
শেষ আপডেট: 27 January 2024 22:27
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেটা ১৯৮০ সাল। মাধ্যমিক তখনও হয়নি। শৈশবে পিতৃহারা মেয়েটার নাটক, থিয়েটারের খুব শখ ছিল। বেতারে নাটক, বিজ্ঞাপনে কাজ, নাটকের মহড়াও চলছিল সমান তালে। সেই সঙ্গেই গ্রুপ থিয়েটারে হাতেখড়ি হচ্ছিল। রেডিওতে ‘আত্মজা’ নামের একটি নাটকে তখন অভিনয় করছিল মেয়েটা। রোগাপাতলা, শ্যামলা মেয়েটাকে দেখেই কিংবদন্তী চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন বুঝে যান এই সে যাকে তিনি খুঁজছিলেন এতদিন।
সেদিনের সেই বাচ্চা মেয়েটা ছিল শ্রীলা মজুমদার। ব্যতিক্রমী অভিনয় দক্ষতার জন্য তাঁকে বাংলার ‘স্মিতা পাটিল’ বলা হত একসময়। সমান্তরাল ছবিতে তাঁর মতো অভিনেত্রী হাতেগোনাই এসেছে। একবার এক সাক্ষাৎকারে শ্রীলা বলেছিলেন তাঁর রূপোলি পর্দায় আসার সেই গল্প। ‘আত্মজা’ নাটকের সময়েই কালজয়ী পরিচালক মৃণাল সেনের নজরে পড়ে যান তিনি। সেই সময় ‘পরশুরাম’ ছবির জন্য নতুন মুখ খুঁজছিলেন মৃণাল সেন। তাঁর সৃষ্ঠ চরিত্রের জন্য নতুন কাউকে খোঁজার ভার দিয়েছিলেন গীতা সেনের উপরে। গীতাদেবীই প্রথম আবিষ্কার করেন শ্রীলাকে। এক দেখাতেই তিনি বুঝেছিলেন এই মেয়ে অনেক দৌড় যাবে। মৃণাল সেন সরাসরি তাঁকে ফোন করেন, নাটকের গল্প শোনেন। তারপরেই পরশুরাম ছবির জন্য শ্রীলার নামেই শিলমোহর দিয়ে দেন।
শ্রীলা বলেছিলেন, রিহার্সাল রুমে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন কালজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক। তাঁর গম্ভীর মুখ আর উজ্জ্বল চাউনি দেখে বুক দুরুদুরুই করছিল শ্রীলার। হঠাৎই গুরুগম্ভীর গলায় মৃণাল সেন জিজ্ঞাসা করেন, “তুমি ভুরু প্লাক করেছো? এখনকার মেয়েরা কি এইসব করে। আমার বয়স কম হলে কখনওই তোমার প্রেমে পড়তাম না।” মৃণাল সেনের সেদিনের কথায় যতই শ্লেষ থাক, তা ভুলতে পারেননি শ্রীলা। হয়ত এই ক’টা কথাই তাঁর স্বাভাবিক, সহজাত অভিনয় ক্ষমতাকে মন্থন করে এনেছিল। পরশুরাম ছবির জন্য সাধারণ, ছাপোষা মেয়ের অভিনয় করতে হত। নো-মেকআপ লুকে শ্রীলা সে চরিত্র অসাধারণ ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তারপর ‘একদিন প্রতিদিন’ ছবি, সেটাও মৃণাল সেনের সঙ্গেই।
কৈশোরে অভিনয়ের সঙ্গে গাঁটছড়া, সেই বন্ধন ছিল অবিচ্ছেদ্য৷ শেষবেলায় কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি ‘পালান’-এর সময় অসম্ভব শারীরিক কষ্টে ভুগছিলেন। কিন্তু সরে যাননি। কারণ লড়াই করার দৃঢ় মানসিকতাটা তৈরি হয়েছিল সেই কৈশোরেই। মাধ্যমিকের পর ওয়ার্কশপ করতে যেতেন মৃণালঘরণী গীতা সেনের কাছে৷ শ্রীলা বলেছিলেন, তাঁকে অভিনেত্রী করে তুলেছিলেন সেন দম্পতি। কখনও যেন তাঁরাই অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন শ্রীলার। মৃণাল সেন পরিচালিত ‘পরশুরাম’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘খারিজ’, ‘খণ্ডহর’ ছবিতে শ্রীলা একের পর এক চরিত্রে নিজেকে ভেঙেগড়ে নিয়েছিলেন। শ্যাম বেনেগালের ‘আরোহণ’, ‘মাণ্ডী’ বা উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর ‘চোখ’ ছবিতে কাজ তাঁর অভিনয়জীবনের মাইলফলক৷
মাত্র ৬৫ বছরেই চলে যেতে হল। শেষ সময়ে অসুস্থ শ্রীলার পাশে খুঁটির মতো ছিলেন অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। ঋতু বলেছেন, তাঁর দিদি নেই, শ্রীলাকেই দিদির আসনে বসিয়েছিলেন। অসম্ভব মনোবল দিতেন শ্রীলা। নিজে ভেঙেচুরে গেলেও বরাবর সাহস জুগিয়ে গিয়েছেন। তাই অসুস্থ শ্রীলার পাশে সবসময় ছিলেন ঋতুপর্ণা। বলছেন, শ্রীলা মজুমদারের জরায়ুতে ক্যানসার হয়েছিল। এই খবর গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া কেউ জানত না। দিদি জানাতেও চাননি। নিজে কষ্ট পেয়েছেন, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কয়েকজনের উপর অভিমানও ছিল, কিন্তু তাও হাসিমুখে লড়াই করে গিয়েছেন। দিদি যে নেই তা ভাবতেই পারছেন না ঋতুপর্ণা। সকলকে সাহস জুগিয়ে এভাবেই দিকশূন্যপুরে ভাল থাকুন শ্রীলা, এটাই চাইছেন সকলে।