
শেষ আপডেট: 14 June 2021 07:52
প্রথমে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সদস্য ছিলেন সবিতা। পরে বম্বে ইয়ুথ কয়্যারে গান গাইতে এসে আলাপ সলিল চৌধুরীর সঙ্গে। সেখান থেকে প্রেম, তারপর বিয়ে। তবে শুধু সুরকার সলিল চৌধুরীর স্ত্রী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না সবিতা। গায়িকা হিসেবে সঙ্গীতজগতে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন তিনি। রান্না করতে করতে, বাচ্চাদের পড়ানোর মাঝেই নিজের গান তুলে নিতেন সবিতা। ‘ঝিলমিল ঝাউয়ের বনে ঝিকিমিকি’ সবিতা চৌধুরীর গাওয়া গান এত সুপারহিট হয় যে এইচ এম ভি সবিতার ছবি দিয়ে রেকর্ড বার করে সেই গানের। বলিউডেও প্রচুর গান তাঁর প্লেব্যাকে জনপ্রিয়।
https://youtu.be/EAZbohDA1Is
সলিল-সবিতার চার সন্তান, অন্তরা, সঞ্চারী, সুকান্ত ও সঞ্জয়। ২০১৭ সালের ২৮ জুন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন সবিতা চৌধুরী।
সবিতা চৌধুরী গান শেখানোর ব্যাপারে ছিলেন ভীষণভাবে কড়া। বলতেন, গানটা আগে ভালো করে শোনো, গানের অর্থ বুঝে গাও। বিশেষ করে ছোটদের গান সলিল চৌধুরীর কথায় সুরে অন্তরা চৌধুরীর কণ্ঠেই বাঙালি আজীবন শুনেছে। আজও অন্তরা চৌধুরীর সেইসব ছোটদের গান শুনেই বাচ্চারা ভাত খায়, ঘুমোতে যায়। সেসব গান কী ভোলার! 'ও সোনা ব্যাঙ', 'এক যে ছিল মাছি' বা অন্তরার আইকনিক 'বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে'।
https://youtu.be/KPMP15qDSE8
অন্তরার গানের জগতে আসা বাবা সলিল চৌধুরীর হাত ধরে হলেও মেয়ে যে গান পারে সেটা সলিল চৌধুরীকে দেখান সবিতা চৌধুরী। অন্তরা ছোটবেলায় পুতুল নিয়ে যখন খেলতেন তখন খেলার ছলেই লতা মঙ্গেশকরের কঠিন কঠিন গানগুলো গেয়ে চলতেন ঐ কচি বয়সে। মেয়ের এই খেলার ছলে গান তুলে নেবার ক্ষমতা খেয়াল করেন সবিতা চৌধুরী। লতাজীর গানগুলো যে অন্তরাকে শেখানো হয়েছিল তাও নয়। রেকর্ডে রেডিওতে শুনে বাবার গান তৈরি শুনে অন্তরা এসব গান তুলে ফেলত অনায়াসে।
এমনই একদিন 'মিনু' হিন্দি ছবির গানে সুর দিচ্ছেন সলিল চৌধুরী। তো বাচ্চার লিপে গান আছে একজন প্লে-ব্যাক শিল্পী চাই। সবিতা সলিলকে বললেন "বাচ্চার লিপে যখন গান বাচ্চাকে দিয়েই গাওয়াও"। সলিল চৌধুরী বললেন "এখন বাচ্চা আবার কোথায় পাব?" সবিতা বললেন "কেন তোমার ঘরেই তো গান জানা বাচ্চা আছে।"
সলিল চৌধুরী এতদিন ব্যস্ততায় খেয়ালই করেননি অন্তরার গান। তাছাড়া ছোটবেলায় অন্তরা কিছুদিন হোস্টেলেও থাকতেন। হোস্টেল থেকে মেয়ে ফিরতে সবিতা চৌধুরী সলিল চৌধুরীর সামনে অন্তরাকে ডেকে বললেন "একটা গান শোনাও তো"। সলিল চৌধুরী বিস্মিত হয়ে বললেন "ও তো মন্দ গায়না"! তবে তখনই মেয়েকে ফাইনাল করেননি সলিল চৌধুরী। স্টুডিওতে মেয়েকে নিয়ে গিয়ে অডিশন নিয়েছিলেন আর অন্তরা অডিশনে গাইলেন সলিল-সুরে লতাজীর 'ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক খুঁজে পেলাম'।
[caption id="attachment_2313257" align="aligncenter" width="381"]
'মিনু' ছবিতে গান রেকর্ডিং এর সময়[/caption]
সলিল চৌধুরী বললেন "ওকে দিয়েই প্লে ব্যাক করাবো 'মিনু' ছবিতে"। সেই শুরু সাত বছরের বেবি অন্তরার ছোটদের গান গাওয়া। তারপর তো অন্তরার গান ছোটদের দুধে-ভাতে-সন্দেশে মিশে গেল ঘরে ঘরে।
'সিস্টার' ছবিতে সবিতা চৌধুরীর আইকনিক হিট গান 'বিশ্বপিতা তুমি এ হে প্রভু' গানে অন্তরাও কোরাসে ছোটদের গলায় গেয়েছিলেন।
মেয়ে সঞ্চারীও গানে গিটারে তুখোড়। সলিল-পুত্র আবহ সঙ্গীতে মাস্টার মিউজিশিয়ান।
অথচ আজকালকার ছোটরা যেন ছোটোবয়সেই অনেক বেশি বড়। তাই কি আজকাল আর ছোটদের জন্য গান তৈরি হয়না! নাকি ছোটদের ছোটোবেলাটা কেড়ে নিচ্ছেন তাঁর বাবা মায়েরাই নিজেদের না হওয়া স্বপ্নপূরণ করতে?
https://youtu.be/KeManfVYaag
সবিতা চৌধুরী স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন আজকাল ছোটোদের গান তৈরি না হবার কারণ। যে কথাগুলো ভীষণ ভাবে শিক্ষণীয়। বাবা মা তথা এযুগের মিডিয়া টেলিভিশন মাধ্যমের জানা উচিত ছোটদেরকে ছোটদের মতোই থাকতে দেওয়া উচিত। তাঁদের উপর বড়দের ভাবনা চাপিয়ে সেটা উপস্থাপন করার কোন দরকার নেই।
সবিতা চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন "চিলড্রেন নাম্বার এখন হচ্ছে কোথায়! হওয়া উচিত সবাই বলে কিন্তু উচিতটা কে মানছে? বাচ্চারা এখন বাচ্চা নেই। বাচ্চারা এখন বুড়ো হয়ে গেছে। আজকাল বিভিন্ন রিয়্যালিটি শো থেকে বাবা মায়েরাও বাচ্চাদের শৈশব নষ্ট করে দিচ্ছেন। বাচ্চাদের মুখে বড় বড় বাতেলা। বাচ্চাদের দিয়ে আজকাল আইটেম সং গাওয়ানো হচ্ছে। বাচ্চাদের মুখে চটুল গান দেখে মা বাবারা খুশি। কিন্তু এটা মা বাবার দায়িত্ব তাঁদের বাচ্চাকে কোনদিকে নিয়ে যেতে হবে। কোন ধরনের গান শেখানো উচিত। যদিও এখনকার বাচ্চারা খুব ট্যালেন্টেড,খুব স্মার্ট কিন্তু তারা দিকভ্রষ্ট। বাচ্চার বাচ্চার মতো থাকা উচিত। বাচ্চাদের আগে বেসিক জিনিসগুলো শেখানো দরকার। না শিখিয়ে দুটো ফিল্মি গান তুলিয়ে দিয়ে বাচ্চাদের রিয়্যালিটি শোয়ের স্টেজে পাঠিয়ে দিলাম, এটা ঠিক না। শো বাণিজ্যিক মোড়কে করতে বিচারকেরা বা প্রোগাম অথরিটিরা বাচ্চাদের আইটেম সং গাইতে বলছেন এবং তারপর জাজ করে বলছেন বাচ্চাটির গানে এক্সপ্রেশন আসছে না। কী করে তারা বলে এটা? একটা আট বছরের বাচ্চা কি বোঝে আইটেম সঙের মানে, যে সে সেটা বুঝে গাইবে? এগুলো বাচ্চাদের দিয়ে গাওয়ানো তো অপরাধ। বাচ্চাটা জানেই না মানে। পাখির মতো গেয়ে গেল। এভাবে ছোটদের শৈশব নষ্ট করা বন্ধ করুন অভিভাবকদের জোড়হাত করে বলছি। বাচ্চাদের রেসের ঘোড়া বানিয়ে তাঁদের ছেলেবেলা নষ্ট করবেন না। এই কারণেই ছোটরা ছোটদের গান শোনেনা। তাই আজকাল হয়না ছোটদের গান।"
সম্প্রতি অন্তরা চৌধুরী ও তাঁদের পরিবারের উদ্যোগে 'সলিল চৌধুরী মিউজিক ট্রাস্ট' প্রতিষ্ঠানে ছোটদের সলিল-সঙ্গীত ও ক্লাসিকাল গানের তালিম দেওয়া হচ্ছে। একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে চাইছেন অন্তরা।
[caption id="attachment_2313268" align="aligncenter" width="600"]
অন্তরা ও তাঁর স্বামী তীর্থঙ্কর, সলিল-সঙ্গীত শিক্ষাকেন্দ্রে[/caption]
এখনকার ছোটরা যদি অন্তরা চৌধুরীর ছোটদের গানগুলোই শোনে তাহলেও অনেক সঙ্গীতের তালিম পাবে তাঁরা। সলিল চৌধুরীর মতো জিনিয়াস আর হবেনা কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকে যদি ছোটদের মধ্যে সঞ্চারিত করা যায় তাহলে ছোটরা একটা সুন্দর শৈশব উপহার পাবে।