
শ্রাবন্তী মজুমদার
শেষ আপডেট: 9 May 2024 18:15
একদিকে তিনি বাংলা গানের পপকুইন অন্যদিকে ‘সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন’, ‘স্যালিকল স্যালিকল স্যালিকল মলম’ - জিঙ্গল কুইন। তবে এবার বাংলা গানের পপ সম্রাজ্ঞী শ্রাবন্তী মজুমদার গাইলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত, তাঁর শ্বশুরবাড়ির দেশ 'আইল অফ ম্যান'-এর Celtic সুর মুর্ছনার সঙ্গে।
* শ্রাবন্তী মজুমদার মানেই মেমসাহেব। আপনি এত বছর বিলেতে থেকেও ঝরঝরে বাংলায় কথা বলেন! অথচ বাংলার বাঙালিরা মনে করেন , বাংলা বললে স্টেটাস কমে।
•• প্রথমত আমি বাঙালি, দ্বিতীয়তও আমি বাঙালি, তৃতীয়তও আমি বাঙালি এবং শেষ পর্যন্তও আমি বাঙালি। যেখানে আমার জন্ম কর্ম সবই বাংলা ভাষায় সেখানে বাংলায় কথা বলায় অসুবিধে কেন হবে! প্রত্যেক দেশে কিন্তু নিজের ভাষাটাকে তাঁরা খুব যত্ন করে রাখে। কিন্তু কলকাতায় আমি এখন যেন আর সেটা দেখতে পাই না। বাংলা বলার সাথে স্টেটাসের কী সম্পর্ক আমি কিন্তু বুঝতে পারলাম না। আমি যখন বিবিসিতে কাজ করেছিলাম একটা জিনিষ শিখেছিলাম ওখানে যখন নিউজ ট্রান্সলেট করতে হত। তখন একটা শব্দও বাংলার জায়গায় ইংরেজি ব্যবহার করা যেত না। এই প্র্যাকটিসটা ভেতরে বসে গেছে আমার। আমি সারা পৃথিবী দাপিয়ে বেড়িয়েছি বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়ে। আমি যেমন যে কোনও দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও কথা বলতে পারব, তেমন মাটির মানুষদের সঙ্গে দাওয়ায় বসে আপন করে খেতেও পারব। আমার স্বামী এদেশের। এদেশে থাকলেও আমার বাঙালিয়ানা আজও বদলায়নি। সেজন্যই বোধহয় আমার এদেশের বন্ধুরা আমায় পছন্দ করেন এবং সম্মান করেন। আমার কাছে আমি আগে ভারতীয় তারপরে সবকিছু।
* এই পঁচিশে বৈশাখে আপনার 'শ্রাবন্তী মজুমদার অফিসিয়াল' ইউটিউব চ্যানেলে যে দুটি নতুন রবীন্দ্রসঙ্গীত এল সেগুলোর কথা শুনি এবার।
•• আমার 'Tagore In Celtic' এই অ্যালবামের ভাবনা শুরু ২০১৭ তে। আমার বহুদিনের স্বপ্ন ছিল রবীন্দ্রনাথের গান সারা পৃথিবীর কাছে পৌঁছে দেব। কিন্তু কীভাবে এই কাজটা শুরু করব বুঝতে পারছিলাম না। এই ভাবনা থেকেই পড়াশোনা শুরু করলাম। অনেক না জানা তথ্য জানলাম। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপর কী ভাবে Celtic মিউজিকের প্রভাব পড়েছিল, যার থেকে 'পুরানো সেই দিনের কথা' বা 'ফুলে ফুলে ঢলেঢলে' র মতো বেশ কিছু গানের জন্ম হয়। মনে হল তাই তো! আমি তো এই বিষয় গুলো নিয়েই কবিগুরুর অ্যালবামের কথা ভাবতে পারি। 'আইল অফ ম্যান' সরকারের আর্ট কাউন্সিলে আমার প্রস্তাবটা পাঠালাম। ধরেই নিয়েছিলাম হবে না। কিন্তু আশ্চর্য ভাবে আমার প্রস্তাব ওঁদের ভাল লেগে গেল। তার একটা কারণ বোধহয় ঐ কমিটির অনেকেই আমাদের জাতীয় কবি নোবেল জয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম জানতেন। আমার ভাবনা ছিল রবীন্দ্রনাথের মূল গানটা অবশ্যই বাংলায় হবে, তার সাথে Celtic ভাষায় কিছুটা হবে এবং বাঙালি ছাড়া সারা পৃথিবীর মানুষ যাতে মূল গানের বক্তব্য বুঝতে পারে তাই ইংরেজিতে ন্যারেশন থাকবে। সেভাবেই আমি এখানকার একজন খুব নামকরা গীতিকার এবং সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন একজনকে খুঁজে বার করলাম। তিনি রবীন্দ্রনাথের নাম জানতেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতার ইংরাজি অনুবাদও পড়েছেন। তিনি হলেন Bobs Carswell।
বব খুব যত্ন নিয়ে 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে' এবং 'ফুলেফুলে ঢলেঢলে' Mens Celtic এ লিখলেন। শুধু লেখাই নয় আমি ববের সঙ্গে বসে সুরের উপর কথাগুলো গেয়ে দেখেছিলাম কেমন শোনাচ্ছে। এরপর প্রফেশনাল Mens Traditional গানের শিল্পী David Kilgallon এর সঙ্গে গান দুটো নিয়ে বসলাম। ডেভিড নিজেই একজন ভাল শিল্পী এবং বহু মিউজিক বাজায় তাই এত ভাল কাজ হল। আজ আমার স্বপ্ন সত্যি হতে হল। তৈরি হল স্বপ্নের দুটো রবীন্দ্রসঙ্গীত। কেলটিকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গান যা ইতিহাসে প্রথম। ইংরাজিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত অনেকে গেয়েছেন। কিন্তু 'ট্যাগোর ইন কেলটিক' আগে হয়নি। কেউ ভাবতেই পারেনি। ভাবনাটা আমার। কেলটিকের সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে আমি পুরো অ্যালবাম করতে চাই। যেমন অস্ট্রেলিয়া থেকে আমাকে একজন লিখলেন "দিদি আমাদের রেডিওতে এ দুটো গান কিন্তু বাজাবই"। অথচ আমার কলকাতা শহরে যেখানে আমি রেডিওতে কাজ করে এসেছি, সেখানে আমার রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজবে কিনা জানি না। কলকাতার রেডিওতে এখন আর বাংলা গান বাজে না। খুব খারাপ লাগে। অথচ বিদেশে কোটি কোটি এফ এমে পুরনো নতুন গান কোটিবার বাজাচ্ছে। আমাদের ওখানে কলকাতায় নতুন গান নাকি বাজানো হয় না। তো লোক শুনবে কীভাবে? একসময় পুজোর গান আমরা তুলতাম, 'অনুরোধের আসর' শুনেই।
* আপনি তো ছোট থেকেই ক্লাসিকাল গানের চর্চা করেছেন, সব ধরনের গান শুনে বড় হয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের গান শেখা কীভাবে?
•• যে কোনও বাঙালি বাড়ির পরিবেশে তো রবীন্দ্র-নজরুল থাকেনই। সেটা ভীষণ ভাবেই ছিল। আমার বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল আমি ক্লাসিকাল শিল্পী হব। তবে আমাদের স্কুলে রবীন্দ্রনাথের গানের কম্পালসারি ক্লাস ছিল। আমি তো দক্ষিণ কলকাতার কমলা গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রী ছিলাম। আমাদের স্কুলে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখাতেন ভারতীদি। আশ্চর্যজনক ভাবে পরে যখন আমি শ্রাবন্তী মজুমদার হয়ে গেছি তখন মায়া সেনের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখতে গিয়ে শুনলাম ভারতীদি আদতে মায়াদির বোন। ভারতীদি অসাধারণ শেখাতেন, তেমনই ভাল মায়াদি। ছোট্ট থেকে ভারতীদির কাছে যা যা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছিলাম একটা গানও ভুলিনি। সব গান মনে আছে। কমলা গার্লসের চন্ডালিকা, তাসের দেশ ইতিহাস রচনা করেছিল। তবে আমি গান ভাল গাইলেও আমায় কখনও স্কুলে রবীন্দ্র জয়ন্তীতে পারফর্ম করতে দেওয়া হত না। কোনদিনই করিনি। কেউ আমাকে বলেওনি করতে ছোটবেলায়। কেউ ভাবতেও পারেনি আমি বড় হয়ে গান গেয়ে নাম করব। আমার গলাটাই মানুষ মনে রাখবে। তাই আমার যখন প্রথম রেকর্ড বেরল, হিট করল। স্কুলের সবাই খুব অবাক হয়ে বলেছিল "এই কী সেই শ্রাবন্তী"?
* কেন?
•• আমার গলা খুব ভারী ছিল বলে বড় ক্লাসের মেয়েরা আমায় নিয়ে খুব হাসাহাসি করত। "তোমার নাম কী?" আমার গলা শোনার জন্য জিজ্ঞেস করত। বাঙালি মেয়েদের মতো আমার গলা নয়। কিন্তু পরে আমি যখন রেডিওতে কাজ করেছি আমি দেখেছি আঙুরবালা,ইন্দুবালাদের গলা তো অনেক অনেক বেশি ভারী । আমি আর কাজি সব্যসাচী আঙুরবালা,ইন্দুবালাদের ইন্টারভিউ করেছিলাম। হীরাবাঈ বরোদেকর ,বেগম আখতার এঁদের গলা ভীষণ ভারী হলেও অসাধারণ। আমি তো পাগলের মতো এঁদের ভালবাসি আজও। কিন্তু আমার গলা নিয়ে কেন এত মজা করা হতো সেটা আজও বুঝে পাইনি। আমার পরে তো বাংলা গান গাইতে ঊষা (উত্থুপ) এল, ওর গান নিয়ে সবাই পাগল হয়ে গেল, কাউকে তো বলতে শুনিনি ঊষার ভারী গলা। আমার থেকে অনেক বেশি ভারী গলা। তবে আমি আমার শ্রোতাদের থেকে প্রচুর ভালবাসা পেয়েছি। আমার গলাটা এবং কথা বলাটা যে এত আলাদা যার জন্যেই আমি এত জনপ্রিয় হয়েছিলাম।
* মায়া সেনের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখতে গিয়ে কোনও স্মরণীয় মুহূর্ত?
•• রবীন্দ্রসঙ্গীত বলার চেয়ে 'রবীন্দ্রনাথের গান' বলতে আমি ভালবাসি। রবীন্দ্রসঙ্গীত বললেই সেই দাঁত চেপে চেপে গায়কী মনে হয়। আজও অনেকে ঐভাবেই গান। আমি যেহেতু ক্লাসিকাল বেসড তাই মায়াদির কাছে যাই। মায়া সেনের বেনারস ঘরানা। আমি ক্লাসে কিন্তু শিখিনি,মায়াদি আমাকে আলাদা করে শেখাতেন। কারণ তখন আমি শ্রাবন্তী মজুমদার হিসেবে বেশ খ্যাত। সবাই আমায় চেনে। ওস্তাদ মুনাওয়ার আলি খাঁ সাহেবের কাছেও আমি ক্লাসিকাল একাই শিখেছিলাম। মায়াদির কাছে টপ্পা অঙ্গের গান আমি অনেক শিখেছি। আমার কাছে স্মরণীয় ঘটনা যেটা, আমি ভুলতেই পারব না সারাজীবনে। লেখক সাংবাদিক সন্তোষকুমার ঘোষ আমার কন্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান ভীষণ ভালবাসতেন। উনিই কিন্তু আমাকে মায়াদির কাছে গান শিখতে যেতে বলেন। তখন ২৫শে বৈশাখ বিশাল করে রবীন্দ্র কাননে রবীন্দ্রজয়ন্তী হত। সন্তোষদা হঠাৎ আমাকে বললেন "এবার তুই রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবি মঞ্চে!" আমি বললাম "তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! আমি অত লোকের সামনে রবীন্দ্রনাথের গান গাইব!" উনি বললেন "দুটো হলেও তুই গাইবি"।
এদিকে আমি তো হারমোনিয়াম বাজাতে জানি না। তানপুরাতে গান শিখেছি। তখন আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলাম রবীন্দ্রকাননে আর আমার গুরু মায়াদি আমার সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজালেন। মায়াদি নিজেই তো একজন বড় শিল্পী কিন্তু উনি বলেছিলেন "আমি শ্রাবন্তীর সঙ্গে বাজাব"। এত মূল্যবান একটা মুহূর্ত আমি বলে বোঝাতে পারব না। আমি গেয়েছিলাম 'ওগো কাঙাল, আমারে কাঙাল করেছ' আর 'প্রেম এসেছিল নিঃশব্দচরণে'। কেউ তখন কিন্তু বিশ্বাস করেনি বলেছিল "এই কী পপকুইন শ্রাবন্তী মজুমদার?" দর্শকরা অবাক শ্রাবন্তী গাইতে পারল এ গান।
আরো মনে পড়ছে, কোনও একজন স্পন্সর রেডিওর জন্য বাংলা গানের অনুষ্ঠান করেন তাতে মায়াদির ট্রেনিংয়ে আমি বেশ কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিলাম তারমধ্যে ছিল 'কাঙাল আমারে কাঙাল করেছ'। আমি যখন রেডিওতে নীহাররঞ্জন গুপ্তর কিরীটী রায়ের উপর একাধিক নাটক করেছি তখন নীহারবাবু আমায় শর্ত দিয়েছিলেন,' শ্রাবন্তী তোমায় নাটকে একটা হলেও রবীন্দ্রসঙ্গীত রাখতেই হবে। 'সেখানে আমি গেয়েছিলাম 'এসো গো, জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি'।
* আপনার রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে সে সময় কোনও লেখালেখিও হয়নি?
•• না না কেউ না। বরং তখনকার সাংবাদিকরা আমায় নিয়ে উল্টোপাল্টা অনেক লিখেছেন। এমনও লিখেছেন "যে বোরোলীনের গান করে সে আবার কী পুজোর গান গাইবে!"। তাঁরা ব্যক্তিকে সমালোচনা করেছেন কিন্তু গানের কোনও সমালোচনা নেই। আমি বোরোলীন জিঙ্গল গেয়েছি যেহেতু তাই আমি আবার পুজোর গান কী গাইব? এই হচ্ছে সাংবাদিকদের থেকে আমার প্রাপ্তি। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে কোনও আলোচনাই হয়নি। এইচ এম ভি থেকে বলা হয়েছিল "শ্রাবন্তী তুমি পপকুইন, তোমার ইমেজে শ্রোতারা রবীন্দ্রসঙ্গীত নেবেন না।"
কোনওদিন এইচ এম ভি আমার রবীন্দ্রসঙ্গীত করেনি। অথচ আমি মঞ্চে রেগুলার রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতাম। ফেসবুকে কদিন আগেই একজন শ্রোতাবন্ধু লিখলেন "আপনি তো বহু অনুষ্ঠানেই 'ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে' গাইতেন।" একদম সত্যি কথা! আমার দর্শকরা আমায় খুব ভাল ভাবে নিয়েছেন। তাঁদের সম্পর্কে আমার কোনও অভিযোগ নেই। দর্শকরা আমাকে না নিলে আমি কি এতবছর থাকতে পারি! আমি আজ পর্যন্ত আমার শ্রোতাদের থেকে বিরূপ কিছু শুনিনি। এত যে বস্তা বস্তা চিঠি আসত আমার কাছে, একটা চিঠি আমি বিরূপ মন্তব্যের দেখিনি। এটা আমার সৌভাগ্য।
* আপনি টাইপকাস্ট হয়ে গেছিলেন, সেটাই কি কারণ?
•• কলকাতায় তো সবসময়ই তাই হয়। আমি কিন্তু মায়া সেনের ট্রেনিং এ ১৪ টা রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিলাম। মায়াদি ও মায়াদির স্বামী ত্রিদিবদা আমার গানগুলো বিশ্বভারতীতে পাঠিয়েছিলেন। বহু বছর আমরা অপেক্ষা করেছি কোনও উত্তর আসেনি। ওঁরা কিছু করেননি। মায়াদি তো নিজেই অবাক হয়ে গেছিলেন। মায়াদি নিজে পাঠিয়েছিলেন তবু বিশ্বভারতী পাশ করেনি। তখন তো কপিরাইট ছিল। যে কারণেই এইচ এম ভি থেকে আমার রবীন্দ্রনাথের গান হয়নি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, আশা ভোঁসলের রবীন্দ্রসঙ্গীতের ট্রেনারও ছিলেন মায়া সেন। আশা ভোঁসলের রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশ্বভারতী পাশ করিয়ে দেয়। আশা ভোঁসলে বা লতা মঙ্গেশকর যাই গাইতেন সেটা পাশ হয়ে যেত। যদিও আশা ভোঁসলের রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার অনেকের থেকে বেশি প্রিয়। সুরের গন্ডগোল নেই হয়তো উচ্চারণে কিছু এদিক ওদিক আছে। তাতে কী এসে যায়! উনি চেষ্টা তো করেছেন। আশাজির রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার কাছে বেস্ট। আশাজির মতো এক্সপ্রেশনে 'সহে না যাতনা' গাইতে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের একজনকেও শুনিনি। তাঁরা আবার আশাজির গান নিয়ে সমালোচনা করেন। অনেককে দেখলাম রবীন্দ্রনাথের গানে পদ্মশ্রী পেলেন তাঁদের তো গানে কোনও এক্সপ্রেশনই পাই না। মায়াদি বলতেন আশাজির কী অধ্যবসায় কী তাড়াতাড়ি গান তুলেছেন।
* আপনার প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম কবে বেরোয়?
•• ২০০৯-১০ 'ভাবনা রেকর্ডস' থেকে। আমার কষ্ট হল যখন রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম হল আমার তখন মায়াদি থাকলেন না। তখন কপিরাইট উঠে গেছে ,তবু স্বরলিপি মেনে গেয়েছিলাম। সুরে কথায় কোন বিকৃতি নেই। 'শুধু মনে মনে শুনি' আমার প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত অ্যালবাম। এটাতেই আমি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আবৃত্তির সঙ্গে গান করি। আগেও সৌমিত্রদার সঙ্গে 'শেষের কবিতা' করেছি। তারপর আমার 'ছেলেরা কেন একটু মেয়েদের মতো হয়না' অ্যালবামে সৌমিত্রদা ছেলের ভূমিকা করেন ও আমি মেয়ের ভূমিকায় করি।" সওয়াল জবাবের মতো ছিল। কথায় অভিনয়।
* আপনার গলা নিয়ে কথা হচ্ছিল, আপনাকে তো একসময় 'ন্যাকা শ্রাবন্তী' ডাকা হত! কীভাবে নিতেন?
•• আমাকে 'ন্যাকা শ্রাবন্তী' বলে অনেকেই ডাকতেন। সেটা খুব মিষ্টি করে স্নেহের সঙ্গে । এটা কেন হয়েছিল বলছি। রেডিওতে আমাদের একটা অনুষ্ঠান হত 'বিনাকা রূপকথা'। কাজি সব্যসাচী ছিলেন আলিবাবা। পরে আমি মর্জিনা হয়ে এলাম। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় একদিন ওঁনার চেনা একজনের বাড়িতে গিয়েছিলেন তো রেডিওতে আমাদের অনুষ্ঠানটা চলছিল। তো যেই আমি বলেছি শ্রাবন্তী বলছি। তখনই সেই বাড়ির থেকে বলে উঠেছিল 'ন্যাক্কা'। সেটা পুলকদা আমাদের সবাইকে বলেছিলেন। আমার কোনই আপত্তি নেই। যেভাবেই ডাকুক না কেন তারা তো আমায় ভালবেসেই ডাকেন।
* কলকাতার শিল্পীরা তো আজকাল জিনস পরে বা খোলামেলা পোশাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছেন। আপনি কী বিদেশে এভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন?
•• আমি জিনস পরে জীবনেও মঞ্চে উঠব না রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে। আমি শাড়িতেই স্বচ্ছন্দ। শাড়ির বদলে যদি কুর্তাও পরি সেটা এমন হবে যেটা খুব গানের সঙ্গে যায়। কলকাতার নামকরা অনেককেই দেখলাম জিনস পরে স্লিভলেস পরে রবীন্দ্রনাথের গান গাইছেন। অন্যরা করতেই পারে আমি পারব না।আমি খুব মেমসাহেব,আমি আবার অতটাই বাঙালি। আমি চিরকাল শাড়ি পরেই সব কাজ করেছি। তারপর যখন এইট্টিজে লোডশেডিং শুরু হল আমাকে যেহেতু রেডিওর স্টুডিওতে সব কাজটা করতে হত তখন আমাকে কুর্তা পরতেই হত। কিন্তু আমি পপ গান গাইবার সময়ও জিনস পরে গাইনি। মঞ্চে শাড়ি প্রথম পছন্দ । আমার ধ্যাবড়া করে পরা চোখের কাজল আমার ইউএসপি। বিলেতের মেমসাহেবরা বলেন "আমাদের একটু শিখিয়ে দেবে চোখে কী ভাবে কাজলটা পরো"।
* আপনি পপ কুইন হওয়াতেই কি অন্যধারার গানে রাজনীতির শিকার হলেন?
•• বাংলা গানের জগতে আমাকে একঘরে করে রাখা হয়েছিল। সেটা একটা অভিমান আছেই আমার। বাংলা ছবিতেও আমার গলাটা শুধুমাত্র ক্যাবারে গানের জন্যই নেওয়া হত। তাও তো তখনকার বেশিরভাগ ক্যাবারে গানে আমাকে নেওয়া হয়নি। 'সোনা বৌদি' ছবিতে গেয়েছিলাম 'বনবন বনবন টাকায় ঘুরছে দুনিয়াটা' যেটা আমার পুজোর গানের আগে অজয় দাসের সুরে প্রথম প্লেব্যাক করেছি। তারপরে আমাকে ছবির গান করবার জন্য কেউ ডাকেনি। আমি লোকের কাছে গিয়ে বলতে পারতাম না।
একমাত্র হেমন্তদা 'টগরী' ছবিতে সন্ধ্যা রায়ের লিপে আমাকে দিয়ে একটা গান করিয়েছিলেন 'কোন এক ফাগুন মাসে, চড়লাম মিনি বাসে'। এটা কিন্তু ক্যাবারে গান নয়। পুলকদার লেখা, হেমন্তদার সুর। 'প্রেমের খেলা কে বুঝিতে পারে' আর ডি বর্মণের জন্যই হল। উনি স্বপন চক্রবর্তীকে বললেন শ্রাবন্তী বম্বে আছে ওকে দিয়ে গাওয়া। কিশোরকুমার অসম থেকে ফিরে গেয়েছিলেন ডুয়েট আমার সঙ্গে।
* আপনার ভক্তদের কী বলবেন?
•• আমার খুব ইচ্ছে দর্শক শ্রোতারা যেন মন দিয়ে 'Tagore In Celtic' এর দুটো রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার ইউটিউব চ্যানেল শ্রাবন্তী মজুমদার অফিসিয়ালে গিয়ে শোনেন। শোনার পর যার যা কিছু বলার আছে কমেন্ট করে যদি আমাকে জানান গানের লিঙ্কে কমেন্ট করে আমার ভাল লাগবে। এই গান দুটোর ব্যাপ্তি অনেকখানি। সেটা যেন ছড়াতে থাকে। অভিনব ভাবনায় এই রবীন্দ্রনাথের গান পৃথিবীর সব প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ুক।