শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
২০০১ সালের ১৫ জুন মুক্তি পেয়েছিল ঐতিহাসিক ছবি ‘লগান’। ২০ বছর বয়স হল আজ 'লগান' ছবির। কিন্তু এই ছবি নিয়ে উন্মাদনা আজও এতটুকু হ্রাস পায়নি। ভারতীয়দের কাছে ক্রিকেট চিরকালই প্যাশনের খেলা। আর সেই ক্রিকেট যদি ভূমিপুত্রদের বাঁচার লড়াই হয়ে দাঁড়ায়, তা হলে তো কথাই নেই। আশুতোষ গোয়ারিকরের 'লগান' ছবির গল্প এই ক্রিকেটকে অবলম্বন করেই। লগানে আমির খানের ব্যাটের জাদুতেই নাস্তানাবুদ হতে হয়েছিল ব্রিটিশ শক্তিকে। ইংরেজদের আধিপত্য তো ভেঙে পড়েই, সেই সঙ্গে ছবিটিও অস্কারের মনোনয়ন পেয়ে যায়। একটি ভারতীয় বাণিজ্যিক ছবির অস্কারে মনোনয়ন নিয়ে সাড়া পড়ে যায় বিশ্বে।
'লগান' ছবির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জেনে নেওয়া যাক এই ছবি নিয়ে ১০টি অজানা তথ্য।
১. ফস্কে গেল অস্কার
১৯৫৭ সালে নার্গিস অভিনীত ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ছবিটি ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পায়। ১৯৮৮ সালে মীরা নায়ার পরিচালিত ‘সালাম বম্বে’ ছবিটি দ্বিতীয় ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসাবে অস্কার মনোনয়ন লাভ করে। তৃতীয় ভারতীয় ছবি হিসেবে অস্কার মনোনয়ন লাভ করে 'লগান'। তবে তিন-তিন বার মনোনয়ন পেলেও এখন পর্যন্ত কোনও ভারতীয় ছবি অস্কার জিতে নিতে পারেনি।
তবে প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্রকার হিসেবে সত্যজিৎ রায় বিশ্ব চলচ্চিত্রের সব চেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ‘অস্কার’ জিতে নেন। পরিচালনা-সহ চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯১ সালে অস্কার কমিটি তাঁকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দেয়।
২. গানেই বাজিমাত
'লগান' ছবিতে অনেক গান থাকার কারণেই অস্কার জয়ী হতে পারেনি ছবিটি, এমনটাই মনে করা হয় আজও। কিন্তু এআর রহমানের গান ছাড়া কি 'লগান'কে ভাবা যায়? পুরস্কারই তো সব নয়! এ ছবির চিত্রনাট্য, পরিচালনা, অভিনয় এবং সঙ্গীত চিরকাল ভারতীয় চলচ্চিত্রের শীর্ষ আসনে থাকবে।
https://youtu.be/qNnvL0ztJhA
৩. আমির অভিনয় করুন, চাইত না পরিবার
আমিরের বাবা তাহির হুসেন ছিলেন চলচ্চিত্র প্রযোজক। তবে তাঁর সংস্থায় তৈরি ছবি বক্স অফিসে লাভের মুখ দেখেনি। সেজন্যেই পরিবারের থেকে কেউ চাইতেন না, আমিরও ইন্ডাস্ট্রিতেই কাজ করুক। তাঁর বাবা-মা চাইতেন ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হোক। কিন্তু সেই নায়ক আমিরের ছবিই অস্কারে গেল।
৪. লগান ফিরিয়ে দেন আমির
আশুতোষ গোয়ারিকর যখন 'লগান' ছবির প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন,শুরুতেই না বলে দেন আমির খান। ক্রিকেট আর ইতিহাস—এই দুই নিয়ে বলিউডে ছবি করা মানে বক্সঅফিসে নিশ্চিত ফ্লপ। কিন্তু আশুতোষের চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত ছবির পুরো গল্প শোনেন আমির। মোট ছ'বার শোনার পরেও রাজি হননি, শেষে সাত বারে এসে ছবিতে অভিনয় করতে রাজি হন তিনি। শুধু অভিনয় করতেই রাজি হননি, আমির প্রথমবারের মতো প্রযোজনাও করেছিলেন। তারপর? বাকিটা ইতিহাস!
৫. গ্রেসির আত্মপ্রকাশ বাংলা ছবিতেই
গ্রেসি সিং, 'লগান' ছবিতে আমির খানের নায়িকা রূপেই প্রথম বিশাল লাইমলাইটে চলে আসেন। তবে এই গ্রেসির চলচ্চিত্রে প্রবেশ কিন্তু বাংলা ছবির হাত ধরেই। ক্ল্যাসিক্যাল নাচের তালিমপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী গ্রেসি 'সুন্দর বউ' ছবিতে ডেবিউ করেন দেবশ্রী রায়ের এক বোনের চরিত্রে। ছবির পরিচালক ছিলেন সুজিত গুহ। যদিও ছবিতে খুব অল্প ছিল গ্রেসির উপস্থিতি। একটি বিয়ের আসরে স্পেশাল ডান্স দৃশ্যে গ্রেসির ঠোঁটে অলকা ইয়াগনিকের গাওয়া "উলু দে উলু দে তোরা" জনপ্রিয় গান ছিল।

এরপর ‘আমানত’ নামের একটি হিন্দি ধারাবাহিকে তিনি প্রথম নজর কাড়েন। তার পর ২০০১ সালে অডিশন দেন ‘লগান’ ছবির জন্য। তারপর তো প্রথম সারির নায়িকার আসনে গ্রেসি। এরপর সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ও হয় সুপারহিট। ‘আরমান’, ‘গঙ্গাজল’ও মনে দাগ কেটেছিল দর্শকদের। তবে আমির খান, সঞ্জয় দত্ত, অনিল কাপুরদের মত নায়কদের নায়িকা হয়েও প্রথম সারির নায়িকার আসন বলিউডে বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি গ্রেসি। বর্তমানে 'সন্তোষী মা' টেলিভিশন সিরিজে নামভূমিকায় কাজ করেছেন গ্রেসি।
৬. প্রথম স্ত্রী রিনার অনেক অবদান, দ্বিতীয় স্ত্রী কিরণের সঙ্গে সম্পর্কও এই ছবিতেই
আমিরের এই ছবিই করাই হতনা যদি না তাঁর প্রথম স্ত্রী রিনা দত্ত পাশে থাকতেন। এই ছবিতে রিনা অনেকটাই টাকা ঢেলেছিলেন স্বামীর জন্য এবং ফিল্মের টেকনিক্যাল দিকগুলো নিয়েও রিনা পড়াশুনো করেন তখন। রিনা আজ আমিরের জীবনে প্রাক্তন, তবু ঋণস্বীকার করেন আমির। আবার 'লগান'-এর সময়েই একসঙ্গে কাজের দৌলতে আমির কিরণ রাওয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে শুরু করেন। 'লগান' ছবি তাঁদের সম্পর্কের ভাঙা গড়ায় কী অদ্ভুত সমাপতন।

৭. বিদেশিনি র্যাচেল শেলি আজ লেখিকা
আমির, গ্রেসির পাশাপাশি আনকোরা নতুন মুখ হিসাবে নজর কেড়েছিলেন র্যাচেল শেলি। রিল লাইফের এলিজাবেথ রাসেল। গ্রাম্য যুবক ভুবনের প্রেমে পড়েছিলেন যে বিদেশিনী। ১৯৯৪-এ প্রথম অভিনয় জগতে পা রেখেছিলেন র্যাচেল। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর অভিনীত ‘দ্য এল ওয়ার্ড’-এর হেলেনা পিবডি-র চরিত্র আজও দর্শকের মনে রয়ে গিয়েছে। টানা দু’দশকের সফল অভিনয় জীবনের পর বর্তমানে ফিল্ম দুনিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন র্যাচেল। তিনি লেখিকা হিসেবেও খুব নাম করেছেন। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ ও ‘ডিভা ম্যাগাজিন’-এ নিয়মিত লেখেন। বর্তমানে স্বামী ম্যাথু পার্খিল ও একমাত্র মেয়ের সঙ্গে লন্ডনেই থাকেন র্যাচেল শেলি।
৮. একে হাঙ্গলকে এই ছবিতেই চিনেছিল এই প্রজন্ম
লগানের অন্যতম চরিত্র অভিনেতা রঘুবীর যাদবের অস্কার কানেকশনের শুরুটা মীরা নায়ার পরিচালিত ‘সালাম বম্বে’ দিয়ে। তারপর শেখর কপূরের ‘ব্যান্ডিট কুইন’। এর পর ‘রুদালি’, ‘১৯৪৭ আর্থ’, ‘লগান’, ‘পিপলি লাইভ’, ‘ওয়াটার’-- পরের পর ছবি অস্কারে পাঠানো হয়েছে। যদিও সব মনোনয়ন পায়নি। কিন্তু রঘুবীর যাদবের মতো অভিনেতা বিদেশে জন্মালে অস্কার পেতেন। এছাড়াও 'শোলে', 'গুড্ডি', 'কোরা কাগজ', 'আঁধি' ছবির বর্ষীয়ান অভিনেতা একে হাঙ্গল বহদিন বিরতির পরে 'লগান' দিয়েই আবার ছবির জগতে ফিরেছিলেন। এ ছবি নবীন প্রজন্মের কাছে একে হাঙ্গলকে নতুন রূপে এনেছিল।

৯. সর্বাধিক ব্রিটিশ অভিনেতা
হিন্দি ছবিতে অনেক বিট্রিশ অভিনেতাই কাজ করেছেন। কিন্তু কোন হিন্দি ছবিতে একসঙ্গে সর্বাধিক বিট্রিশ অভিনেতা ছিলেন? উত্তর 'লগান'।
১০. অস্কারে মনোনয়ন পাওয়াও মুখের কথা নয়
লগান 'অস্কার' এ মনোনীত হয়েও অস্কার পেতে পারেনি। এই প্রসঙ্গে আমির খান বলেন 'আমাকে মাঝে মাঝেই জিজ্ঞেস করা হয়, অস্কার না পেয়ে আপনার মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল? আমি খুবই হতাশ হয়েছিলাম। আমি জিতলে খুশি হতাম। অনেকেই বলেন, গান ও সেগুলির দৈর্ঘ্যই কি অ্যাকাডেমিতে না জেতার কারণ? তবে বিষয়টা হল ছবিটা মনোনয়ন পেয়েছিল এবং প্রথম পাঁচের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছিল। এতেই বোঝা যায় সদস্যদের ছবিটা ভাল লেগেছিল। মনোনয়ন পাওয়াটা একেবারেই মুখের কথা নয় এবং অস্কারে মনোনয়নের ফলে এই ছবিটা আরও বহু মানুষের কাছে পৌঁছেছিল।