
শেষ আপডেট: 13 February 2021 12:25
'ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেড কর প্রেমের পদ্যটাই ... বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি শুধু তোমাকেই চাই।'
' শুধু তোমাকেই চাই'....এই কথা মুখে না বলে স্পর্শের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতে ঠোঁটে ঠোঁটে ব্যারিকেড করতেই পারেন। আজ তারই দিন। চুম্বন দিবস। কিস ডে। ভারতবর্ষের মতো রক্ষণশীল দেশে প্রকাশ্যে চুম্বন করা দু্রস্ত, প্রকাশ্যে চুম্বন নিয়ে আলোচনা করাও যেন পাপের কাঠগড়ায় মাপা হত এককালে। কিন্তু ভারতীয় পুরাণ থেকে মন্দির ভাস্কর্যে চুম্বনরত মিথুন মূর্তি বহু আগে থেকেই প্রচলিত। অথচ চিরকাল তাকে যেন অন্ধকারেই নিষিদ্ধ করে রেখেছে ভারতীয় সমাজ। আজকাল ভারতীয় চলচ্চিত্রে চুম্বনদৃশ্য জলভাত হয়ে গেছে। অনেক অপ্রাসঙ্গিকভাবেও আজকাল অহেতুক চুম্বনদৃশ্য ছবিতে রাখা হচ্ছে। বিশেষত ওটিটি সিরিজগুলোতে আজকাল চুম্বন যেন খুল্লামখুল্লা। কিন্তু ভারতীয় চলচ্চিত্রের চুম্বন ইতিহাস এত সস্তা চটুল ছিল না। যেভাবে ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রথম চুম্বন দৃশ্য দেখানো হয় তাকে কোনওভাবেই অশ্লীল বলা চলেনা। বরং তা ছিল এক বিশুদ্ধ শিল্প। 'কর্ম' ছবিতে চার মিনিটে হিমাংশু-দেবিকার চুম্বন, যা ছিল ভারতীয় সবাক চলচ্চিত্রে প্রথম দীর্ঘায়িত চুম্বন দৃশ্য। সেই দৃশ্য নিয়ে সেকালে সমালোচনা থেকে ছিছিক্কার কিছু কম হয়নি। ছবিটিকে ব্যান করে দেবার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। কিন্তু সেসবে আটকে রাখা যায়নি এই চুম্বনের আলোড়ন।
তবে এরও আগে ১৯২৯-এ ‘প্রপঞ্চ পাশ’ (আ থ্রো অব ডাইস) জার্মান নির্বাক ছবিতে সীতা দেবী ও চারু রায় চুম্বন-দৃশ্যে অভিনয় করেন। কুড়ির দশকে ‘পতিভক্তি’ ছবিতে ললিতা পওয়ারকেও এমন দৃশ্যে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু 'কর্মা' প্রথম ভারতীয় সবাক ছবি, যাতে দীর্ঘায়িত চুম্বনদৃশ্য রূপোলি পর্দায় প্র হয়। যা নিয়ে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি হয় দেশজুড়ে।
তখনও ভারত বিট্রিশ শাসনের অধীন। স্বাধীনতা আন্দোলন দেশজুড়ে চলছে ভারতবর্ষকে পরাধীনতার শেকল থেকে মুক্ত করতে। সেই পরাধীনতার যুগে দাঁড়িয়েই এক ভারতীয় মহিলা ভারতীয় চলচ্চিত্রকে সাবালক করে দিয়েছিলেন চার মিনিটের চুম্বন দৃশ্যে। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি রূপোলি পর্দায় এই 'কর্ম' ছবি ছিল যেন আরেক সাহসী আন্দোলন।
অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমের মেয়ে দেবিকারানি চৌধুরী। পিতা কর্নেল মন্মথনাথ চৌধুরী, দেশের অন্যতম বৃহদায়তন এস্টেটের জমিদার, অন্যদিকে ভারতের প্রথম শল্যচিকিৎসক। মা লীলা দেবীচৌধুরী। বাবা ও মা দু’দিক দিয়েই রবি ঠাকুরের আত্মীয়া দেবিকা। মন্মথনাথ চৌধুরীর মা সুকুমারী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বোন। আবার দেবিকার কাকা হলেন ‘বাংলার বীরবল’ প্রমথ চৌধুরী। অভিজাত, উচ্চশিক্ষিত,বনেদি পরিবারের মেয়ে দেবিকা। শান্তিনিকেতনে পড়তে গিয়ে দেবিকা আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্যে। দেবিকার বাবাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘তোমার কন্যেটি সূর্যমুখীর কুঁড়ি।' সত্যিই রবি ঠাকুর যেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ছিলেন।
[caption id="attachment_2236237" align="aligncenter" width="600"]
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেবিকা রানি আর হিমাংশু রায় (পিছনে)[/caption]
পড়াশুনো, পিয়ানো বাজিয়ে গান গাওয়া, নাচের তালিম নেওয়া মেয়ের মন টানত বায়োস্কোপের দিকে। কিন্তু তখন চলচ্চিত্রে 'বারনারী' বা শুদ্রনারীদের রমরমা। কোন ভদ্রঘরের মেয়ের বায়োস্কোপের হিরোইন হবার কথা ভাবাও ছিল পাপবোধের।
তাই কিশোরী বয়সেই দেবিকারানি মুক্তির পথ খুঁজে নেন। ভারত থেকে পাড়ি দেন লন্ডনে। স্থাপত্যবিদ্যা ও ড্রামাটিক আর্টস পড়তে চলে যান লন্ডন। একজন একা মেয়ে ঐ বয়সে ভেবে নিলেন নিজের উপার্জনে বাঁচবেন। বর্ধিষ্ণু পরিবারের মেয়ে হয়েও শিল্পকে ভালোবেসেছিলেন তিনি, যা তখনকার ভারতীয় সমাজে ছিল প্রায় অশ্লীল কাজ। তাই টেক্সটাইল ডিজ়াইনিং শিখে ইংল্যান্ডের স্টুডিয়োয় কাজ নিলেন দেবিকা। সেখানেই স্টুডিওতে এক সুদর্শন ভদ্রলোকের সঙ্গে দেবিকার আলাপ। ‘দ্য লাইট অফ এশিয়া’ আর ‘সিরাজ়’ ছবির নায়ক ও প্রযোজক হিমাংশুনাথ রায় ওরফে হিমাংশু রায়। তিনি যেন দেবদূত হয়ে এলেন দেবিকার জীবনে।
[caption id="attachment_2236254" align="aligncenter" width="337"]
দেবিকা রানির জীবনে এলেন দেবদূত হিমাংশু রায়[/caption]
দুজনে জার্মানিতে গিয়ে চলচ্চিত্র বিষয়ক পড়াশুনো করেন।
‘আ থ্রো অব ডাইস’ চুম্বনের প্রথম পাঠের নির্বাক ছবিটিও এই হিমাংশু রায় অভিনীত ও প্রযোজিত, যেখানে তাঁর থেকে সেট ডিজাইন করা শিখেছিলেন দেবিকা রানি।
ছবির জগতে কাজ করতে করতে দেবিকা-হিমাংশু আরো ঘনিষ্ঠ হলেন। রোমিও, লেডি-কিলার খ্যাত হিমাংশু প্রথম স্ত্রী মেরি হেনলাইন ও শিশুকন্যা নীলিমাকে পরিত্যাগ করে দেবিকাতে ভেসে গেলেন এবং বিয়ে করলেন তাঁকে।
সিনেমার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এরপর ১৯৩৩ সালে ইংল্যান্ডে বসে হিমাংশু রায় তৈরী করলেন 'কর্ম' (Karma) ছবিটি। দ্বিভাষিক এই ছবিটি নিয়ে ইউরোপ জুড়ে রীতিমতো আলোড়ন তৈরী হয়। 'কর্ম' ছবিতে হিমাংশু রায় নায়ক আর দেবিকা রানি নায়িকা। ইংরেজিতে সে ছবি দেখে ধন্য ধন্য করেছে হলিউড।
জয়নগরের রাজার ভূমিকায় হিমাংশু রায় যে দাপট দেখাবেন, তা ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু সীতাপুরের রানির ভূমিকায় উনি কে? প্রথম বার দেবিকাকে রূপোলি পর্দায় দেখে বিদেশি পত্র-পত্রিকা প্রশংসায় পঞ্চমুখ হল! ‘ডিভা’, ‘ভারতের স্ক্রিন গডেস’ তকমা দেওয়া হল দেবিকাকে সেই যুগে। কেউ বললেন অজন্তার গুহাচিত্র, কেউ লিখলেন ভেলভেটের আঁখিপল্লব, কেউ বলে ফেললেন, দেবিকার আলোয় তো হিমাংশু রায় চাপা পড়ে গিয়েছেন।
ভারতেও এই ছবি মুক্তি পায়। হলিউডে যে ছবি প্রশংসিত হয়েছিল সেই ছবিতেই চার মিনিটের গভীর চুম্বন দৃশ্য দেখে চমকে ওঠেছিল ভারতবর্ষ। ভালোবাসার প্রকাশ যে প্রকাশ্যে এভাবেও হতে পারে তাও সেটা ভারতীয় এক মহিলার দ্বারা যা হজম করতে পারেনি ভারতীয় সমাজ। সেসময় পতিতা তকমাও দেওয়া হয় তাঁকে। কারণ তখন বারনারীরাই চলচ্চিত্র করতে যেত। সেখানে এক উচ্চবিত্ত রাবীন্দ্রিক ঘরানা থেকে আসা ইউরোপিয় শিক্ষায় শিক্ষিতা বনেদী পরিবারের মেয়ে দেবিকাকেও কটু তকমা পেতে হয়। ভারতবর্ষের প্রেক্ষাগৃহে 'কর্ম' ছবি দেখানো বন্ধ হওয়ার সামিল হয়।
'কর্ম' ছবি কিন্তু তারপরও সবাক চলচ্চিত্রে বিখ্যাত চুম্বনের তকমা পেয়ে গেল এবং ইতিহাস তৈরী করল।
https://youtu.be/RPDu0zu0gY8
'কর্ম' ছবিতে এই চুমুর দৃশ্য মোটেই লিপলক চুম্বন ছিল না। নায়ক-নায়িকার দুজনেই লিপ্ত হননি। কারণ এই চুম্বন ছিল আরো অনেক বেশী স্বর্গীয়। শাপভ্রষ্টা বেহুলা যেভাবে লক্ষীন্দরকে ফিরিয়ে এনেছিল সেভাবেই মৃতপ্রায় মহারাজকে চুম্বন দিয়ে যমের দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনছেন রানি। সেই চুম্বনে রয়েছে ভালোবাসার আকুতি, ঈশ্বরকে তুষ্ট করার পূজা। সেই চুম্বনকে সেন্সর বোর্ডের কাঁচি চালিয়ে দিলে মহাভুল হয়ে যেত।
[caption id="attachment_2236264" align="aligncenter" width="522"]
অপরূপা দেবিকা রানি[/caption]
সাপের বীণের দোলায় নায়িকার শরীরে জাগ্রত হচ্ছে আদিম রিপু। সে দৃশ্য যে নিপুণতায় অভিনেত্রী দেবিকা রানি ফুটিয়ে তুলেছেন, ঘুমন্ত মৃতপ্রায় হিমাংশুকে যেভাবে অভিনয়ের খাতিরে নিজের দেহলতাটি ব্যবহার করেছেন, তাকে বিশুদ্ধ শিল্প ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না। তার চেয়েও বড় কথা এই চুম্বনে একজন নারীর সক্রিয় ভূমিকা। যেখানে হিমাংশু রায় প্যাসিভ অ্যাক্টিং করেছেন। চুম্বনের রাশ রয়েছে দেবিকার ঠোঁটে। যা কম বৈপ্লবিক ছিল না।
তবে এই চুমু খেয়েছিলেন ওঁরা স্বামী-স্ত্রীকেই। কিন্তু সেটা ক্যামেরার সামনে প্রকাশ্যে কি ভাবতেও পারত তখন?
দেবিকা-হিমাংশুর ভালোবাসা যদিও পরবর্তীকালে টেঁকেনি। ঘর ভাঙে দুজনের। নতুন সংসারও করেন দেবিকা রানি।
কিন্তু 'কর্ম' র চুম্বন যুগে যুগে সমকালীন ... ওঁদের প্রেমের বহিঃপ্রকাশ ভারতীয় চলচ্চিত্রকে এক লহমায় সাবালক করে দেয়।
গা গরম চুম্বন দৃশ্য দেখতে আজও হল ভরায় দর্শকে অথচ সব কালিমা কলঙ্ককে জয় করে দেবিকার চুম্বন যেন ভারতীয় চলচ্চিত্রে দেবতার পূজা হয়ে গেল। চুমু যে কতটা পবিত্র তা বুঝিয়ে দিল এই চুম্বন।