শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
মহামারীর সঙ্গে লড়ছে গোটা বিশ্ব। চিন থেকে শুরু হলেও আঁচ এসে পড়েছে আমাদের দেশেও। সে আঁচের উত্তাপ বেশ জোরালো। কলকাতা ও শহরতলিও রক্ষা পায়নি। যদিও এই প্রথমবার নয়। বহু বছর আগে প্লেগ, যক্ষ্মা, স্প্যানিশ ফ্লু, গুটিবসন্ত, জাপানি ফ্লু-র মতো মহামারীর সাক্ষী হয়েছে বাংলা। প্রতিটা ক্ষেত্রেই মহামারী হওয়ার মূল কারণ কোনও না কোনও ভয়ঙ্কর জীবাণু।
মানুষের জীবন যেহেতু এসব মহামারীর ছোবলে বারবার বিধ্বস্ত হয়েছে, তাই রুপোলি পর্দাতেও মহামারী বাদ যায়নি বিষয় হিসেবে। এরকম মহামারী-কেন্দ্রিক ছবি বানানোর জন্য দুর্দান্ত ভূমিকা পালন করেছে হলিউড। বারবারই নানা হলিউডি ছবিতে উঠে এসেছে বিশ্ব মহামারীর বিভিন্ন ঘটনা। কখনও সেটা কাল্পনিক, কখনও বা বাস্তবে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে। হলিউড রাজত্ব করলেও, কিছু আঞ্চলিক ছবির নামও উঠে আসে এই তালিকায়। এমনকি সিনেমায় মহামারীর দৃশ্য দেখানোর ঘটনায় বাদ যায়নি আমাদের বাংলা ছায়াছবিও।
সেরকমই কিছু মহামারী বিষয়ক চলচ্চিত্রের গল্প রইল আজ।
কন্টেজিয়ন
করোনাভাইরাস নিয়ে এই ছবির নাম এখন সবার মুখে-মুখে। রীতিমতো চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে এই ছবিটি। ছবিটি মুক্তি পায় ২০১১ সালে। তখন বক্স অফিসে ছবিটি যে খুব সাফল্য পায়, তা নয়। ছবিটি অনেকেই দেখেননি, আদৌ চর্চাতেই আসেনি। তার ন'বছর পরে চিন থেকে কয়েকশো দেশে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস সংক্রমণ এই ছবিকে নিয়ে এল আলোচনার কেন্দ্রে। কারণ, কন্টেজিয়নের গল্প আর বাস্তবের করোনাভাইরাস মহামারীর অবিশ্বাস্য মিল।

স্টিভেন সোডারবার্গ পরিচালিত ২০১১ সালের সিনেমা ‘কন্টেজিয়ন’ (অর্থ: রোগ সংক্রমণ) ছবিটি শুরু হয় কালো পর্দা থেকে। কে যেন কাশছে খুকখুক করে। তারপরেই অভিনেত্রী গুইনেথ প্যাল্ট্রোকে দেখা যায়। মোবাইলে তার গত রাতের প্রেমিকের সাথে কথা বলছে সে। কাজের জন্য হংকংয়ে ছিল, সেখানেই প্রেমিকের সঙ্গে 'ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড' করেছে সে। আমেরিকায় এসে সে মারা যায় তারপর। ততক্ষণে রোগ ছড়িয়ে গেছে ছেলের ভিতর। স্বামী দিশেহারা। এভাবেই শহর থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস। মাস্ক,হ্যান্ড স্যানিটাইজার সবাই ব্যবহার করছে। কোলাকুলি,হ্যান্ডশেক বন্ধ। যার সব মিলই আছে করোনাভাইরাসের সঙ্গে। সেভাবেই যেন চিত্রনাট্য লিখেছেন স্কট জি বার্নস।

ন'বছর আগে যখন ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল তখন সেটা ভাল করে দেখলে বা বুঝলে অনেকে হয়তো অনেকটাই শিক্ষিত হতে পারতেন এই দুঃসময়ে।
প্যানডেমিক
এক জন ডাক্তার ও তাঁর দল মহামারী থেকে যেসব মানুষ বেঁচে গেছেন, লস এঞ্জেলসে এসে তাঁদের খুঁজে বের করছেন এবং তাঁদের নিয়ে নতুন ইতিহাস তৈরি করছেন। এমন কাহিনি উঠে এসেছে ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘প্যানডেমিক’ ছবিতে। ছবির পরিচালক জন সুটস। চিত্রনাট্যকার ডাস্টিন টি বেনসন। এই ছবিটি জনমানসে বিপুল ভাবে গৃহীত হয়েছিল।


টোয়েন্টি এইট ডেজ লেটার
২০০২ সালে মুক্তি পায় ছবিটি। ছবিতে দেখা যায়, ব্রিটিশ ‘অ্যানিম্যাল লিবারেশন’ সংস্থার একদল আন্দোলনকারী একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারের ভেতর ঢুকে পরীক্ষারত কয়েকটি শিম্পাঞ্জিকে মুক্ত করে দেয়। শিম্পাঞ্জিগুলোর ওপর একটি বিশেষ কেমিক্যাল পরীক্ষা করা হচ্ছিল, যা প্রচণ্ড রাগের উদ্রেক করে এবং এটি বহনকারী যে কোনও প্রাণী যদি কাউকে কামড়ে দেয়, তাহলে সেই ব্যক্তিও আক্রান্ত হয়ে যায়। এমন অবস্থায় চার জন শুরু করে বেঁচে থাকার লড়াই। সমস্ত ব্রিটেনে একটা ভয়াবহ প্রাণঘাতী ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। ২৮ দিন পর শুধুমাত্র হাতেগোনা কিছু মানুষ বেঁচে থাকে। এ ছবির পরিচালক ড্যানি বয়েল।

‘টুয়েন্টি উইকস লেটার’ নামে ছবিটির একটি সিক্যুয়েলও বের হয়েছে ২০০৭ এ। এম্পায়ার ম্যাগাজিনের ‘ফাইভ হান্ড্রেড গ্রেটেস্ট মুভিজ অফ অলটাইম’ এর ২০০৮-এর তালিকাতেও স্থান করে নিয়েছে ছবিটি।
আউটব্রেক
১৯৯৫ সালে জার্মান পরিচালক উলফগ্যাং পিটারসনের ‘আউটব্রেক’ ছবিটি মুক্তি পায়। ডাস্টিন হফম্যান, মর্গান ফ্রিম্যান, রেনে রুশো, কিউবা গুডিং প্রমুখ অভিনীত এ ছবি। আফ্রিকার দেশ জায়ারে অনেকটা ইবোলার মতো প্রাণঘাতী কল্পিত এক ভাইরাস ‘মোতাবা’ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সেই ভাইরাস আমেরিকার এক শহরে সংক্রমিত হয়। পরবর্তী কালে বাস্তবের ইবোলা আক্রমণ অনেকটাই মিলে যায় সিনেমার এই মোতাবার সঙ্গে।

আই অ্যাম লিজেন্ড
হলিউড মহাতারকা উইল স্মিথ অভিনীত ২০০৭ সালের সিনেমা ‘আই অ্যাম লিজেন্ড’। ছবিতে ভাইরোলজিস্টের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সেখানে দেখানো হয় বেশ কয়েক বছর আগে মহামারীতে আক্রান্ত নিউ ইয়র্কের বেশিরভাগ মানুষ মারা যায়, বাকিরা পরিণত হয় দানবে জোম্বি রাক্ষসে। এদিকে ফাঁকা রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে হরিণ ও সিংহ। একমাত্র বেঁচে থাকা মানুষ স্মিথ এর থেকে মুক্তিপথ খুঁজতে থাকেন। তাঁর একমাত্র সঙ্গী তার পোষা অ্যালসেশিয়ান কুকুর। স্পেশ্যাল এফেক্টের সাহায্যে যেভাবে ফাঁকা নিউইয়র্ক শহর দেখানো হয়েছে তা প্রশংসনীয়।

রেসিডেন্ট ইভিল
মিলা জোভোভিচ অভিনীত এই সিনেমাতে দেখানো হয় একটি বিশেষ চক্রের কারণে জীবাণু অস্ত্রের মাধ্যমে কীভাবে জোম্বি হয়ে পড়ছে গোটা শহর। এই ভাইরাস পরবর্তী কালে খাদ্য সংকটের কারণ হয় ও অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে সেটাও দেখানো হয় এই ছবিতে। ছবিটি এত সফল হয় যে সিরিজও বানানো হয় ছবিটির।

২০০৭ সালে ‘রেসিডেন্ট ইভিল: এক্সটিংশন’, ২০১০ সালে ‘রেসিডেন্ট ইভিল: আফটার লাইফ’, ২০১২ সালে ‘রেসিডেন্ট ইভিল: রিট্রিবিউশন’ এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে ‘রেসিডেন্ট ইভিল: দ্য ফাইনাল চ্যাপ্টার’ মুক্তি পায়।
ক্যারিয়ারস
২০০৯ সালের ছবি ‘ক্যারিয়ারস’-এ দেখানো হয় চার বন্ধু মারাত্মক ভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। শেষে এক পর্যায়ে তারা জানতে পারছে, আসলে তারা নিজেরাই অন্য ভাইরাসের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর। ভাইরাস শরীরে নয়, মনে, সেটা নিজেরা অবহিত হয় তাঁরা। এ ছবি বিজ্ঞানের চেয়ে বেশি কিছু। এ ছবি দর্শনের ছবি, ভবিতব্যের ছবি।

ভারতীয় আঞ্চলিক ছবিতে, কীভাবে এসেছে মহামারী প্রসঙ্গ
ভাইরাস
২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মালায়ালাম এই ছবিটা থেকে করোনাভাইরাসের কিছু বিষয়ে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। ছবিটির সঙ্গে সরাসরি করোনাভাইরাসের সম্পর্ক না থাকলেও, করোনা ও নিপা দুটোই বাদুড় থেকে উৎপন্ন হয়েছে আর এই দুটোই প্রতিরোধের জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলোও প্রায় একই রকম। ২০১৮ সালের কেরালার "কোঝিকোড়" শহরে হয়ে যাওয়া নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে সত্যি ঘটনা অবলম্বনে বানানো মালায়ালাম ছবি 'ভাইরাস'।

কীভাবে ভাইরাসটি ছড়াল এবং হু-এর প্রতিবেদক টিমকে উপযুক্ত তথ্য দিতে কত হিমসিম খেতে হয়েছিল, সেইসঙ্গে মৃতদেহ থেকে যেন সংক্রমণ না ছড়ায়, তার জন্য লাশগুলোকে কী করা হয়েছিল তা জানতে এই ছবি দেখে ফেলুন।
বাংলা ছবিতেও মহামারী হিসেবে প্লেগ, যক্ষ্মা, ফ্লু, কলেরা -- এসব উঠে এসেছে বিভিন্ন দৃশ্যে।
জীবন-মরণ
টিবি হলে তার চিকিৎসা আছে এবং রোগটা সেরেও যায়। এই নিয়ে এই পুরোনো বাংলা ছবি আছে। ১৯৩৮ সালে নীতিন বোস পরিচালিত জীবন-মরণ। সায়গল আর লীলা দেশাই নায়ক-নায়িকা। এই ছবিতে সায়গলের টিবি হয়েছিল। দেখানো হয়েছিল, ঠিকমতো চিকিৎসা হলে সেরে যায় টিবি। নায়কের বন্ধু বড় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ডাক্তার ছিলেন, তিনি ওঁকে স্যানিটোরিয়ামে পাঠান। পরে সায়গল সুস্থ হন এবং সায়গল আর লীলা দেশাইয়ের বিয়ে হয়। যক্ষ্মা হওয়ার পরেও যে সুস্থ হয়ে বিয়ে হতে পারে, এমন শুভবার্তা ছবিটিতে দেওয়া হয়। যক্ষ্মা কিন্তু সে যুগে কিংবা তার পূর্বযুগে মহামারীসম আকার নিয়েছিল।

গৃহদাহ
প্লেগও একসময় মহামারীর আকার নেয় বাংলায়। রবীন্দ্রনাথ থেকে বিবেকানন্দ সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন উদ্ধারকাজ ও সেবায়। শরৎচন্দ্রের 'গৃহদাহ'-তেও রয়েছে প্লেগ বিষয়ে কিছু ডায়লগ। যা আমরা 'গৃহদাহ' ছবিতেও পাই। প্লেগ সেযুগে একটা মস্ত মহামারী হয়ে উঠেছিল। মনে আছে নিশ্চয়ই, সুরেশবাবু অচলাকে একার করে পেতে মহিমবাবুকে প্লেগের চিকিৎসায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল? অচলা বলেছিল "সুরেশবাবু আপনি ডাক্তার, প্লেগরুগিদের দেখা আপনার ধর্ম। কিন্তু মহিমবাবু ওকালতি শুরু করেছেন, ওঁর ওখানে কী কাজ? উনি যাবেন না।"

প্লেগ মহামারীতে রোগীদের মাঝে নিয়ে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী মহিমকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন সুরেশ। কারণ অচলাকে বিয়ে করতে তাহলে কাঁটা সরে যায়। কিন্তু অচলা সুরেশের কুপরিকল্পনায় জল ঢেলে দেন। সুচিত্রা সেন, উত্তমকুমার, প্রদীপকুমার, পাহাড়ি সান্যাল অভিনীত সুবোধ মিত্র পরিচালিত ১৯৬৭ সালের ছবি 'গৃহদাহ'।