
শেষ আপডেট: 2 May 2023 11:02
নন্দন-এর এক নম্বর ‘হল’ কানায় কানায় পূর্ণ। বিষয়, ‘মহানগর’ (Mahanagar) ছবির ৬০ বছর পূর্তিতে বিশেষ সাক্ষাৎকার, বক্তৃতা। সত্যজিৎ রায়ের ১০৩তম জন্মদিনের (Satyajit Ray Birthday) আগে ১ মে মহানগরে এসেছেন জয়া বচ্চন (Jaya Bacchan in Kolkata)। সাক্ষাৎকারের শুরুতেই জয়া দর্শকদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘বাবু (সন্দীপ রায়) যদি ডাকে, আমি না করতে পারি না। আমি ওকে এই সাইজে (হাতের ইশারায় ছোট্ট) দেখেছি…।’ সঙ্গে সঙ্গে ‘হল’ জুড়ে তুমুল হাততালি। সঞ্চালক বাংলা ছবিতে পুনরায় জয়ার অভিনয় করা প্রসঙ্গ তুলতেই সন্দীপ রায়কে বলতে শোনা গেল, ‘এবারে মনে হচ্ছে— জয়াদি তো বলেই দিলেন আমাকে না করতে পারেন না। সুতরাং জয়াদিকে নিয়ে ভাবতে হবে…!’ জয়া বচ্চন কি সন্দীপ রায়ের ছবিতে অভিনয় করতে আসছেন? প্রশ্ন থেকে গেল।

শর্মিলা, অপর্ণা, জয়া তিন কিংবদন্তিই সিনেমায় এসেছেন সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে। পুরীতে সেইসময় তপন সিনহার ‘নির্জন সৈকতে’ (১৯৬২) ছবির শুটিং চলছিল। সেই সূত্রে জয়ার সঙ্গে আলাপ হল শর্মিলা ঠাকুর ও রবি ঘোষের। ‘রিঙ্কুদি আর রবিকাকু দু’জনে মিলে মানিককাকুকে বলেছিলেন, ‘The girl for the role was found at last. আমি মানিককাকুর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে রবিকাকুর কথা মতো চুপ করে ছিলাম,’ জানালেন জয়া। ‘মহানগর’-এর সেই ‘বাণী’ (জয়া ভাদুড়ী) পরবর্তীকালে মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে হয়ে গেলেন কিংবদন্তি। ‘মিলি’, ‘গুড্ডি’, ‘অভিমান’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘কোশিস’ ইত্যাদি ছবিতে তাঁর অভিনয় দাগ কেটে দিল বাঙালি তথা ভারতীয় মননে।

মুম্বইয়ের ফিল্ম ডিরেক্টর প্রসঙ্গে বারবারই বললেন, ঋষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের কথা। আরও জানালেন যে, ঋতুপর্ণ ঘোষের পর আর কোনও বাংলা ছবি দেখেননি। তিনি মনে করেন, ঋতু ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের গ্রেট ক্রিয়েটিভ। সত্যজিৎ রায়ের মতো ক্রিয়েটিভিটি জয়া লক্ষ করেছেন ঋতুর মধ্যে।
‘মহানগর’ ছবিতে অভিনয়ের ক্ষেত্রে চোদ্দো বছরের জয়াকে স্বাধীনতা দিয়েছেন সত্যজিৎ। ডায়ালগ প্রসঙ্গেও কোনওরকম নির্দেশ দেননি। সত্যজিৎ বরাবরই সকলকে ডেকে একবার সকলের ডায়ালগটা পড়ে দিতেন। ‘সেই বলার ভঙ্গি দেখে আমরা যে যার ক্ষমতা অনুযায়ী অভিনয় করতাম।’ জয়া আরও বললেন, ‘ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ফিল্ম নিয়ে পড়াশুনোর প্রসঙ্গ উঠলে মানিককাকু বলেছিলেন, ‘you don’t need no institute.’

কলকাতার ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়োতে জীবনের প্রথম শট দিয়েছিলেন জয়া। শটটি ছিল অনিল চ্যাটার্জি (সুব্রত) ও মাধবী মুখার্জির (আরতি) সঙ্গে। ‘অনিলকাকু খবরের কাগজে পড়ছেন। আমি টেবিলে বসে লিখছি। মহানগর সম্পর্কে যত ছবি ছাপা হয়েছে তাতে ওই ছবিটাই বারবার এসেছে।’ জানালেন জয়া বচ্চন।

৬২-এর পৌষমেলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু সত্যজিৎকে বলেছিলেন যে, চলচ্চিত্রকে দেশের একাত্মবোধের কাজে লাগাতে। কিন্তু তাতে কর্ণপাত না করে সত্যজিৎ মেতে উঠেছিলেন সৃজনশীলতায়। ৬৩-এর জানুয়ারিতেই শুরু করলেন ‘মহানগর’-এর কাজ। তখনও কিন্তু লাদাখ ও নেফা সীমান্তে ভারত-চিন সংঘর্ষ চলছে। হ্যাঁ, ‘মহানগর’ ছবির প্রিয়গোপাল (আরতির শ্বশুরমশাই) চরিত্রটিকে মর্মস্পর্শী করতে সত্যজিৎ, নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘আকিঞ্চন’ গল্পের স্কুল মাস্টারের চরিত্রটিকেও আরোপ করেছিলেন প্রিয়গোপালের উপর। গল্পের নাম ‘অবতরণিকা’ হলেও সত্যজিৎ ছবিতে নাম দিলেন ‘মহানগর’।

জয়ার প্রথম অভিনয় ‘মহানগর’-এ। এর আগে অভিনয়ে কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না তাঁর। ‘ভূপালে থাকতে প্রতি বিকেলে (শনিবার, রবিবার) বাংলা ছবি দেখানো হত। বাঙালিদের একটা ক্লাব ছিল। মুক্তির পর ওখানেই ‘মহানগর’ প্রথম দেখেছিলাম।’ প্রশ্ন রাখলাম, ‘মহানগর’ ছবিতে অভিনয়ের সময় আপনি নেহাতই ছোট ছিলেন। পরবর্তীকালে যখন বুঝলেন উনি সত্যজিৎ রায়—তখন আপনার অনুভূতিটা কেমন হয়েছিল? উত্তরে জয়া জানালেন, ‘আমি জানতাম, He is very very big director. কিন্তু বিষয়টি সিরিয়াসলি নিইনি। কাজ করার পর রিয়েলাইজ করলাম বিষয়টা। যখন লোকেরা জিজ্ঞেস করল কনভেন্ট স্কুলে ফিরে আসার পর—আমি বিষয়টা তাঁদের বললাম। তখনই অনেকে বললেন, You have acted with Satyajit Ray!… You are a very lucky girl. কী বলব! I am so lucky. Then I started understanding…!’
(লেখক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক)
সত্যজিতের শেষ বিদায়ে চড়া মেকআপ করে গেছিলেন মাধবী, বয়ে যায় সমালোচনার ঝড়