
শেষ আপডেট: 27 May 2022 15:01
তিনি রূপটানের জাদুকর। তাঁরই ছোঁয়ায় জিতু কমল হয়ে উঠেছেন সত্যজিৎ রায়। সেই জিতুই এখন 'টক অফ দ্য টাউন'। অনীক দত্তর 'অপরাজিত' ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি সকলের মনের মণিকোঠায়। তাঁর নতুন নাম এখন সত্যজিতু। জিতুর এই সত্যজিৎ হয়ে ওঠার পিছনে যাঁর কৃতিত্ব অনস্বীকার্য, তিনি সোমনাথ কুণ্ডু (Somnath Kundu)। তাঁর মেকআপের জাদুতে সন্দীপ রায় পর্যন্ত দেখতে পেয়েছেন বাবা সত্যজিৎ রায়কে।
'দ্য ওয়াল'-এর মুখোমুখি 'ওয়েস্ট বেঙ্গল জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন' দ্বারা টানা তিনবার পুরস্কারপ্রাপ্ত মেকআপ আর্টিস্ট সোমনাথ কুণ্ডু। তিনি এখন দার্জিলিংয়ে ব্যস্ত পরিচালক সুজয় ঘোষের ইউনিটে। তারই ফাঁকে 'অপরাজিত' ছবির চরিত্রদের মেকআপ নিয়ে নানা কথা জানালেন সোমনাথ। সাক্ষাৎকার নিলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।

হ্যাঁ। আমার বাবা এবং ঠাকুর্দা কস্টিউম বিভাগে ছিলেন। ওঁরা পোশাক পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকতেন। সত্যজিৎ রায়ের 'গুপী গাইন বাঘা বাইন'-এর কিছু পোশাক আমার ঠাকুর্দার বানানো ছিল। আমার বাবা তপন সিনহা, তরুণ মজুমদারের সঙ্গে কাজ করেছেন।
আমি তখন অরিন্দম শীলের 'মহানন্দা' ছবিতে মেক আপ আর্টিস্টের কাজ করছিলাম। মহাশ্বেতা দেবীকে ফুটিয়ে তুলছি গার্গী রায়চৌধুরীকে মেক আপ দিয়ে। 'মহানন্দা'র প্রযোজক আর 'অপরাজিত'র প্রযোজক একই। ফিরদৌসল হাসান। তিনি 'মহানন্দা'তে আমার করা মহাশ্বেতা দেবীর মেক আপ দেখে অভিভূত হয়ে বললেন, 'সোমনাথ আমি আরেকটা ছবি করছি অনীক দত্তর 'অপরাজিত'। সত্যজিৎ রায়ের জীবন নির্ভর ছবি। সেখানে তোমাকে সত্যজিৎ রায়কে গড়তে হবে। তুমিই পারবে। অন্য কারও উপর আমি এটা ছাড়তে পারব না।' আমি বললাম যে ঠিক আছে করব। এমন একজন লেজেন্ড মানুষকে গড়ে তোলাও চ্যালেঞ্জিং। তার পরের দিনই অনীকদার ফোন পাই। এর পর ওঁর সঙ্গে ছবির চিত্রনাট্য নিয়ে বসলাম।
হ্যাঁ তা তো বটেই। তবে আমি অনীকদাকে আশ্বস্ত করেছিলাম, হিরো বদল হলেও ছবির ক্ষতি হতে দেব না। আসলে ছবিতে তখন সত্যজিতের দুটো পর্যায় দেখাবে ভেবেছিলেন অনীকদা। একটা প্রথম যৌবনের সত্যজিৎ, যখন তাঁর কলেজ বেলা। আরেকটা আরও কয়েক বছর পরে যখন সত্যজিৎ বিবাহিত, যখন তিনি 'পথের পাঁচালী' তৈরি করছেন। প্রথম যৌবনের রোলে কয়েকটা শটে ছিলেন জিতু কমল আর লিড চরিত্রটা যখন পূর্ণবয়স্ক সত্যজিৎ সেটা করছিলেন আবির। আমি অনীকদার কথা মতো আবিরের উপরেই সত্যজিতের মেক আপ টেস্ট করছিলাম। কিন্তু লুক টেস্টের পর আবির শেষ অবধি ডেট দিতে না পারায় পুরো রোলটাতেই চলে এলেন জিতু। অনীকদা আমায় বললেন, 'এবার কি পারবে জিতুকে দিয়ে পুরো ছবিটা উতরে দিতে?' আমি বললাম, ঠিক পারব।

জাদু নয়, নিরলস অধ্যবসায় আর স্বপ্ন দেখার দুটো চোখ চাই। জিতুকে যখন মেক আপ করে কস্টিউম পরিয়ে আমরা আনলাম, সবাই তখন চমকে গেছিল। সত্যজিতের লুকে দুটো সময়ের বয়সের তফাত দেখাতে হতো, সেটাই জিতুর লুকে আনলাম। ছবির শুরু হচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার দিয়ে। তখন ১৯৫৬ সাল। মিস্টার রে-র বয়স তখন ৪২। আবার ফ্ল্যাশব্যাকে যখন তাঁর ছবির কাজ শিখতে বিলেত যাওয়া দেখাচ্ছে, তখন বয়স ৩৮ মতো। এই বয়সের তফাতটা জিতুর ওপর আমায় ফোটাতে হত। বেসিক চেঞ্জটা করেছিলাম চুলে। সত্যজিৎ রায়ের যত বয়স বাড়ে হেয়ারস্টাইলটা কোঁকড়ানো থেকে স্ট্রেট পাতা চুল হয়ে যায়। হেয়ারস্টাইল আর মুখের বলিরেখায় কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন করেছিলাম প্রস্থেটিক মেক আপে। ছবিটা খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে।
সত্যজিৎ রায়কে এ যুগে আমার মেক আপ দিয়ে আনতে পারছি, এটা আমার কাছে পরম প্রাপ্তি। 'অপরাজিত'তে কাজ করব বলে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের হিন্দি ছবি 'শের দিল'-এ কাজ করার অফার ছেড়ে দিই। ওই ছবিতে পঙ্কজ ত্রিপাঠী ছিলেন। সৃজিতদার সঙ্গে আমার খুব ভাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং। সৃজিতদাকে বলেছিলাম, 'অপরাজিত'তে কাজ করতে চাই। সৃজিতদা এক কথায় বললেন, 'বাঙালির আইকনের উপর তোমার ছবি করা উচিত। তুমি আমার ছবি ছেড়ে 'অপরাজিত' করো।' সৃজিতদা আমাকে ছেড়েছিলেন বলেই 'অপরাজিত' করতে পারি। আদতে তখনকার ডেটগুলো সৃজিতদারই ছিল।
প্রথম তো আমি স্ক্রিপ্টটা পড়ে নিয়েছিলাম। তারপর সত্যজিৎ রায়ের জীবন, তাঁর পড়াশোনা কোথা থেকে, ওঁর ছবি করার শুরুর দিকটা নিয়ে স্টাডি করলাম। অপরাজিত ছবিতে সত্যজিৎ রায়কে যতটুকু দেখানো হয়েছে সেই বয়সে সত্যজিৎ রায় কার কার সঙ্গে ওঠাবসা করেছেন, এসব দেখে সেটাকে আমি আমার মেকআপে প্রতিফলিত করি। সত্যজিতের মেকআপের একটা স্কেচ করে অনীকদাকে বলি, দেখুন কেমন হল। এগুলো লুক টেস্টের আগের কথা।

এর পর সত্যজিতের গালে যে পক্সের দাগ ছিল, সেগুলো প্রস্থেটিক মেকআপ করে নিয়ে আসি। সত্যজিৎ রায়ের গালে আট'ন বছর বয়স থেকে একটা আঁচিল ছিল। পরে পরিণত বয়সে গলাতেও একটা আঁচিল হয় ওঁর। রেডিও ইন্টারভিউ যখন দিচ্ছেন, তখন ওঁর গালে ও গলায় আঁচিল। এগুলোই তো আমার রিসার্চ। সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখে ওঁর কখন আঁচিলের সংখ্যা বেড়ে গেছিল, সেটা বুঝে মেকআপে ফুটিয়ে তোলা। সত্যজিৎ রায়ের থুতনির মাঝখানটা গভীর ঢোকা ছিল, সেটা জিতুর মুখে করতে হল।
জিতু কমল খুব গুড স্টুডেন্ট, গুড বয়। ওকে যখনই আসতে বলতাম তখনই আসত। পনেরো-কুড়ি মিনিট আগেই জিতু চলে আসত। একজন অভিনেতা আর একজন মেকআপে আর্টিস্টের মধ্যে যে বোঝাপড়ার সম্পর্কটা থাকা উচিত, সেটা আমি জিতুর থেকে ভীষণ ভাবেই পেয়েছিলাম।
আজ যে 'অপরাজিত'তে আমার মেক আপ নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে, সেটা সম্ভব হয়েছে জিতু ওঁর অভিনয়ে ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজে মেকআপটা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে বলেই। জিতু প্রথমদিন যখন মেক আপ চেয়ারে এসে বসল, আমি তখনই বুঝলাম, জিতুর সঙ্গে আমার রসায়ন জমে যাবে।
জিতুকে বলেছিলাম, এই ছবির কাজ যতদিন চলবে, তুমি অন্য কোথাও চুল কাটবে না। যা কাটার আমি কাটব। কারণ সত্যজিৎ বাবুর চুলটা প্রথমে কোঁকড়ানো ছিল, পরের দিকে ক্রমশ চুলটা ফ্ল্যাট হয়ে যায়।

আমার সবচেয়ে বড় পাওনা, যেটা আমি মনে করি আমার অ্যাওয়ার্ড পেয়ে গেছি, সেটা হল অপরাজিত দেখে সন্দীপদা (রায়) নিজে আমাকে ফোন করেছিলেন। উনি বললেন, 'সোমনাথ, আমি জাস্ট অপরাজিত দেখে বেরিয়ে আমার ছেলে সৌরদীপকে বললাম তোমায় একটা ফোন করতে। আমি ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছি। যেন আমার বাবাকেই পর্দায় দেখছি। এত নিখুঁত কাজ করেছ তুমি! বেঁচে থাকো, ভাল ভাল কাজ করো সোমনাথ।'
আমি আগে বাবুদার (সন্দীপ রায়ের ডাক নাম) 'প্রফেসর শঙ্কু'তে ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের মেক আপ করেছি। সম্প্রতি বাবুদা যে ফেলুদা করছেন, সেটাতেও আমায় উনি অফার করেছিলেন। কিন্তু এখন এই সুজয় ঘোষের হিন্দি ছবির কাজে দার্জিলিঙে আছি, ডেটটা ক্ল্যাশ করায় করতে পারলাম না।
হ্যাঁ। উনি তো আসলে একজন পুরুষ, হর বাবু। একজন বৃদ্ধ মানুষ। তাঁকে আরও বৃদ্ধা দেখাতে গালে ও চুলে প্রস্থেটিক করলাম। চুনীবালার ছবিটা স্টাডি করেছিলাম। হর বাবুর নাক, থুতনি মেকআপে বদলানো হল, চোখটা আধবোজা করলাম। সেই ঠাকুমা ফিলটা আনতে চেষ্টা করলাম একজন পুরুষ অভিনেতার মধ্যে।
এই কথাটা বলতেই হবে, 'অপরাজিত' ছবিতে প্রতিটি চরিত্র গড়ে তুলতে আমার একার ভূমিকা নেই। পোশাক স্টাইলিস্ট সুচিস্মিতা দাশগুপ্ত, লেডি ক্যারেক্টারদের হেয়ার স্টাইলিস্ট হেনা মুন্সি, সিনেমাটোগ্রাফার সুপ্রতিম ভোলের ক্যামেরার জাদু আর অনীক দত্তর পরিচালনা ছাড়া আমার মেক আপ সম্পূর্ণ হত না। এটা তো একটা টিম ওয়ার্ক। প্রত্যেকে দুর্দান্ত কাজ করেছে।
ছবির একটা সিক্রেট বলি এখানে। কয়েকজন একই জুনিয়র আর্টিস্ট ছবিতে দু'তিন বার বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যেটা কেউ ধরতে পারেনি। মেক আপ, হেয়ারস্টাইল, কস্টিউম,ক্যামেরার জন্যই সম্ভব হয়েছে সেটা।
আমি নেতাজি সাজিয়েছিলাম দু'বার, প্রসেনজিৎ আর শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়কে। আমার স্বপ্নের চরিত্র শেখ মুজিবুর রহমান। এখানকার কোনও পরিচালক বা বাংলাদেশের কোনও পরিচালক যদি শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন নির্ভর ছবি করেন, তাহলে সব কাজ ফেলে আমি করব।
‘পথের পাঁচালী’ হাউসফুল দেখেছিল বসুশ্রী, ৬৭ বছর পরে সেই স্মৃতি ফিরল ‘অপরাজিত’র হাত ধরে