Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

সন্তু মুখার্জীর রতিকান্ত-পাঞ্জাবি ট্রেন্ড তৈরি করে নয়ের দশকে, আজও ভোলেননি ফ্যাশনপ্রেমীরা

উত্তম-পরবর্তী যুগের প্রতিষ্ঠিত নায়ক তিনি। সুদক্ষ অভিনেতা তো বটেই। সেই সঙ্গেই কৃতী সন্তান স্বস্তিকার পিতা বলেও পরিচিতি রয়েছে তাঁর। তিনি সন্তু মুখোপাধ্যায় (Santu Mukherjee)। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে চলে গেছেন ৬৯ বছর বয়সে।

সন্তু মুখার্জীর রতিকান্ত-পাঞ্জাবি ট্রেন্ড তৈরি করে নয়ের দশকে, আজও ভোলেননি ফ্যাশনপ্রেমীরা

সন্তু মুখোপাধ্যায়। গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন।

শেষ আপডেট: 13 January 2025 13:11

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

উত্তম-পরবর্তী যুগের প্রতিষ্ঠিত নায়ক তিনি। সুদক্ষ অভিনেতা তো বটেই। সেই সঙ্গেই কৃতী সন্তান স্বস্তিকার পিতা বলেও পরিচিতি রয়েছে তাঁর। তিনি সন্তু মুখোপাধ্যায় (Santu Mukherjee)। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে চলে গেছেন ৬৯ বছর বয়সে, আজ থেকে ৫ বছর আগে। ২০২০ সালের মার্চ মাসে। কিন্তু আজ, ১৩ জানুয়ারি, তাঁর জন্মদিনে অনেকেরই মনে মনে পড়ে যাচ্ছে, সেই যুবকের কথা। শেষ সময়ের জরা বা বার্ধক্য পার করে অনুরাগীদের চোখে ভাসছে, পেটানো চেহারা, চওড়া বুক, ঈর্ষণীয় উচ্চতা। সেই সঙ্গে ঠোঁটের উপরে পাতলা গোঁফ যেন অতিরিক্ত সৌন্দর্য যোগ করেছে। খুব একটা হাসি মুখে অভিনয় করতেন না তিনি। বলতে গেলে একটু গম্ভীর নায়ক হিসেবেই সামনে আসত তাঁর নাম। কিন্তু সাতের ও আটের দশকের প্রায় সব নায়িকারই নায়ক তিনি। তার পরে নয়ের দশকে নতুন যাত্রা শুরু ছোটপর্দায়। কলকাতা দূরদর্শনে জনপ্রিয় নায়ক সেই সন্তু মুখোপাধ্যায়।

পড়াশোনার পাশাপাশি গানপাগল ছেলে সন্তু

১৯৫১ সালের ১৩ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন সন্তু মুখোপাধ্যায়। তিনি ভবানীপুরের  মিত্র ইনস্টিটিউশনে প্রাথমিকে পড়তেন এবং পরে শরৎ বোস রোডের পদ্মপুকুর ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। সেখান থেকেই পাশ করেন উচ্চমাধ্যমিক। সঙ্গে ছিল গানের নেশা। যে গানই শুনতেন, তুলে ফেলতেন সহজে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি আলাদা ভালবাসা ছিল। শিখেওছিলেন স্বরলিপি মেনে গান গাওয়া। পরবর্তী কালে রুমা গুহাঠাকুরতা এবং সমগ্র গুহঠাকুরতা পরিবারের সঙ্গেই সন্তুর পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গুহঠাকুরতা হাউসে বহু যাতায়াতও ছিল তাঁর।

রুমা গুহঠাকুরতার প্রয়াণে সন্তু বলেছিলেন "এই বাড়িতে যাতায়াত তো আমার আজকের নয়, ছেলেবেলা থেকেই। আমার সঙ্গীতানুরাগে এই বাড়ি জড়িয়ে আছে।" গান শেখার পাশাপাশি পুরুষ হয়েও রীতিমতো তালিম নিয়ে নাচ শেখেন সন্তু মুখোপাধ্যায়। নৃত্যগুরু গোপাল ভট্টাচার্যের কাছ থেকে নাচের তালিম নেন। কিছুদিন যুক্ত ছিলেন 'ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার'-এর সঙ্গেও।

অভিনয় জীবন শুরু তপন সিনহার হাত ধরে

নাচ-গানের পাশাপাশিই তাঁর শখ ছিল অভিনয়। তাঁর বাবাও ছিলেন গুণী অভিনেতা। 'শৌভনিক' নাট্যদলে অভিনয় করতেন বাবা। তাই অভিনয় ছিল সন্তুর রক্তেই। নাটকে অভিনয় দিয়েই শুরু। এর পরে দেখা করেন বিখ্যাত পরিচালক তপন সিনহার সঙ্গে। ১৯৭৫ সালে তপন সিনহা তাঁকে নিয়ে আসেন 'রাজা' ছবিতে নবাগত হিসেবে। এর পরে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি সন্তুকে। পরপর ভাল ভাল ছবিতে একের পর এক সুযোগ আসতে থাকে। তপন সিনহার সঙ্গেই এর পরে করেন 'হারমোনিয়াম' ছবি।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও সমানতালে অভিনয়

'সংসার সীমান্তে' ছবি করার কথা ভাবার সময়ে ঋত্বিক ঘটকের মাথায় ছিল সৌমিত্র-মাধবী জুটি। কিন্তু সে ছবি ঋত্বিকের করা হয়নি শেষমেশ। এর পরো তরুণ মজুমদার করেনন 'সংসার সীমান্তে' সিনেমা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা রায় ছিলেন নায়ক-নায়িকা। কিন্তু একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্রে ছিলেন সন্তু। 'রাজা' এবং 'সংসার সীমান্তে' রিলিজ় করে একই সালে, ১৯৭৫-এ। সন্তুর শ্রেষ্ঠ অভিনয়ের একটি হয়ে রয়ে যায় 'সংসার সীমান্তে'। কিন্তু ওই ছবির প্রিন্ট নষ্ট হয়ে যায় পরে। দর্শকরা আর কোনও দিনই দেখতে পারবেন না সে ছবি। 'সংসার সীমান্তে' নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আদতে একটা সময়ের দলিল নষ্ট হয়ে গেল। একথা আজও বলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এই নিয়ে আফশোস ছিল সন্তুরও। সন্তু মুখোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন "সত্যজিৎ রায় নিজে চেষ্টা করেছিলেন বলেই তাঁর ছবিগুলো এখনও আছে। উনি বিদেশি সাহায্যও পেয়েছেন। কিন্তু আমরা বাঙালিরা পরিচালকদের মূল্যই দিলাম না। দুঃখ বাড়িয়ে আর লাভ কী?" এর পরেও সন্তু ও সৌমিত্র প্রচুর কাজ করেছেন সিনেমা এবং সিরিয়ালে। যীশু দাশগুপ্তর 'শিশিরের শব্দ' সিরিয়ালে ছিলেন দু'জনে। পরে 'জলনূপুর' সিরিয়ালেও তাঁরা হয়েছিলেন দুই ভাই। সন্তুর শেষের দিকের কাজ সৌমিত্র চ্যাটার্জীরই সঙ্গে। লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের 'সাঁঝবাতি'। যদিও দু'জনে একসঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেননি এই সিনেমায়।

উত্তমকুমার থেকে দেব: সবার সঙ্গেই সন্তু রেখে গেলেন অভিনয়ের ছাপ

উত্তমকুমারের সঙ্গে সন্তুর প্রথম কাজ 'চাঁদের কাছাকাছি' ছবিতে। উত্তম, মিঠু মুখার্জী, সুব্রতা, সন্তু মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন সে ছবিতে। উত্তমের সঙ্গে সন্তুর আরও একটি বড় হিট 'কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী'। উত্তমকুমারের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ছবিতে দেখানো হয় সন্তুকে। সন্তু অভিনীত আরও উল্লেখযোগ্য ছবি হল সাতের দশকে টুসি, প্রতিমা, গণদেবতা, মান অভিমান।

উত্তমকুমার পরবর্তী সময়ে নায়ক বলতে সামনে আসত যাঁদের নাম, তাঁরা হলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্তু মুখোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক, দীপঙ্কর দে এবং শমিত ভঞ্জ। যদিও সন্তু নায়ক হিসেবে টেলিভিশনে যত গ্রহণযোগ্য ছিলেন ছায়াছবিতে ততটা নয়। কিন্তু চরিত্রাভিনেতা হয়েও আর্ট ফিল্ম থেকে বাণিজ্যিক ছবি-- সবেতেই নিজের সেরাটা দিয়েছেন তিনি। তাপস, প্রসেনজিৎ, অভিষেক-- সকলের সহ-অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছেন। প্রভাত রায়ের লাঠি, খেলাঘর-এ সন্তু নজর কাড়েন। সন্তুর শেষ রিলিজড ছবি 'গোত্র' এবং 'সাঁঝবাতি'। 'গোত্র'তে মাসিমার বয়ফ্রেন্ড রূপে তো সন্তু আইকনিক! আবার 'সাঁঝবাতি'তে দেবের রাশভারী বাবার চরিত্রে অভিনয় করলেন মাস্টারমশাই হয়ে। সিনেমার পর্দায় বাবার শরীর খারাপ শুনে ছেলে দেব কলকাতা থেকে ছুটে এসে তাঁকে সুস্থ করে তোলেন। ক্যানসার নিয়েই কী অনবদ্য অভিনয় করে গেছেন সন্তু!

সাঁঝবাতি, সন্তুর শেষ রিলিজড ছবি। দেবের সঙ্গে সন্তু।

শর্মিলা, সুমিত্রা থেকে মহুয়া, মুনমুন, আলপনা: সন্তুর নায়িকারা

উত্তম পরবর্তী আটের দশকে যত নায়িকা ছিলেন, প্রায় সকলের সঙ্গেই কাজ করেছেন সন্তু। প্রথমেই মনে পড়ে 'প্রতিমা' ছবির কথা। এটি যদিও সাতের দশকের শেষ দিকে রিলিজড। ঋতুপর্ণ ঘোষের 'অন্তরমহল' আর সন্তু মুখার্জী-সুমিত্রা মুখার্জী অভিনীত 'প্রতিমা' ছবিটি একই গল্পের উপর তৈরি। সুমিত্রা মুখার্জীর সঙ্গে আরও অনেক ছবি করেছেন সন্তু। ভালোবাসা ভালোবাসা, স্বামী স্ত্রী, ন্যায় অন্যায়, দাদামণি, বোধন, সংসারের ইতিকথা, বৈকুণ্ঠের উইল, ললিতা-- তালিকা দীর্ঘ। [caption id="attachment_195111" align="aligncenter" width="462"]

সুমিত্রার সঙ্গে। ছবি সংগ্রহ: জ্যোতিপ্রকাশ গুহ।

শর্মিলা ঠাকুর এবং সন্তুর সর্বাধিক জনপ্রিয় রোম্যান্টিক গান আশা ভোঁসলের কণ্ঠে-- 'ও আমার কাঁধের আঁচল যায় পড়ে।' এই গানটা সন্তুর অভিনয় লাইফে আইকনিক সুপারহিট। এছাড়াও ওই একই ছবিতে ছিল লতা মঙ্গেশকরের 'না না কাছে এসো না, যাও যাও দূরে থাকো'।

মহুয়া রায়চৌধুরীর সঙ্গে উৎসর্গ, বনবাসর, ফয়শালা, জাগরণ ইত্যাদি ছবিতে ছিলেন সন্তু। আলপনা গোস্বামীর সঙ্গে করেন বিদ্রোহী, অভিনয় নয়। মুনমন সেনের সঙ্গে তাঁর করা ছবি, বান্ধবী। তনুশ্রীশংকরের বিপরীতে নায়ক রূপে পরের দিকে করেন 'হেমন্তের পাখি'। এ ছবিতে তাঁর মেয়ে স্বস্তিকাও অভিনয় করেন। সেটাই স্বস্তিকার প্রথম অভিনয়।

আকাশবাণীর রেডিওর নাটকে সন্তুর ভরা গলার স্বর

এক সময় রেডিওই ছিল বাঙালির বিনোদনের মুখ্য মাধ্যম। তখন প্রচুর রেডিও নাটক হতো। সন্তু তাঁর সুগম্ভীর স্বরে ও দক্ষতায় মাতিয়েছিলেন সেই সব নাটকও। তাঁর পাঠ করা রেডিও নাটকগুলি হল, 'অতুলপ্রসাদ', 'অসময়', 'হদয়ে প্রবাস', 'রবিবার' প্রভৃতি। এসব নাটক বিবিধ ভারতীতে যারা শুনেছেন, তাঁরা ভুলতে পারবেন না। ইতিহাস হয়ে রয়ে যাবে নাটকগুলি।

সন্তু-মমতাশঙ্করের 'প্রথম কদম ফুল'

সৌমিত্র-তনুজা অভিনীত 'প্রথম কদম ফুল' ছবি সুপারহিট হয়েছিল। তার পরে নয়ের দশকের গোড়ায় কলকাতা দূরদর্শনে ধারাবাহিক হয়েও আসে এই 'প্রথম কদম ফুল'। তার নায়ক নায়িকা ছিলেন সন্তু মুখোপাধ্যায় এবং মমতা শঙ্কর। অসম্ভব জনপ্রিয় হয় ধারাবাহিকটি। স্বামী-স্ত্রীর টানাপোড়েন দুর্দান্ত ফুটিয়েছিলেন সন্তু-মমতা।

জন্মভূমিতে রতিকান্ত চৌধুরীর পাঞ্জাবি তখন বাজারে হটকেক

সন্তু মুখোপাধ্যায় অভিনয় করলেন ময়নাগড়ের জমিদার রতিকান্ত চৌধুরীর ভূমিকায়। বাঙালি পরিবারের এক আইকনিক সুপুরষ তিনি। রতিকান্তর জীবনে তিন নারী। বড় বউ পদ্মাবতী অর্থাৎ মমতা শঙ্কর, বাঈজি পিয়ারীবাঈ এবং ছোট বউ গৌরী অর্থাৎ মৌসুমী সাহা। রতিকে ছোট থেকে মাতৃস্নেহে মানুষ করেছিলেন পিসিমা মিতা চট্টোপাধ্যায়। এই চার নারীকে নিয়েই রতিকান্তর জীবন আবর্তিত হতো। সঙ্গে ছিল ময়নাগড়ের জমিদারি। বড় বউ পদ্মাবতী নিঃসন্তান। রতিকান্তর ঔরসজাত প্রথম সন্তান বিক্রম আসে পিয়ারী বাঈয়ের গর্ভে। জমিদারের অবৈধ সন্তান অপবাদ লুকোতে শিশু বিক্রমকে চুরি করে জমিদার পরিবারের কর্মচারী দিবাকর অর্থাৎ পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে ছোট বউয়ের দুই ছেলে হয়, বিপ্লব ও দেবকান্ত এবং এক মেয়ে মমতা। বিক্রম বড় হলে সে চরিত্রে আসেন ভাস্বর চ্যাটার্জী। বিপ্লব হয়েছিলেন সুমন ব্যানার্জী এবং দেবকান্ত জয়জিৎ ব্যানার্জী। আর ছিলেন রতিকান্তর ভাই প্রতাপের ভূমিকায় সুমন্ত মুখার্জী। তাঁর স্ত্রী পরীর ভূমিকায় ছিলেন সোমা চক্রবর্তী। এই ছিল জনপ্রিয় সিরিয়াল 'জন্মভূমি'র স্টোরিলাইন। 'ইঁট কাঠ পাথরের পাঁজরে, ইতিহাস ফিসফিস কথা কয়'-- ইন্দ্রনীল সেনের গাওয়া 'জন্মভূমি'র টাইটেল ট্র্যাক তখন সন্ধে সাড়ে ছ'টা বাজলেই সব বাড়ি থেকে বেজে উঠত। এই জন্মভূমি সিরিয়ালটি বিপুল জনপ্রিয়তা দেয় রতিকান্ত তথা সন্তুকে। সেই সময়েই নববর্ষ থেকে পুজোর ফ্যাশন ছেয়ে ফেলল রতিকান্ত চৌধুরীর পাঞ্জাবী। বড় গলার পাঞ্জাবি, বুকের বোতাম খোলা এবং এক পাশে সেলাই দেওয়া, দড়ি বাঁধা সেই পাঞ্জাবি রতিকান্ত চৌধুরী পাঞ্জাবি নামেই পাওয়া যেত বিখ্যাত সব পাঞ্জাবির দোকানে। বহু পুরুষের প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে এই পাঞ্জাবি। তাই একথা বলা যেতেই পারে, নয়ের দশকে বাঙালি পুরুষের ফ্যাশন-পুরুষ ছিলেন সন্তুই, যিনি পুরনো জমিদার স্টাইলকে নবীন প্রজন্মের মধ্যেও ফিরিয়ে আনেন। বাংলার কোনও সিরিয়াল থেকে এমন জনপ্লাবিত ফ্যাশন ট্রেন্ড খুবই বিরল।

সন্তু-সুমন্ত দুই ভাই

উত্তমকুমার-তরুণকুমারের পরে টালিগঞ্জ পাড়ার দুই আইকনিক অভিনেতা হয়ে ওঠেন দুই ভাই সন্তু মুখার্জী ও সুমন্ত মুখার্জী। ইন্ডাস্ট্রিতে সুমন্তর ডাক নাম ছিল মন্টু। সন্তু নায়ক হিসেবে কেরিয়ার শুরু করলেও, সুমন্তর কেরিয়ার শুরু হয় নেগেটিভ রোলে। তপন সিনহার 'আতঙ্ক' সিনেমায় 'মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছু দেখেননি' ডায়ালগে নেগেটিভ রোলেই জনপ্রিয় হন তিনি। পরে ঋতুপর্ণ তাঁর সব ছবিতে সুমন্তকে ভাল রোলে ব্যবহার করেন। কিন্তু তার আগেই জন্মভূমি সিরিয়ালে দু'ভাই রতিকান্ত আর প্রতাপের চরিত্রে সন্তু-সুমন্ত সুপারহিট জুটি হয়ে ওঠে।

থিয়েটারে-গানে সন্তু

ছবির পাশাপাশি সাত-আটের দশকে থিয়েটার পাড়াও এক উজ্জ্বল ক্ষেত্র ছিল। বিশ্বরূপাতে 'প্রজাপতি' থিয়েটারে সুখেন গুন্ডার চরিত্রে অভিনয় করে সন্তু জনপ্রিয় হন। এছাড়াও 'সিরাজদৌল্লা'র মীরজাফর। যাত্রা জগতেও সন্তু ছিলেন বড় নাম। অভিনয়ের সব মাধ্যমেই কাজ করেছিলেন তিনি। চলচ্চিত্র থেকে যাত্রায় যে কজন শিল্পী এসছেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন সন্তু মুখার্জী। সবচেয়ে বেশি হিট যাত্রা উপহার দিয়েছেন। একথাই জানালেন যাত্রার সর্বোত্তমা নায়িকা কাকলি চৌধুরী। 'খাঁচা ভাঙা পাখি', 'রাজভিখারি', 'অরণ্যের বাগদত্তা', 'কমলা কেমন আছো' প্রভৃতি অজস্র হিট যাত্রা পালা করেছেন সন্তু। আর সন্তুর গানের গলা তো চিরকালই সকলের প্রিয়। বাংলা ছবিতে প্লে-ব্যাকও করলেন সন্তু। তাপস পালের লিপে 'পারাবত প্রিয়া' ছবিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত 'আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে' সন্তুর নিজের গলায় গাওয়া। অসম্ভব জনপ্রিয় হয় গানটি। তাপস ও সন্তু দু'জনেই পরপর চলে গেলেন।

এরপর সন্তুর গান সন্তুর লিপেই সুপারহিট হয়ে গেল 'ভালোবাসা ভালোবাসা' ছবিতে। গানের মাস্টারমশাইয়ের চরিত্রে সন্তু নিজের লিপে নিজে গাইলেন 'গোপন কথাটি রবে না গোপনে'। কী অপূর্ব সে গান!

পারিবারিক সন্তু

গোপা মুখার্জীকে ভালোবেসে বিয়ে করেন সন্তু মুখার্জী। তাঁদের বড় মেয়ে স্বস্তিকা, ছোট মেয়ে অজপা। প্রথমে নিজেদের পৈতৃক বাড়ি, গল্ফগ্রিনের দশতলার ফ্ল্যাটেই সংসার পাতেন সন্তু-গোপা। পরে উঠে আসেন এখনকার গল্ফ গার্ডেনে। বইপত্রের অনবদ্য কালেকশন ছিল সন্তুর। স্ত্রী গোপা ছিলেন গৃহবধূ। ইন্ডাস্ট্রির এত রকম তোলপাড়েও বেশ সুখী দম্পতি ছিলেন ওঁরা। কয়েক বছর আগে মারা যান স্ত্রী গোপা।

সন্তু-স্বস্তিকা, টলিপাড়ার প্রিয় পিতা-পুত্রী

খুব ছোট বয়সেই বড় মেয়ে ভেবলি অর্থাৎ স্বস্তিকার বিয়ে দেন সন্তু। বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সাগর সেনের পুত্র প্রমিত সেনের সঙ্গে সেই বিয়ে সুখের হয়নি। মেয়েকে নিয়েই স্বস্তিকা চলে আসেন বাপেরবাড়িতে। বহুদিন কেস চলে ডির্ভোসের। তখন প্রায়ই সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে চলে আসত স্বস্তিকা ও সাগর সেন পুত্রের নাম।

সমস্ত গুজব-সহানুভূতি পার করে নিজের অভিনয় দক্ষতার জোরেই ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের পায়ে দাঁড়ান স্বস্তিকা। বিষ্ণু পালচৌধুরীর 'দেবদাসী' সিরিয়ালে নামভূমিকায় নবাগতা রূপে আসেন স্বস্তিকা। তার আগে ছোট রোলে ছিলেন এক আকাশের নীচে সিরিয়ালে। এর পরে পর ঋতুপর্ণর চোখের বালি সিনেমাতেও কাজ করেন স্বস্তিকা। হিট হয়েছিল স্বস্তিকা অভিনীত 'প্রতিবিম্ব' ধারাবাহিক। মূলধারার বাণিজ্যিক বহু ছবিতেও কাজ করেন স্বস্তিকা, হিটও হয়। পরে অবশ্য আর্ট ফিল্মেই বেশি দেখা গেছে তাঁকে। হয়ে উঠেছেন প্রথম সারির নায়িকা। কিন্তু সিঙ্গল মাদার ও অভিনেত্রী হিসেবে স্বস্তিকার লড়াইয়ে সমস্তটুকুতে সবসময় মেয়ের পাশে ছিলেন এই সন্তু মুখোপাধ্যায়।

বহু গম্ভীর চরিত্রে অভিনয় করলেও, সন্তু আদতে ছিলেন নিখাদ আড্ডাবাজ, আমুদে, রসিক মানুষ। তাঁর সেন্স অফ হিউমার ছিল প্রবল। সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন তিনি। সন্তু ও স্বস্তিকা বাবা মেয়ের রোলে মৈনাক ভৌমিকের 'ফ্যামিলি অ্যালবাম'-সহ আরও বেশ কিছু ছবিতে কাজ করেছেন। 'আমার মুক্তি আলোয় আলোয়' বলে একটি রবীন্দ্র-গানের অ্যালবামও ইউটিউবে রিলিজ করেন বাবা-মেয়ে। বেশ জনপ্রিয় ও সমাদৃত হয় সন্তু ও স্বস্তিকার গাওয়া গানগুলি।

লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সিরিয়ালে অভিভাবক সন্তু

লীনা গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর সিরিয়ালে পুরনো আর্টিস্টদের চমৎকার সব রোল দেন বরাবরই। সন্তুও গৃহকর্তার রোল করতেন সে সব সিরিয়ালে। কিন্তু চরিত্রগুলো বারবারই ছাপিয়ে যেত পরস্পরকে। ইষ্টিকুটুম, অন্দরমহল, ময়ুরপঙ্খী-- লীনার সিরিয়ালে পরপর কাজ করে গেছেন সন্তু। তাই দর্শকের ভালোবাসাও পেলেন শেষ অবধি। মোহর সিরিয়ালে কাজ করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। সন্তুর জায়গায় তাই দুলাল লাহিড়ী করছেন এখন।

দর্শকদের ভালবাসার সঙ্গে গালিও খেয়েছেন সন্তু! তবে সেটাও তাঁর পুরস্কারই। কারণ অন্দরমহল মেগাতে জাঁদরেল শ্বশুরের ভূমিকায় অভিনয় করতেন সন্তু। যেদিন শ্বশুর সন্তু তাঁর স্ত্রী কুন্দনন্দিনী ওরফে অনসূয়া মজুমদারকে পায়ের চটি ছুড়ে মারেন, সেদিন ওরকম দৃশ্য দেখে দর্শকরা খেপে ওঠেন। আদতে এমনই সুন্দর অভিনয় করতেন সন্তু। পরে কিন্তু সেই সন্তু সেই সিরিয়ালেই বৌমা পরমেশ্বরীকে গানের জগতে নিয়ে যাওয়ার জন্য পিতার জায়গাটা নেন। বৌমার জন্য সব লড়াইতে ঢাল হয়ে দাঁড়ান। এমনকি সিরিয়ালে সন্তুর মৃত্যুদৃশ্যে স্ত্রী অনসূয়া স্বামীকে ডাকছেন অথচ ঘুম ভাঙছে না-- এই দৃশ্যে সেই গালাগালি বর্ষন করা দর্শকরাই কেঁদেছিল।

সুন্দর মানুষের শেষ অবস্থা না দেখানোই উচিত

সন্তু মুখার্জী বেশ কিছুদিন ধরেই ভুগছিলেন ফুসফুসের ক্যানসারে। সঙ্গে ছিল প্রবল শ্বাসকষ্ট। অভিনয় অবশ্য চালিয়ে গেছেন তিনি। গত বছর ১২ মার্চ মারা যান। তাঁর দুই মেয়ে স্বস্তিকা, অজপা সিদ্ধান্ত নেন, রাতেই সন্তুকে দাহ করার। কারও কোনও হস্তক্ষেপ ছাড়াই কোথাও দেহ না রেখে রাতের মধ্যেই শেষকৃত্য সম্পন্ন করাকে স্বাগত জানান সকলকে।

Image result for santu mukherjee and soumitra

যে মানুষটাকে আমরা সুন্দর রূপেই বারবার দেখেছি, মুগ্ধ হয়েছি, তাঁর ক্যানসারে পরিশ্রান্ত চেহারা, নিথর দেহ দেখে হয়তো আমাদের ভাল লাগত না। তাই এসব নিয়ে ব্যস্ততা না বাড়িয়ে সন্তুর শেষকৃত্য যেভাবে স্বল্প সময়ে সম্পন্ন হল, তা শান্তি দেয় তাঁর গুণমুগ্ধদের। ঠিক এই গানটির মতোই। 


```