
সত্যজিৎ রায় ও মাধবী মুখোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 2 May 2024 17:06
'মহানগর','চারুলতা','কাপুরুষ' তিনটি ছবির নায়িকা তিনি। আবার তিনিই সত্যজিৎ রায়ের আরো তিনটি ছবির অফার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কেন? চারুলতা বললেই যাঁর কথা প্রথম মনে আসে তিনি কিংবদন্তী অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়। সেই কালে তাঁর নাম সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে জড়িয়ে তৈরি হয়েছিল নানা মুখরোচক গল্প। এমনকী সত্যজিতের সংসারও নাকি ভাঙতে বসেছিল মাধবীর কারণে? তৃতীয় ব্যক্তি কি এত সহজে কারো সংসার ভাঙতে পারে? তবু রেহাই পাননি চারুলতা এই চর্চা থেকে। সত্যি কি সত্যজিৎ রায় আর মাধবী মুখোপাধ্যায়ের প্রেমের সম্পর্ক ছিল? কতদূর গড়িয়েছিল সেই সম্পর্ক? নাকি নায়িকা-পরিচালকের প্রফেশনাল বোঝাপড়াকেই ভুল বুঝেছিলেন পরিচালক-পত্নী বিজয়া রায়?
মাধবী মুখোপাধ্যায় কিন্তু সত্যজিতের সৃষ্টি নয়, আবিস্কারও নয়। শিশু বয়স থেকেই মায়ের হাত ধরে অভিনয় জগতে পা রাখেন মাধবী। প্রভা দেবী, অহীন্দ্র চৌধুরী, সরযুবালা দেবী, ছবি বিশ্বাস, শিশির কুমার ভাদুড়ির মতো স্বনামধন্য অভিনেতার কাছে অভিনয়ের পাঠ নিয়েছেন তিনি। পেশাদার রঙ্গমঞ্চ ও চলচ্চিত্র দু'জায়গাতেই শিশু বয়স থেকে কৈশোর কেটেছে তাঁর। চলচ্চিত্রে নায়িকা রূপে আসা বলতে গেলে তপন সিনহার 'টনসিল' ছবি দিয়ে। এরপর মৃণাল সেনের 'বাইশে শ্রাবণ' ছবির নায়িকা হয়েই মাধবী সবথেকে আলোচিত হন। এতদিন তাঁর নাম ছিল মাধুরী। মৃণাল সেন তাঁর নাম একটু পাল্টে করে দেন নবাগতা মাধবী। মৃণাল সেনের পর সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে মাধবীর কাজ।
মাধবী জানালেন "সালটা যতদূর মনে পড়ছে ১৯৬২। আমি তখন থাকি কাশী মিত্র ঘাট স্ট্রিটে। সত্যজিৎবাবুর সমস্ত ছবির প্রোডাকশন ম্যানেজার অনিল চৌধুরী আর সাউন্ড রেকর্ডিস্ট দুর্গাদা হঠাৎ একদিন আমার বাড়ি এসে উপস্থিত। ওঁরা জানালেন সত্যজিৎ রায় আমাকে ওঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতে বলেছেন। ঠিকানা ৩ লেক টেম্পল রোড। ওঁরা চলে গেলে মাকে বলেছিলাম যাবনা। হয়তো শুধু শুধু ট্যাক্সি ভাড়াটাই জলে যাবে। আদৌ নেবেনা। মা বললেন "কথা যখন দিয়েছ তোমার যাওয়া উচিত।" আমাদের মা মেয়ের কথাবার্তার মধ্যে ভদ্রলোক দুজন আবার ফিরে এসে বললেন "ট্যাক্সি ভাড়াটা রেখে দিন"। আমার কীরকম লজ্জা লাগল। আমি কিছুতেই টাকা নেব না। ওঁরা জোর করে টাকা রেখে গেলেন।
সত্যজিৎবাবুর বাড়ি যেতে উনি বললেন "আমি এখন 'অভিযান' ছবির আউটডোরে যাচ্ছি। ফিরে এসে খবর দেব।" এই 'খবর দেব' কথাটা আমরা শুনে শুনে অভ্যস্ত। সেই কথার আসল অর্থও আমাদের অজানা নয়। বিয়ের পাত্র পক্ষ পাত্রী দেখতে এসেও বলে থাকে - পরে খবর দেব। সেই 'পরে' আর আসেনা।"
কিন্তু সত্যজিৎ রায় কি পরে ডাকলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়কে? মাধবী বললেন "এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটল। সত্যজিৎ বাবু ফিরে এসেই আমাকে ডেকে পাঠালেন ওঁর বাড়ি। অত বড় একজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আমার কিন্তু একটুও ভয় করেনি। আসলে ছোট থেকেই তো আমি শিশির ভাদুড়ি, অহীন্দ্র চৌধুরী, নরেশ মিত্র, মহেন্দ্র গুপ্তর সান্নিধ্য পেয়েছি। সত্যজিৎবাবু মহানগরের চিত্রনাট্য পড়ে শোনালেন। শুধুমাত্র চারুলতার সময় উনি বলেছিলেন "মাধবী, এখন অন্য কোনও ছবি তুমি করো না।"
এই 'চারুলতা' ছবির মুখ্য চরিত্রে অভিনয়ের পরেই ইন্ডাস্ট্রিতে মাধবী আর সত্যজিতের সম্পর্কের কথা ছড়িয়ে পড়ে। মাধবীর বাড়িতে সত্যজিতের যাতায়াতের কথাও প্রকাশ্যে আসে। সেই সময় কিন্তু পরিচালক বা অভিনেত্রী কেউ এই নিয়ে কোথাও মুখ খোলেননি।
বরং পরবর্তীকালে সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায় তাঁর ‘আমাদের কথা’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে কোনও নাম না করে তাঁর স্বামীর এই সম্পর্কের রটনা নিয়ে বলেন, তাঁর স্বামী সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে সেই নায়িকার ‘স্ট্যান্ডার্ড’ একেবারেই মেলে না। কাজেই দুজনের সম্পর্কের রটনা ভিত্তিহীন। নায়িকার নাম এড়িয়ে গেলেও কোন প্রসঙ্গে কার কথা উনি বলছেন তা বুঝতে কোথাও অসুবিধে হয় না।
বিজয়া রায়ের সঙ্গে মাধবীর সম্পর্ক কেমন ছিল? মাধবী বললেন " সত্যজিৎবাবুর বাড়ি থেকে, ও তাঁর স্ত্রী মঙ্কুদির কাছ থেকে যে ভালবাসা পেয়েছি তা কখনওই ভোলার নয়। মঙ্কুদি অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন। সমাজের উচ্চস্তর থেকে অনেকটাই দূরে ছিলাম। ফিল্মের চারু কিন্তু সমাজের উচ্চস্তরের চরিত্র । চারু হয়ে উঠতে আমায় সাহায্য করেছিলেন মঙ্কুদি। আমি এমন কাউকে অসম্মান করতে চাই না যাঁকে সারা পৃথিবী সম্মান করে। এমন কিছু বলতে চাই না যাতে তাঁর বা তাঁর পরিবারের ভাবমূর্তিতে কোনও দাগ পড়ে।"
কিন্তু মাধবী কীভাবে কাটিয়ে উঠেছিলেন সেই যন্ত্রণার দিনগুলো? কোন শক্তির থেকে তিন তিন বার সত্যজিৎ রায়কে ফিরিয়ে দেন মাধবী?
মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কথায় " তখন ইন্ডাস্ট্রিতে আমাকে নিয়ে বাজে গসিপ চলেছিল। সত্যজিৎ রায়ের ইউনিটের সবার ধারণা হল আমি খুব খারাপ মেয়ে। সমাজে মেয়েদেরকে সবসময় দোষী করা হয়। আমার স্বামী নির্মল কুমারের থেকেও সরে এসে এত বছর যখন একা থেকেছি তখনও সবাই আমায় দোষী সাব্যস্ত করেছে। 'কাপুরুষ' ই মানিকদার সঙ্গে আমার শেষ ছবি। সত্যজিৎ রায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে ১৪ টি ছবি করেছেন। তাতে কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু আমি যখন চারুলতা তখন থেকেই মানিকদার ইউনিট ও কাছের মানুষরা আমায় নিয়ে নানারকম জল্পনা শুরু করল। একসময় শুনলাম ওঁর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁকে সাইক্রিয়াটিস্ট দেখাতে হল। তখন আমার বয়স অল্প। শুনলাম, আমি সত্যজিৎবাবুর ছবিতে নায়িকা হয়েছি বলে বিজয়া রায় মানসিক অস্থিরতার শিকার। তাই আমি সরে এলাম রায়বাড়ি থেকে। তারপরেও তিনবার সত্যজিৎ রায় আমায় ওঁর ছবিতে ফিরতে অনুরোধ করেন। নায়ক, অশনি সংকেত, ঘরে বাইরে। তিনবারই না বলি।"
হোম ব্রেকার তকমা কখনও গায়ে মাখতে চাননি মাধবী। চারুলতা তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ চরিত্র। কিন্তু তিনি কেবলমাত্র সত্যজিতের নায়িকা নন। মাধবী অগ্রদূত, বিজয় বসু, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, পূর্ণেন্দু পত্রী, ঋত্বিক ঘটকের নায়িকা। তিনি মাথা উঁচু করে চলেছেন, চলেন, পেছন দিকে তাকান না। তিনি স্টারডমের অহংকার প্রদর্শন নয়, বরং সমাজের সব মানুষের সঙ্গে মিশতে, সাহায্য করতে ভালবাসেন। করোনার সময়ে তাঁরআবাসনের সব বয়স্ক মানুষকে নিজ দায়িত্বে ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। অভিনেত্রী মাধবী যত বড়, তারথেকেও অনেক বড় মানুষ মাধবী।