
শেষ আপডেট: 22 January 2024 14:51
'আর কারও নাম যেন সীতা না হয়
এ নাম নিঠুর বড়, বড় জ্বালাময়
আমি যেন হতে পারি এ জগতে
সীতা নামে শেষ নারী
যদি কেউ কন্যা রত্ন পাও,
তাঁর যে কোনও নাম দিও এই নাম নয়
নাহ না সীতা আর নয় ... '
সীতা যেন কোন মেয়ের নাম রাখা না হয়। এমন প্রবাদ বাক্য চালু রয়েছে যুগ যুগ ধরে। সীতা নাম রাখলেই সে মেয়ের জীবনে কষ্টের শেষ থাকবে না। সমাজের চাপে সীতাকে সতীত্বের পরীক্ষা বারবার দিতে হয়েছিল। সীতার জীবন সংগ্রাম নিয়েই তৈরি হয়েছিল রঙিন বাংলা ছবি 'সীতা'। নামভূমিকায় বাংলার নয়নের মণি সন্ধ্যা রায়।
অর্ধেন্দু চ্যাটার্জির পরিচালনায় ১৯৮০ সালে রিলিজ করে বাংলা ছবি 'সীতা'। একেবারেই নিখাদ বাংলা ছবি ছিল এটি। কোনও ডাবিং ছবি নয়। সত্তরের দশক থেকে অর্ধেন্দু চ্যাটার্জি একের পর এক ভক্তিমূলক ছবি করেছিলেন, যার বেশিরভাগই সুপারহিট। তবে সবথেকে বেশি তাঁর যে ছবি রেকর্ড হিট করে সেটি ছিল 'বাবা তারকনাথ'। এই ছবির থেকেই শুরু হয় সন্ধ্যা রায়-অর্ধেন্দু চ্যাটার্জি জুটির জয়যাত্রা। সঙ্গে বহু ছবিতেই থাকতেন বিশ্বজিৎ। করুণাময়ী, হরিশচন্দ্র শৈব্যা, সন্ধ্যা-বিশ্বজিৎ কে নিয়ে পরের পর ছবি করেন অর্ধেন্দু। ছবিগুলো রঙিন ও বিগ বাজেটের হওয়াতে দর্শকদের খুব উৎসাহ থাকত।
১৯৮০ সালে রিলিজ করে সন্ধ্যা রায়ের 'সীতা'। এই ছবিতেও রামের ভূমিকায় অভিনয় করার কথা ছিল বিশ্বজিতের। কিন্তু রাম এখানে অ্যান্টি হিরো এবং অভিনয়ের সুযোগ কম। সীতার বনবাস ঘিরেই গল্প। সে কারণে বিশ্বজিৎ সীতা ছবি ছেড়ে দেন। অসীম কুমার করেন রামের চরিত্র। লক্ষণের ভূমিকায় মৃণাল মুখোপাধ্যায়।
'সীতা' ছবিতে দেখানো হয়েছিল রামচন্দ্র কোনও বীর চরিত্রই নয়। নারী নির্যাতনের পরাকাষ্ঠা মাত্র। লোকের কথায় রাম সন্তানসম্ভবা সীতাকে বনবাসে পাঠিয়ে দেন। নেন না সন্তানদের দায়িত্ব। এমনকী সতীত্ব প্রমাণ করতে অযোধ্যায় সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়। সন্ধ্যা রায়ের আকুতিপূর্ণ অভিনয়ে পর্দায় উঠে আসে সীতার হাহাকার।
সন্ধ্যা রায়ের লক্ষ্মীশ্রী মুখ পোস্টারে থাকলেই বক্সঅফিস হিট হত। আর বাঙালি ঘরানায় রামায়ণের শেষ ভাগের গল্প দারুণ চিত্রায়িত করেন অর্ধেন্দু চ্যাটার্জি। 'বাবা তারকনাথ'-এর মতোই সীতা ছবির সুরকার ছিলেন নীতা সেন। মহিলা সুরকার হিসেবে নীতা সেনের নাম উল্লেখযোগ্য। কৃষ্ণচন্দ্র দে-এর বিখ্যাত গান 'অন্ধকারের অন্তরেতে অশ্রু বাদল ঝরে' এই ছবিতে মান্না দে এর কণ্ঠে ব্যবহৃত হয়েছিল। কৃষ্ণচন্দ্রের এই গান শিশির ভাদুড়ির 'সীতা' নাটকে ব্যবহৃত হয়েছিল। সেই দৃশ্যকে মনে রেখেই আবার এই গানের রিমেক করা হয় 'সীতা' ছবিতে। 'কোথায় সীতা কোথায় সীতা, জ্বলছে বুকে স্মৃতির চিতা' গানের অংশে সীতার জন্য রাম অসীম কুমারের অপরাধবোধ, একাকী অযোধ্যায় দিনযাপনের কষ্ট ছবিটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। গীতা দে দুর্দান্ত আভিনয় করেছিলেন কৈকেয়ীর চরিত্রে।
আরতি মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে ছিল 'আর কারও নাম যেন সীতা না হয়'। ' হায় একী অপবাদ আমার সীতা মা নাকি কলঙ্কিনী', গানটি গাইলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়,বনশ্রী সেনগুপ্ত এবং সুধীন সরকার।
ছবির শুরু মান্না দের গান দিয়ে যেখানে দেখানো হয় মাটি থেকে জন্ম হচ্ছে সীতার। মান্না দে গাইলেন 'ভারতের পুণ্য মাটিতে যুগেযুগে জন্ম নিয়েছেন কত সতী, সীতা যে তাঁদেরই একজন মহা পুণ্যবতী'।
সীতা ছবি সন্ধ্যা রায় ছাড়া হতো না। সেই সময়ে পতিব্রতা চরিত্র সন্ধ্যা যেভাবে পর্দায় ফোটাতেন তা বাংলার দর্শকের হৃদয়ে ঝড় তুলত।
সীতা ছবির জনপ্রিয়তাকে মাথা রেখেই কয়েক বছর পর আশির দশকে সন্ধ্যা রায় আবার হলেন সীতা। এবার যাত্রাপালায়। সন্ধ্যা রায়কে নিয়ে যাত্রা হল 'সীতা সীমন্তিনী'। গ্রাম বাংলায় সব শো হাউজফুল। 'সীতা সীমন্তিনী' যাত্রা গানেও হিট করেছিল। সন্ধ্যার অনুরোধে এই যাত্রাপালার সংগীত পরিচালনা করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। যাত্রালক্ষ্মী বীণা দাশগুপ্তও ছিলেন এই যাত্রায়। বাংলার দর্শক চোখের জল ফেলতে ফেলতে ঘরে ফিরেছিল যাত্রায় সীতার কষ্ট দেখে। সতীত্বের পরীক্ষা দেওয়া সীতা সন্ধ্যা রায় আজও নিদর্শন হয়ে আছেন সারা বাংলায়।