
শেষ আপডেট: 19 January 2024 18:18
শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা ছবির সম্পদ,বাঙালির গর্ব। নায়ক রূপে সৌমিত্র যেমন অদ্বিতীয় তেমন চরিত্রাভিনেতা হিসেবেও তিনি বাংলা ছবিকে পথ দেখিয়েছেন। টলি ইন্ডাস্ট্রির অভিভাবক ছিলেন তিনি। বাংলা ছবিকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়।
তবে সবসময় তাঁর প্রথম চয়েস ছিল বাংলা ছবি। কিন্তু বলিউডে কাজ করার অফার বিখ্যাত সব পরিচালকের কাছ থেকে বারবার এসেছে। বড় বড় বলিউড পরিচালক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে ব্ল্যাঙ্ক চেক রেখে গেলেও সেসব অফার গ্রহণ করেননি তিনি। যদিও এর পিছনে আরও একটি কারণ রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। যতবারই হিন্দি ছবির অফার সৌমিত্রর কাছে এসেছে সব গুলিই ছিল সহ অভিনেতার চরিত্র। নায়কের চরিত্র না হওয়ায় তিনি টলিউডের রাজার আসন ছেড়ে বলিউডের পার্শ্বঅভিনেতা হতে চাননি।
বলিউডে কখনও কাজ করেননি বাংলার এই বিখ্যাত অভিনেতা। তাই হিন্দি ছবিতে কাজ করলে কেমন হতো সে ছবি তা অজানাই থেকে গেছে।
অনেকেই জানেন না কোন তিন জন বিখ্যাত বলিউড পরিচালকের তিনটি হিন্দি ছবি ছেড়ে দিয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সেই ছবিগুলো রিলিজের পর বিশাল হিট করেছিল। ক্লাসিক তকমাও পায় প্রথম ছবিটি।
হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় 'আনন্দ' ছবির ডাক্তারের চরিত্রটি অফার করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। ডঃ ভাস্কর ব্যানার্জির আইকনিক চরিত্রের অফার গেছিল সৌমিত্রর কাছে। সেসময় হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়কে 'না' বলেছিলেন সৌমিত্র।
কারণ আনন্দ এর শ্যুটিং ডেট সৌমিত্রর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলা ছবির শ্যুটিং ডেটের সঙ্গে ক্ল্যাশ করছিল। চুক্তিবদ্ধ বাংলা ছবি ছেড়ে 'আনন্দ' করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলনা। যদিও হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের 'আনন্দ' ছেড়ে দেওয়ার জন্য দুঃখ পেয়েছিলেন সৌমিত্র। পরে ডাঃ ভাস্কর ব্যানার্জির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন। ১৯৭১ সালে আনন্দ রিলিজ করতেই ছবি সুপার ডুপার হিট। ভাগ্য ঘুরে যায় নবাগত অমিতাভ বচ্চনের। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য 'আনন্দ' ছবি হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় প্রথম ভেবেছিলেন রাজ কাপুর ও উত্তমকুমার কে ভেবে। তখন ছবির নাম ছিল 'আনন্দ সংবাদ'।
পরবর্তী যে ছবি ছেড়ে দেন সৌমিত্র সেটি হল শ্যাম বেনেগলের 'কলিযুগ'। মহাভারতের আধুনিক রূপ নিয়ে ১৯৮১ সালে কলিযুগ সিনেমাটি তৈরি করেছিলেন শ্যাম বেনেগল। এই ছবির প্রযোজক ছিলেন শশী কাপুর। শশী কাপুরের খুব ভাল বন্ধু ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। শশী এই ছবিতে কর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। যুধিষ্ঠিরের চরিত্রটি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে করতে বলেন শশী।
এটিও হতে পারত সৌমিত্রর প্রথম হিন্দি ছবি। রেখার বিপরীতে তাহলে কাজ করতেন সৌমিত্র। কিন্তু প্রথম হিন্দি ছবি হিসেবে যুধিষ্ঠিরের চরিত্রটি শক্তিশালী মনে হয়নি সৌমিত্রর। বলিউড ডেবিউ চরিত্র হিসেবে দুর্বল চরিত্র করতে রাজি হননি সৌমিত্র। শশী আর সৌমিত্র দুজন দুজনের পেশাগত জীবনকে সম্মান করতেন। তাই সৌমিত্র ছবিটি না করলেও শশীর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব অটুট ছিল। যুধিষ্ঠিরের চরিত্রটি শেষ অবধি করেছিলেন রাজ বব্বর। বাঙালি অভিনেতা ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছবিটিতে ছিলেন।
শেষ যে হিন্দি ছবির অফার সৌমিত্র ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তা হল অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীর 'পিঙ্ক'। পিঙ্ক ছবির প্রধান অভিনেতা ছিলেন অমিতাভ বচ্চন। এই ছবিতে একটি বিচারকের চরিত্র সৌমিত্রকে অফার করেন অনিরুদ্ধ। কিন্তু এই সাধারণ চরিত্রটি করে বলিউড ইতিহাসে নিজের নাম জুড়তে চাননি সৌমিত্র। সৌমিত্রর মনে হয়েছিল এই বিচারকের চরিত্রটিতে অভিনযয়ের তেমন সুযোগ নেই। চরিত্রটি করছিলেন ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়।২০১৬ সালের বাণিজ্যসফল ছবি 'পিঙ্ক'। সমালোচক মহলেও উচ্চপ্রশংসিত হয় ছবিটি। আসলে পছন্দ মতোগুরুত্বপূর্ণ চরিত্র না পাওয়ায় সৌমিত্রর মন সায় দেয়নি।তাই বলিউডে পা রাখাও হয়ে ওঠেনি তাঁর।
১৯৮৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'দেনা পাওনা' ছোট গল্প অবলম্বনে 'নিরুপমা' হিন্দি টেলিফিল্ম করেছিলেন সৌমিত্র। এটা দূরদর্শনের জন্য তৈরি হয়েছিল। রামসুন্দরের চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর নিরুপমার চরিত্রে ছিলেন নবাগতা রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। এই প্রবাদপ্রতিম অভিনেতার এটাই একমাত্র হিন্দি ফিল্মের কাজ।