
শেষ আপডেট: 6 April 2023 10:39
অগ্নিপরীক্ষা, খেলা, আয় তবে সহচরী-- একাধিক সিরিয়ালের ব্যস্ততম অভিনেত্রী সোনালী চৌধুরী (Sonali Chowdhury)। রিয়্যালিটি শোগুলিতেও সোনালী বেশ জনপ্রিয় মুখ। কিন্তু কাজের পাশাপাশি সোনালী ঘরটাকেও আগলে রাখেন। একদিকে বাপের বাড়ি অন্যদিকে ফুটবলার বর রজত আর ছোট্ট ছেলের প্রতি সমান দায়িত্বশীল সোনালী। সোনালীর রক্তে বইছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল আবেগ। আর এই বাঙালি সংস্কৃতির মাধুর্য নিয়েই সোনালীর মেয়েবেলা থেকে বেড়ে ওঠা। বাংলা ভাষার ওপর সোনালীর ভালবাসা তাঁর মায়ের হাত ধরে। পয়লা বৈশাখের দিনে ছোটবেলার গল্প বলতে বসলেন সোনালী চৌধুরী (Sonali Chowdhury)। শুনলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
নববর্ষ নস্টালজিয়া বলতে প্রথমেই মনে পড়ে, আমি পয়লা বৈশাখের বিকেলে মায়ের সঙ্গে পাড়ার সোনার দোকানে যেতাম। কোনও বড় নামী দোকান নয়, একদম পাড়ার স্থানীয় সোনার দোকান এবং সেখানে প্রতিবার যাবই। সেখানে মা কোনও একটা গয়নার জন্য কিছু টাকা দিয়ে বুকিং করতেন। আর আমি যে জন্য যেতাম, ওখানে গেলেই কোল্ডড্রিংক দিত। তখন আমি অনেক ছোট, কিন্তু জানতাম নববর্ষের বিকেলে ওই দোকানে গেলে কোল্ডড্রিংক পাবই। ছোট ছিলাম, তাই অরেঞ্জ ফ্যানটা ধরিয়ে দেওয়া হত আমাকে। ফ্যান্টা আবার পরের দিকে ফ্রুটি হয়ে গেল।
আমরা যেহেতু এদেশী, পয়লা বৈশাখে আমাদের বাড়িতে লুচি আর পাঁঠার মাংস হয়। কেন হয়? কারণ মনে করা হয়, প্রথম দিন এমন খেলে সারা বছর খুব ভাল খাওয়া-দাওয়াতে আমরা থাকব।

আমার মা যেহেতু বাংলা ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাই বাংলা ক্যালেন্ডারের উপর মায়ের খুব আগ্রহ। দোকানে যাওয়া মানেই বাংলা ক্যালেন্ডার পাওয়া। এখনও মা আমাকে বলে, 'এই শোন, তুই আমাকে একটা বাংলা ক্যালেন্ডার এনে দিবি।' আর একটা জিনিস হল পঞ্জিকা। আমাদের বাড়িতে নিয়ম করে পঞ্জিকা আসে। এবারও একটা পঞ্জিকা আসবে।
নতুন কিছু বলতে নতুন জামা তো হতই। সাধারণ সুতির জামা। সেটা পরে বিকেলবেলা বেরোতাম। হালখাতাটা আমার ভীষণ ভাল লাগত, সেটা সত্যি খুব মিস করি। আর সঙ্গে মিষ্টির প্যাকেট। এখনকার বাচ্চারা জানলই না হালখাতা কাকে বলে।
আজকাল বাঙালিরা ধনতেরসে সোনা কেনে, কিন্তু পয়লা বৈশাখে সোনা কেনার ব্যাপারটা হারিয়েই গেছে। এখনও মনে আছে, আমার মা পয়লা বৈশাখে কিছু একটা টাকা দিয়ে একটা সোনার গয়না বুক করে আসত। সে একটা কানের দুল হোক, আংটি হোক, লকেট হোক, কিছু না কিছু একটা কেনা হবেই। পরে মাসে মাসে টাকা দিয়ে গয়নাটা কেনা হত। সোনা বিক্রেতারও এই দিনটার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন।

অভিনয় তো অনেকদিনই করছি। সবাই আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ক্যামেরার সামনে প্রথম দিন দাঁড়াতে ভয় করেছিল কিনা! না আমি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কোনওদিন ভয়ে কাঁপিনি। মনেই হয়নি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কারণ ছোট থেকেই আমি পাড়ায় রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীতে পারফর্ম করতাম, বা পাশের পাড়ায় নাচের অনুষ্ঠানে যেতাম। তাই ভয়টা কেটে গেছিল। আগে তো বৈশাখ মাস পড়ল মানেই পাড়ায়-পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠান, এক মাস ধরে তার মহড়া কত কিছু। একজন কাকিমা ছিলেন আমাদের, যিনি পাড়ার সব মেয়েদের নিয়ে ফাংশনের ব্যবস্থা করতেন। আমার কোনও অভিনয়ের ট্রেনিং ছিল না, কিন্ত খুব ছোটবেলা থেকে পাড়ায় ফাংশন করেছি, পাশের পাড়ায় ফাংশন করেছি। পঁচিশে বৈশাখ একটা অনুষ্ঠান হবেই হবে।

এখন শেষ ক'বছর পয়লা বৈশাখটা তো একেবারেই বদলে গেছে। আজকাল ওই হোয়াটসঅ্যাপেই পয়লা বৈশাখ। আর আমরা আজকাল কীরকম একটা বাঙালি সাজার চেষ্টা করি জোর করে। সেটা আমার খুব অদ্ভুত লাগে। পয়লা বৈশাখ মানেই সেই ঘটি হাতা ব্লাউজ পরতে হবে, ঢাকাই শাড়ি সাবেকী ভাবে পরতে হবে, এগুলো খুব লোকদেখানো প্রদর্শন মনে হয়। আগে যে সরলতা ছিল, সেটা এখন খুব কম লাগে আমার। মনে হয় সেই সারল্যটা কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। লোক দেখানোটা খুব খুব বেড়ে গেছে আজকাল।

এবারকার আমার পয়লা বৈশাখটা তো স্পেশাল হবেই, কারণ আমার ছেলে এবার পয়লা বৈশাখে এক বছরের দিকে পা দিচ্ছে। ওকে বাড়িতেই একটু ধুতি-পাঞ্জাবি পরাব আর কী! বাড়িতে একসঙ্গে সবাই কাটাব, সেটা একটা বিরাট আনন্দের ব্যাপার। এবার তো গুড ফ্রাইডে আর পয়লা বৈশাখ একদিনেই পড়েছে। বাড়িতেই থাকব, আনন্দ করব। হোটেলে গিয়ে পয়লা বৈশাখে বাঙালি খাবার খাব, ওরকম ব্যাপার আমাদের নেই।