'যদি আর একবার' নাটকে মঞ্চে প্রথমে প্রবেশ করেই হোটের ম্যানেজার সত্যসিন্ধুর চরিত্রে কৌশিক মৈত্র জমিয়ে দিলেন। কৌশিক এই নাটকের সূত্রধর। ছন্দে ভরা সংলাপ বলে অভূতপূর্ব অভিনয়। হোটেলে ঘুরতে আসা চরিত্রগুলির কেউ লেখক কেউ আবার টাকার গদিতে বসা ধনীপুরুষ। অরিন্দম মুখোপাধ্যায় (লেখক সঞ্জয়), রাজীব লাহিড়ী( রতিকান্ত), নবনীতা চক্রবর্তী (বনলতা), বর্ষা দত্ত (অতসী) ,মণিকুন্তলা রুদ্র (করুণা)। এই অ্যামেচার অভিনেতারাও সাবলীল অভিনয় করে গেলেন এবং সংলাপ বলাতেও তাঁরা বেশ সপ্রতিভ। তাই নাটকটি দেখতে ক্লান্তি আসে না। করুণার চরিত্রে মণিকুন্তলা কমেডি অভিনয়ে জমালেন বেশি। ব্রিজলালের চরিত্রে কমেডি অভিনয়ে মাতালেন অরূপকুমার মিত্র। এই নাটকে শো স্টপার ছিলেন ৭৫ পেরনো অভিনেতা সুধীরঞ্জন দাশগুপ্ত। বুদ্ধ জিনের চরিত্রে যখনই তিনি মঞ্চে এসেছেন তখনই দর্শক করতালি দিয়ে উঠেছে।
নাট্য পরিচালক রূপে শুচিতা রায়চৌধুরী সফল। কারণ তিনি অল্প সময়ে সুন্দর গল্প উপস্থাপন করতে পারেন। নাটকটি শুচিতা দীর্ঘ করেননি,বরং ঠাস বুনোটে দুরন্ত।
অপেশাদার মানুষ যারা অন্য ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত তাঁদের থেকে পেশাদার অভিনয় বার করে এনেছেন শুচিতা। মঞ্চসজ্জায় সমুদ্র সৈকতের হোটেল তুলে আনার দৃশ্যটি অসাধারণ।
চমৎকার মঞ্চসজ্জা শুচিতা রায়চৌধুরী ও অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের। আবার তিন মাস পর নাটকটি মঞ্চস্থ হবে। বাদল সরকারের নাটকের গভীরতা সরল কৌতুক সংলাপের মাধ্যমে যদি সব শ্রেণীর দর্শকের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তা বাংলা নাটকের পক্ষে খুব ভাল। সেই কাজটি সুচারু ভাবে করলেন শুচিতা।