শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
ছোট থেকেই পরোপকার তাঁর ব্রত। পরের উপকার করার জন্য তাঁর মন যেন ছটফট করত। যদি লোকের কাজে একটু লাগতে পারি, তাতে যদি লোকের একটু সুবিধে হয়! না নিজের নাম কিনতে নয়। একটা বালকের নিশ্চয়ই সেই নাম কেনার বোধ থাকে না। একেবারে ছেলেবেলা থেকেই পরোপকারী স্বভাব। সেই বালকই পরে হয়ে ওঠেন স্বর্ণযুগের কিংবদন্তী অভিনেতা জহর গঙ্গোপাধ্যায়। বাংলা ছবির বহু দর্শক তাঁকে মনে রেখেছেন আজও।
জহর গঙ্গোপাধ্যায়কে আমরা বাংলা ছবিতে বাবা-জ্যাঠার রোলেই দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু এককালে তিনি নায়ক রূপেও দাপিয়ে অভিনয় করেছেন। সেসব ছবির বেশিরভাগই চর্চা ও সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে। সে কারণেই এযুগের মানুষেরা জানেন না, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, মলিনা দেবী, ছায়া দেবীরা এককালে হিরো-হিরোইনের রোলেও সফলতার সঙ্গে হিট ছবি উপহার দিয়েছেন।
জহর গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯০৩ সালে, চব্বিশ পরগনা জেলার একটি অখ্যাত গ্রাম সেতপুরে। ছেলেবেলা থেকেই গোলগাল চেহারার জহর ছিলেন ভীষণ দুরন্ত। পড়াশোনা ভাল লাগত না। ভাল লাগত শুধু পরের উপকার করে বেড়াতে। কৈশোর থেকেই মানুষের বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন তিনি। বঙ্গবাসী কলেজ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে কলেজে পড়ার সময়ে তিনি আগ্রহী হন অভিনয়ে। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরে আর পড়াশোনা এগোল না। এদিকে পরোপকারের নেশা বেড়েই চলল।

বেকার জহরকে পরিবার থেকে শুরু করে পাড়ায় অবধি গঞ্জনা সহ্য করতে হত। গঞ্জনা সইতে না পেরে বিভিন্ন লোকদের ধরাধরি করে বেঙ্গল টেলিফোনে একটি লোয়ার ডিভিশন ক্লার্কের চাকরি জোগাড় করলেন তিনি। এই চাকরিসূত্রেই কলকাতায় বসবাস। কিন্তু মাইনে যা পেতেন তাতে কলকাতা শহরে বাসস্থান, অন্নসংস্থান করা যায় না। দেশ থেকে তাঁর ডাক্তার দাদা প্রতিমাসে দশ টাকা করে পাঠাতেন, তাই দিয়ে কোনও রকমে কলকাতায় থাকা-খাওয়া চলত।

রোজগার বাড়াতেই উপরি আয়ের আশায় জহর দশ টাকা মাইনের চাকরি নেন মিত্র থিয়েটারে। ১৯২৬ সালে এখানেই ' শ্রীদুর্গা ' নাটকে খুব ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করে সূত্রপাত হয় তাঁর অভিনয় জীবনের। কিন্তু অভিনয়ের অভিজ্ঞতা না থাকায় তাঁকে থিয়েটার কর্মীদের কাছে অপমানিতও হতে হত। শেষ পর্যন্ত স্টার থিয়েটারের প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা তুলসী চক্রবর্তীর কাছে নিজের বিড়ম্বনার কথা খুলে বললেন জহর গঙ্গোপাধ্যায়। তুলসী চক্রবর্তী জহরকে নিয়ে গেলেন বাংলা রঙ্গমঞ্চের প্রবাদপুরুষ অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কাছে, ১৯৩০ সালে। এই স্টার থিয়েটারের অপরেশচন্দ্রর ছত্রচ্ছায়ায় ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকল জহরের অভিনয় প্রতিভা।

অনেক ভাল চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ এল স্টার থিয়েটারে। তাঁর প্রথম জনপ্রিয়তা এল রবীন্দ্রনাথ মৈত্রের ' মানময়ী গার্লস স্কুল ' নাটকে অভিনয় করে। এর পরে একের পর এক মঞ্চ কাঁপানো নাটকে অভিনয় করে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর নাম। অর্থ, খ্যাতি, সম্মান সবই আসতে লাগল।
স্টার থিয়েটার ছাড়াও রঙমহল, শ্রীরঙ্গম, নাট্যনিকেতন, মিনার্ভা, কাশী বিশ্বনাথ মঞ্চ, বিশ্বরূপা, নাট্যভারতী-সহ সমস্ত থিয়েটারে নানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন জহর গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাটকের নাম হল মিশরকুমারী, তটিনীর বিচার, দুই পুরুষ, রামের সুমতি, সাজাহান, রাষ্ট্রবিপ্লব, গিরিশচন্দ্র, অ্যান্টনি কবিয়াল, মন্ত্রশক্তি, শ্যামলী, মাটির ঘর-- প্রভৃতি। জহর বাবুর শেষ মঞ্চাভিনয় নটী বিনোদিনী নাটকে।

নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও জহর গঙ্গোপাধ্যায় বড় নাম হয়ে উঠলেন। ১৯৩১ সালে জহরের প্রথম ফিল্মে অভিনয় নির্বাক ছবি 'গীতা'তে। এর পর এল সবাক ছবির যুগ। ১৯৩৪ সালে সবাক ছবি 'চাঁদ সদাগর'-এ ছোট ভূমিকায় অভিনয়। সেবছরই 'তুলসীদাস' ছবিতে বড় চরিত্র পান।
কিন্তু সেসব ছবিতে তাঁর নাম হয়নি। অবাক করা সমাপতন হল, মঞ্চের মতোই জহর গঙ্গোপাধ্যায়ের সিনেমায় খ্যাতি এল সেই 'মানময়ী গার্লস স্কুল' ছবিতে অভিনয় দিয়ে। এই ছবিতে নায়ক জহর এবং তাঁর বিপরীতে নায়িকা বাংলা ছবির প্রথম গ্ল্যামার গার্ল কাননবালা। জহর-কানন জুটি নিয়ে এত উন্মাদনা হয় যে হলে-হলে পর্দায় ওঁদের ছুঁতে দর্শকের ভিড় লেগে যেত। পরবর্তীকালে ১৯৫৮ সালে উত্তমকুমার-অরুন্ধতী মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে রিমেক হয় 'মানময়ী গার্লস স্কুল'। সেই ছবিতেও চরিত্রাভিনেতার রোলে অভিনয় করেন জহর গঙ্গোপাধ্যায়।
[caption id="attachment_2309443" align="aligncenter" width="443"]
'মানময়ী গার্লস স্কুল' ছবিতে জহর, মলিনা, উত্তম ও অরুন্ধতী।[/caption]
ফণী বর্মা পরিচালিত 'জনক নন্দিনী' ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৩৯ সালের ২৯ জানুয়ারি, রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহে। তাতে রাবণের ভূমিকায় দুরন্ত অভিনয় করেন জহর গঙ্গোপাধ্যায়।
উত্তম-সুচিত্রা জুটির প্রচুর ছবিতে বাবার রোলেও দেখা মেলে জহর গঙ্গোপাধ্যায়ের।
সুচিত্রা সেন তাঁর প্রথম রিলিজড ছবি 'সাত নম্বর কয়েদী' থেকেই জহর গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে অভিনয় করেছেন।
জহর গঙ্গোপাধ্যায় অভিনীত বিখ্যাত ছবি গুলি হল, মন্ত্র শক্তি (১৯৫৪), যক্ষের ধন (১৯৩৯),
কবি জয়দেব (১৯৪১), দুই পুরুষ (১৯৪৫), খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন (১৯৬০), ত্রিযামা (১৯৫৬), সাহেব বিবি গোলাম (১৯৫৬), নির্জন সৈকতে (১৯৬৩) প্রভৃতি। সত্যজিৎ রায়ের 'পরশ পাথর' ও 'চিড়িয়াখানা'তেও অভিনয় করেছিলেন তিনি।
[caption id="attachment_2309437" align="alignnone" width="504"]
'পুর্নমিলন' ছবিতে জহর,উত্তম ও মঞ্জু দে।[/caption]
রাজনীতির সঙ্গেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। মোহনবাগান ক্লাবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত জহর গঙ্গোপাধ্যায় মোহনবাগান ক্লাবের হকি টিমের সেক্রেটারি ছিলেন। খেলার মাঠ আর টালিগঞ্জ স্টুডিওপাড়া মিলিয়ে অনেক খেলার ম্যাচ থেকে উৎসবের আয়োজন করেছেন জহর বাবু।
[caption id="attachment_2309447" align="alignnone" width="490"]
চিড়িয়াখানা ছবিতে ব্যোমকেশ উত্তমের সাথে রমেন মল্লিক চরিত্রে জহর গাঙ্গুলি।[/caption]
১৯৬৯ সালের ৭ জুন মঞ্চ ও চলচ্চিত্র জগতের নট জহর গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনাবসান হয়।
কালের স্রোতে জহর গঙ্গোপাধ্যায় কখনই সেভাবে চর্চায় আসেননি। কিন্তু সম্প্রতি আবার জহর গঙ্গোপাধ্যায় খবরের শিরোনামে চলে এলেন। মানুষ খোঁজ নিলেন, 'জহরদা কি বাড়ি আছেন?'
কয়েকমাস আগেই ভোটের সময় যখন নির্বাচনী প্রচার তুঙ্গে, তখন প্রয়াত অভিনেতা জহর গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি হাজির হন কিছু বিজেপি দলের কর্মী এবং বেশ জোরে সমস্বরে হাঁকডাক করতে থাকেন ‘জহরদা কি বাড়ি আছেন!’ ডাকাডাকি শোনেন জহর গঙ্গোপাধ্যায়ের নাতনি সুজাতা খাস্তগীর। ঠাকুরদা চলে গিয়েছেন তাঁর ছ’বছর বয়সে। এরপর কেটেছে দীর্ঘ পাঁচটি দশক। তাই নীচ থেকে হাঁকডাক শুনে প্রথমটা থমকে গিয়েছিলেন সুজাতাদেবী। তার পর ফের কান খাড়া করে শোনেন! এ তো ভ্রম নয়, সত্যি!
ডোভার লেনে তাঁদের পৈতৃক বাড়িতেই থাকেন সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ‘আর্ট টিচার’ সুজাতাদেবী। ১৯৬৯-এ প্রয়াত হওয়ার আগে তাঁর পিতামহ ওই বাড়িতেই থাকতেন।
সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় সুজাতা দেবী ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, জহরবাবুকে কিছুতেই ফোনে পাচ্ছেন না তাঁরা। তাই বাড়িতে এসে হাজির। সুজাতা দেবী একবার জানতে চান, কোন জহরবাবুকে ওঁরা খুঁজছেন। ‘জহর গাঙ্গুলি’ লেখা কার্ডটা বাড়িয়ে দেন ওঁরা। বিজেপির পদ্মফুলের ছাপ তাতে। ৬৯ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপির সহ-সভাপতি কৌশল কুমার মিশ্রের নামে লেখা আমন্ত্রণপত্রে অনুরোধ শুক্রবার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর জন্মদিনে রক্তদান শিবিরে ‘জহর গাঙ্গুলি মশাই’কে থাকতেই হবে।
সুজাতা দেবী আর কথা বাড়াননি। ভুল ঠিকানা বলে পত্রপাঠ বিদায় দেন তাঁদের। কিন্তু এমন ঘটনা জানাজানি হতেই খবরে চলে আসেন জহর গাঙ্গুলি ও তাঁর পরিবার। প্রশ্ন ওঠে সাধারণ মানুষের অজ্ঞানতা নিয়ে। এটাই নির্মম সত্যি। এযুগের বহু বাঙালির কাছেও জহর গাঙ্গুলি এক বিস্মৃত নাম। একসময়ের কিংবদন্তী নট জহর গঙ্গোপাধ্যায়কে কেউই আজ আর মনে রাখেননি।