
শেষ আপডেট: 19 November 2022 10:07
রান্নায় সঠিক মশলা সঠিক পরিমাণে দিলেই যেমন তা সুস্বাদু হয়ে ওঠে, তেমনই সুরের জাদুকর সলিল চৌধুরীও (Salil Chowdhury) তাঁর গানে সঠিকভাবে সুর-তাল-লয়-শব্দের মাত্রা দিতেন বলেই তাঁর গান মানুষের হৃদয়ে থেকে যেত, এখনও যায়। সলিল চৌধুরী এমন এক শিল্পী, যিনি নিজের গানকে বহু বার ভেঙেছেন, গড়েছেন। আবার একই গান বিভিন্ন শিল্পীকে দিয়ে বিভিন্ন ভাবে গাইয়েওছেন।
সলিল চৌধুরী যেমন গণসঙ্গীত থেকে আধুনিক বাংলা গানের আঙিনায় সমানতালে খেলে বেড়িয়েছেন, তেমনই তিনি যে ক'টি বাংলা ও হিন্দি ছবিতে সুরারোপ করেছেন, সেগুলিও আইকনিক হিট।

সলিল চৌধুরী সুরারোপিত এমনই এক বাংলা ছবি রয়েছে, যে ছবিটির আজ অস্তিত্ব নেই। ছবিটি নিয়ে আলোচনা হয় সিনেমামহলে, বহু দর্শক দেখতেও চান, কিন্তু প্রায় ৩৬ বছর আগের সেই ছবি আর খুঁজেই পাওয়া যায় না। ১৯৮৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি 'জীবন'।

তাপস পাল ছিলেন নায়ক জীবনের ভূমিকায়। অসাধারণ সব গান ছিল সলিল চৌধুরীর সুরে ও কথায়। কিন্তু 'জীবন' ছবি মুছে গেছে বাংলা ছবির ইতিহাস থেকে। প্রিন্ট রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ছবিটি দেখার সুযোগই নেই আজ আর।

হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দি ছবি 'আনন্দ'র গল্পের আদলে নির্মিত ছবি ছিল 'জীবন'। বাংলা ভাষায় ছবিটি পরিচালনা করেন অর্ধেন্দু চ্যাটার্জী। দুটি ছবিতেই সংগীত পরিচালক ছিলেন সলিল চৌধুরী।

'জীবন' ছবিতে রাজেশ খান্নার চরিত্রটি করেছিলেন তাপস পাল। এক ক্যানসার আক্রান্তের ভূমিকায় তাপসের অভিনয় রাজেশ খান্নার থেকে কোনও অংশে কম ছিল না। অনুকরণ নয়, বরং স্বাতন্ত্র্যেই প্রাণ পেয়েছিল তাপসের মর্মস্পর্শী অভিনয়। তাপসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয়ও ছিল সেটি, যা দেখতে পেল না দর্শকরা।

ছবিতে নায়িকার ভূমিকায় ছিলেন প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরী। মহুয়ার অভিনয়ও সকলের মন কেড়েছিল। বিশেষ করে জীবনের ভূমিকায় তাপসের মৃত্যুর পরে তাপসের বুকে মহুয়ার কান্নায় ভেঙে পড়া দেখে দর্শকরাও কেঁদেছিলেন। ছবির উল্লেখযোগ্য চরিত্রে ছিলেন অয়ন ব্যানার্জী। এছাড়াও অমিতাভ বচ্চনের চরিত্রটি করেন চিরঞ্জিত। বিশেষ চরিত্রে জীবনের প্রেমিকার ছোট্ট ভূমিকায় ছিলেন দেবশ্রী রায়। এছাড়াও ছিলেন উৎপল দত্ত ও রবি ঘোষ। শোনা যায় প্রসেনজিৎও অভিনয় করেন এই ছবিতে, ছোট্ট একটি ভূমিকায়।

ছবিতে গানের ব্যবহার ছিল চমৎকার। সলিল চৌধুরীর সুরে অনবদ্য সেসব গান গেয়েছিলেন আটের দশকের বিখ্যাত দুই অবাঙালি শিল্পী সুরেশ ওয়াদিকর এবং ভূপিন্দর সিং। 'শুধু তোমারই জন্য সুর তাল আর গান বেঁধেছি' গানটি গেয়েছিলেন সুরেশ। অবাঙালি টান হলেও দারুণ শুনতে লেগেছিল তাঁর মিষ্টি গলা।
ছবির সবথেকে হিট গান ছিল এটিই। তবে এই গানটি বেসিক রেকর্ডে সলিল কন্যা অন্তরা চৌধুরীর কণ্ঠে আরও বেশি হিট করেছিল পরে। অবাঙালি গজল শিল্পী ভূপিন্দর সিং গেয়েছিলেন বাংলা গান, 'যদি দুপুর না হতে সন্ধ্যা ঘনায়'।
এছাড়াও কিংবদন্তী শিল্পী মান্না দে-ও এই ছবিতে সলিল চৌধুরীর সুরে গেয়েছিলেন, 'জানি না বুঝি না'। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ও সবিতা চৌধুরী ডুয়েট গেয়েছিলেন, 'যদি না আসতে, ভালবাসতে'।
এছাড়াও এই ছবিতে ছিল দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এক মর্মস্পর্শী রবীন্দ্রসঙ্গীত, 'পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহ ভাই'। ছবির বিষয়ের সঙ্গে গানটি মনে দাগ কেটেছিল।
'জীবন' ছবিটি কয়েক সপ্তাহের বেশী সিনেমাহলে চলেনি। তাই ছবিটি দেখার সুযোগ খুব কম মানুষই পেয়েছিলেন। পরবর্তী কালে কলকাতা দূরদর্শনে ছবিটি এক-দু'বার দেখানো হয়েছিল। তবে পরে আর এই ছবি সামনে আসেনি।

মহুয়া রায়চৌধুরী প্রয়াত হন ১৯৮৫ সালে। মহুয়ার মৃত্যুর পর ১৯৮৬ সালে 'জীবন' মুক্তি পায়। সেবছরে মহুয়ার আরও দুটি ছবি 'অনুরাগের ছোঁয়া' ও 'আশীর্বাদ' সুপারহিট করলেও, যে কোনও কারণেই হোক, 'জীবন' চলেনি। হয়তো ট্র্যাজেডি ছবি বলেই দর্শকধন্য হয়নি তা। অথচ হিন্দিতে 'আনন্দ' ছিল সুপারহিট।

এই রঙিন ছবিটি আর পাওয়া যায় না বর্তমানে। সলিল চৌধুরীর এক কালজয়ী সৃষ্টি দর্শক মহলে শুধু প্রচারের অভাবে যোগ্য সম্মান পেল না। এমনকী 'জীবন' ছবির গানের ক্যাসেটও সেই সময় রিলিজ করেনি। রঙিন বাংলা চলচ্চিত্র যুগের একঝাঁক তারকার বলিষ্ঠ অভিনয়, ভাল গান নিয়েও ছবিটির সলিলসমাধি ঘটল কালের গহ্বরে।
‘সেই আনন্দ ক্রমশ মিশে যাচ্ছিল আমার রক্তে,’ ৪৭ সালের ১৫ অগস্ট কলকাতা ঘুরে দেখেন কিশোর সৌমিত্র